বছরের প্রথম ছয় মাসে খুনের মামলা বেড়েছে ১২ শতাংশ

হত্যা মামলার ৪৪ শতাংশ ঢাকা-চট্টগ্রাম বিভাগে

চট্টগ্রামের রাউজানে দিনের আলোয় গুলি ছুড়ে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে। গত মাসের মাঝামাঝি সংঘটিত এ হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশে খুনের মামলা বেড়েছে ১২ দশমিক ২ শতাংশ। এ সময়ে সারা দেশে ১ হাজার ৭৭৮টি হত্যা মামলা হয়েছে, যার প্রায় ৪৪ শতাংশই ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর আধিপত্য বিস্তার, দখলদারত্ব ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সহিংসতা বাড়ায় হত্যাকাণ্ড বেড়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে হত্যা মামলা হয়েছিল ১ হাজার ৫৮৫টি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে গত বছরের তুলনায় হত্যা মামলা বেড়েছে ১৯৩টি।

চলতি বছর প্রথমার্ধে ঢাকা বিভাগে ৪১১টি এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৬৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। দেশের এ দুই বিভাগেই হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এরপর রয়েছে রাজশাহী বিভাগে ১৮৩টি এবং খুলনা বিভাগে ১৭৩টি। তুলনামূলকভাবে কম হত্যা মামলা হয়েছে রংপুরে ১১০টি, সিলেটে ১০৮টি, ময়মনসিংহে ১০৫টি এবং বরিশাল বিভাগে ৯৬টি।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, খুনের মতো অপরাধ বেড়ে যাওয়া জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। তবে চলতি বছর ডাকাতি ও পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা কমেছে, যাকে ইতিবাচক বলছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নে শুধু মামলার সংখ্যা নয়, অপরাধের ধরন, সংঘটনের কারণ এবং বিচারিক অগ্রগতিও বিবেচনায় নেয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

সাম্প্রতিক সময়ে আধিপত্য বিস্তার প্রবণতার কারণে খুনের ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় নতুন গোষ্ঠী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। এ প্রতিযোগিতায় খুনসহ বিভিন্ন সহিংস অপরাধ বাড়ে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় এসব এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অপরাধও বেশি ঘটে। পাশাপাশি অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা না গেলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়। তাই আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’

সর্বশেষ গতকাল চট্টগ্রামে ২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন নামের এক ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনে ভাংচুর ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে সন্ত্রাসীরা। মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের চাল ও চিনির পাইকারি ব্যবসা রয়েছে। হাটহাজারী থানার বড় দিঘিরপাড় এলাকায় তার পাইকারি দোকান রয়েছে। সম্প্রতি তিনি ১০ তলা বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করেন। এর আগে ১৩ জুলাই নগরের চকবাজার অ্যাকসেস রোডে ডিডিএন নামের একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। পরে র‍্যাব পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২০ জনকে গ্রেফতার করে। এর আগে গত জুনে রাউজানে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে। মামলায় পুলিশের তালিকাভুক্ত অপরাধী রায়হানকে প্রধান আসামি করা হয়। ঘটনাটি রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি স্থানীয় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সক্রিয় উপস্থিতির দিকটিও সামনে আনে। ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতে নিহত হন যুবক আকাশ দাস। র‍্যাবের তদন্তে উঠে আসে, স্থানীয় সন্ত্রাসী চক্রের চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় তাকে হত্যা করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত অনেক সহিংস ঘটনার পেছনে আধিপত্যের লড়াই, রাজনৈতিক এবং ব্যক্তি দ্বন্দ্বের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখনো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতির ওপর পুরোপুরি কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। অনেকের মধ্যে আইন অমান্য করার প্রবণতা বেড়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা, জবাবদিহি ও নৈতিকতার সংস্কৃতি জোরদার করতে হবে। আদর্শিক মতপার্থক্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই সমাধান হওয়া উচিত, সহিংসতার মাধ্যমে নয়। পাশাপাশি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও হত্যার মতো সহিংস অপরাধ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।’

জানতে চাইলে হত্যাসহ সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খুনের ঘটনা বিভিন্ন সামাজিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত, অর্থনৈতিক ও অপরাধমূলক বিরোধের কারণে কমবেশি হয়ে থাকে। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ উদ্ঘাটন করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে। খুনসহ সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মাঠ পর্যায়ে টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ দমনে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে।’

আরও