বাড়তি রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি দেশের আমদানি-রফতানি, জ্বালানি, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহন সেবায় পাঁচ বছরে ট্রেন সংখ্যা কমেছে ৫০ শতাংশের কাছাকাছি। এমনিতে পণ্য খাতে চাহিদার তুলনায় কম লোকোমোটিভ দেয়া হয়। তার ওপর গত পাঁচ বছর আগের নিয়মিত বরাদ্দের তুলনায় বর্তমানে ৭৫ শতাংশ কম লোকোমোটিভ সরবরাহ দেয়ায় নাজুক হয়ে পড়েছে রেলপথে দেশব্যাপী পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাপনা।
রেলপথে পণ্য পরিবহন সার্ভিস শুধু রেলের রাজস্ব আয়ের জন্য নয়, বরং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রায়ত্ত সর্ববৃহৎ পরিবহন সার্ভিস রেলের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর, ঢাকার কমলাপুর আইসিডি, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুর, শ্রীমঙ্গল ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র, জ্বালানি ডিপো ও খাদ্যশস্য মজুদাগারকে। নৌ-সড়ক পথে দীর্ঘ রুট ও ব্যয়বহুল এলাকায় জ্বালানি পরিবহন ছাড়াও সার, কৃষিপণ্য, পাথরসহ নির্মাণসামগ্রী পরিবহনে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে রেলপথে। কিন্তু রেলের দীর্ঘ অব্যবস্থাপনায় মিটার গেজ লোকোমোটিভের তীব্র সংকট পণ্য পরিবহন খাতকে তলানিতে নিয়ে ফেলেছে।
রেলওয়েসংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাভাবিক সময়েও রেলের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগ পণ্য খাতে লোকোমোটিভ সরবরাহ দিতে কৃচ্ছ্রসাধন প্রদর্শন করত। এখন রেলের লোকোমোটিভের সংকটে যাত্রীবাহী ট্রেনের অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় পণ্য খাতে লোকোমোটিভ সরবরাহ কার্যত শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে প্রকৌশল বিভাগ। এ ধারা চলতে থাকলে চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তর ও পোর্ট ইয়ার্ডে কনটেইনারসহ বিভিন্ন পণ্যের বেড়ে যাওয়া স্তূপ আরো বেড়ে সংকট তীব্র আকার ধারণ করবে, যা দেশের জ্বালানি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের সংকটময় সময়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, রেলের বাণিজ্যিক বিভাগ ও পরিবহন বিভাগ চাহিদার ভিত্তিতে নিয়মিত যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে চায়। বিগত দেড় দশকে সরকার রেল খাতে দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করে। কিন্তু ট্র্যাক ও অবকাঠামো খাতে বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও রেলওয়ে লোকোমোটিভ আমদানিতে অনীহা দেখায়। সর্বশেষ ২০২০ সালের দিকে কোরিয়ান হুন্দাই রোটেম থেকে ৩০টি মিটার গেজ লোকোমোটিভ ক্রয় করে। এর চুক্তিতে টিএ-১২ মডেলের আধুনিক অল্টারনেটর সংযোজনের কথা থাকলেও সরবরাহ করা ১০টি ইঞ্জিনে অপেক্ষাকৃত পুরনো ও কম ক্ষমতাসম্পন্ন টিএ-৯ মডেলের অল্টারনেটর সংযোজন করা হয়। চুক্তি-বহির্ভূত যন্ত্রাংশ ব্যবহারের ফলে ইঞ্জিনগুলোর কাঙ্ক্ষিত গতি, হর্সপাওয়ার ও ব্যাকআপ ক্ষমতা কমে যায়। বর্তমানে এসব লোকোমোটিভের মধ্যে ১৫টিরও বেশি চারটির পরিবর্তে দুটি মোটরে চলাচল করছে।
এদিকে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের দৈনিক ১১৯টি লোকোমোটিভের চাহিদা রয়েছে। তবে রেলের প্রকৌশল বিভাগ নিয়মিত ৭২-৭৫টি সরবরাহ করে আসছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দৈনিক সরবরাহ করা লোকোমোটিভের সংখ্যা ৬৫টিতে নেমে এলে রেলওয়ে তীব্র সংকটে পড়েছে। মূলত ২০২৩-২৪ সালের দিকে দেশে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময় সর্বশেষ আমদানি করা ৩০০০ সিরিজের লোকোমোটিভসহ বিভিন্ন পুরনো লোকোমোটিভের যন্ত্রাংশ আমদানি করতে পারেনি রেলওয়ে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার রেলের আয়-ব্যয়ের অনুপাত কমিয়ে আনার ঘোষণায় আমদানির প্রক্রিয়ায় আবারো ধীর গতি নেমে আসে। যার কারণে তীব্র সংকটের মধ্যেও লোকোমোটিভ আমদানি কিংবা বিদ্যমান লোকোমোটিভ সংস্কার করতে পারেনি রেলওয়ে। যার কারণে করোনাকাল থেকে শতাধিক দ্বিতীয় শ্রেণীর ট্রেন বন্ধ করার মাধ্যমে পরিসর ছোট করে আনা রেলওয়ে আবারো ট্রেন বন্ধের মতো পুরনো পদ্ধতির দিকে হাঁটছে।
রেলওয়েসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে রেলওয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা রেলওয়েতে সপ্তাহে একদিন সময় দিতেন। বিশ্ববাজার থেকে দরপত্রের মাধ্যমে মিটার গেজ লোকোমোটিভ ক্রয় করতে অন্তত দুই-তিন বছর সময় লাগে। ওই সময়ে চীন রেলওয়েকে ২০টি লোকোমোটিভ বিনামূল্যে সরবরাহ ছাড়াও দ্রুততম সময়ের মধ্যে ৩০টি মিটার গেজ লোকোমোটিভ বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু রেলের অদূরদর্শিতা, চীনা লোকোমোটিভ ক্রয় নিয়ে রেল প্রশাসনের মধ্যে মতানৈক্য হলে সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়ে যায়। বর্তমানে রেলের প্রায় প্রতিটি ট্রেনই যাত্রা শুরু ও গন্তব্যে পৌঁছতে বিলম্ব করছে। পাশাপাশি প্রতিদিনই পূর্বাঞ্চলের প্রতিটি রুটে চার-পাঁচটি ট্রেনের পথিমধ্যে লোকোমোটিভ বিকল হওয়ার ঘটনা ঘটছে। রেলের সার্ভিস অব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের সঙ্গে রেলকর্মীদের সংঘাত ও রেলকর্মীদের ওপর আক্রমণের ঘটনাও ঘটছে। যার কারণে যাত্রীসেবার মান ধরে রাখতে পণ্য খাতে লোকোমোটিভ সরবরাহ কার্যত বন্ধ রেখেছে যান্ত্রিক প্রকৌশলী বিভাগ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার (ডিআরএম-চট্টগ্রাম) মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলওয়ে সব সময় চায় যাত্রীর পাশাপাশি পণ্যবাহী সেবাও বাড়াতে। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে লোকোমোটিভ, যন্ত্রাংশ আমদানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে সময়ক্ষেপণ হয়। রেলওয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিদ্যমান লোকোমোটিভ মেরামতসহ বেশকিছু প্রকল্পের মাধ্যমে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। আশা করি অচিরেই রেলের লোকোমোটিভ সংকট নিরসন করে যাত্রীবাহী ট্রেনের মতো পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলও স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।’
জানা গেছে, সর্বশেষ অর্থবছরের চেয়েও সংকটময় অবস্থায় রয়েছে চলতি মাসে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা। ১-২৭ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার কমলাপুর আইসিডিতে কনটেইনারবাহী ট্রেন চলেছে ১৯টি, কমলাপুর আইসিডি থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে ট্রিপ পরিচালনা হয়েছে ২০টি। এর মধ্যে ঢাকাগামী একটি কনটেইনার ট্রেন গত কয়েকদিন ধরে লোকোমোটিভ বিকল হয়ে আটকে রয়েছে। ২৭ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর অভ্যন্তরে আমদানি কনটেইনারের মজুদ বেড়ে হয়েছে ৫৯৮টি, চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ডে (সিজিপিওয়াই) দুই সপ্তাহ ধরে ৪৮১টি কনটেইনার লোডেড অবস্থায় অপেক্ষমাণ রয়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে দৈনিক চারটির মতো সরবরাহ হলেও ২৭ আগস্ট পর্যন্ত প্রতি দুই দিনে তিনটি লোকোমোটিভ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে সর্বশেষ তিন-চারদিনে কোনো পণ্যবাহী ট্রেনই পরিচালনা করতে পারেনি রেলওয়ের পরিবহন বিভাগ।
রেলের বিগত পাঁচ অর্থবছরের নথিপত্র বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে অর্থাৎ করোনাকালেও রেলওয়ে ৩৬৫ দিনে ২ হাজার ৭৭০ ট্রিপ পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করেছে। ওই সময়ে প্রতিদিন গড়ে ৯ দশমিক ৯১ লোকোমোটিভ সরবরাহের বিপরীতে ৭ দশমিক ৫৯ ট্রিপ পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করেছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল বার্ষিক ২ হাজার ৮৭৮ ট্রিপ পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করে। ওই বছর দৈনিক রেকর্ড ১১ দশমিক ৬৮টি লোকোমোটিভ সরবরাহ পেয়েছিল পরিবহন বিভাগ। এছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দৈনিক গড়ে ৮ দশমিক ৭৯টি লোকোমোটিভ দিয়ে দৈনিক ৭ দশমিক ২১ ট্রিপ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দৈনিক গড়ে ৬ দশমিক ১৫টি লোকোমোটিভ দিয়ে ৫ দশমিক ৮৮ ট্রিপ পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করা হয়।
যদিও সর্বশেষ অর্থবছরে দৈনিক সরবরাহ করা লোকোমোটিভের সংখ্যা ২০২১-২২ অর্থবছরের তুলনায় ৭৫ শতাংশ কমে হয়েছে ৩ দশমিক ১৪টি। আর দৈনিক পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের সংখ্যা ৪ দশমিক শূন্য ২ ট্রিপে নেমে আসে, যা ২০২১-২২ অর্থবছরের তুলনায় ৫০ শতাংশের কিছু বেশি। বর্তমানে দৈনিক লোকোমোটিভ সরবরাহ ১ দশমিক ৫টিতে নেমে আসায় পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল স্মরণকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা দেশের রেলনির্ভর পণ্য সরবরাহ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পণ্য পরিবহন খাতে রেলের উদাসীনতা চরম পর্যায়ে নেমেছে। বিশেষ করে তীব্র চাহিদা থাকা সত্ত্বেও রেলওয়ে কনটেইনার, জ্বালানি, খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করতে পারছে না। আমদানি ও রফতানিকারক ব্যবসায়ী, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা, যমুনার মতো প্রতিষ্ঠান বুকিং দিয়েও জ্বালানিবাহী ট্রেন পরিচালনা করতে পারছে না। সর্বশেষ গত সপ্তাহে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রেলওয়েকে কনটেইনার জটের কথা উল্লেখ করে চিঠি দেয়। দ্রুত সময়ের মধ্যে মজুদ কনটেইনার পরিবহন করতে না পারলে বন্দরের কনটেইনার জটসহ ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের ক্ষতি হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
নাম প্রকাশ না করে রেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও লোকোমোটিভ ও ওয়াগন-ক্যারেজ আমদানিতে অজানা কারণে গাফিলতি দেখিয়েছে। চট্টগ্রাম-দোহাজারী ডাবল লাইন প্রকল্পের অধীনে ৩০টি মিটার গেজ লোকোমোটিভ আমদানির কথা থাকলেও সেটি বাস্তবায়ন হতে আরো অন্তত তিন বছর সময় লাগবে। রেলওয়ের মিটার গেজ লোকোমোটিভের তীব্র সংকট থাকলেও রেল প্রশাসনের নীরবতা ছাড়াও নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে অকার্যকর পদক্ষেপ বাংলাদেশ রেলওয়ের বিপুল বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নকে ম্লান করে দিচ্ছে। দ্রুত বিদ্যমান লোকোমোটিভ সংস্কার ও দ্রুত আমদানি করা না গেলে রেলের অনেক সেবা কার্যত বন্ধ করে দেয়া ছাড়া উপায় থাকবে না বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
জানতে চাইলে এমএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলওয়ে সব সময় নির্ভরযোগ্য রাষ্ট্রীয় পণ্য পরিবহন সংস্থা। কমলাপুর আইডিসির মাধ্যমে পণ্য আমদানি ও রফতানির সুযোগ থাকায় অনেক ব্যবসায়ী রেলপথেই কনটেইনার পরিবহন করতে চায়। কিন্তু রেলের মাধ্যমে কনটেইনার পরিবহনে সময়ক্ষেপণ হওয়ায় ব্যবসায়ীদের পণ্য আমদানিতে লোকসান দিতে হয়। অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিপমেন্ট দেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও চট্টগ্রামের বাইরের পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলেও রেলপথে কনটেইনারে পণ্য নিতে পারে না।’ দেশের সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যের গতিধারা বজায় রাখতে কনটেইনারবাহী ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করতে রেলওয়েকে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।