ইইউর দেশগুলোয় এক দশকে বাংলাদেশী আশ্রয়প্রার্থী বেড়েছে ১৪৬ শতাংশ

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, কৃষিকাজে আয় কমে যাওয়া, বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার সুযোগের সংকট এবং মানব পাচারকারী চক্রের তৎপরতা—সব মিলিয়ে অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকি বাড়ছে।

কর্মী ভিসায় বৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দালাল ও আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের প্ররোচনায় ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপমুখী হচ্ছেন অনেক বাংলাদেশী। সচ্ছলতার আশায় অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি জমালেও বাস্তবতা সম্পূর্ণই ভিন্ন। গত এক দশকে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোয় বাংলাদেশী আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ১৪৬ শতাংশ। অথচ তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার বেড়ে চলতি বছরের প্রথমার্ধে দাঁড়িয়েছে ৯৯ শতাংশে। যেখানে ২০১৬ সালেও এ হার ৯৪ শতাংশ ছিল।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ইইউভুক্ত দেশগুলোয় আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশী। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ৯০১-এ। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই আবেদন জমা পড়েছে ১৯ হাজার ৫২১টি। যদিও আশ্রয় পাচ্ছেন খুবই নগণ্য, আবেদনের ৯৯ শতাংশই প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

ইইউএএর তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশী আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন ছিল ১৮ হাজার ৮৬৫টি। ২০১৮ সালে তা কমে ১৩ হাজার ৭৪০ এবং ২০১৯ সালে বেড়ে ১৫ হাজার ৮৪৩টিতে দাঁড়ায়। করোনা মহামারীর বিধিনিষেধের মধ্যে ২০২০ সালে আবেদন কমে হয় ১১ হাজার ৫৭০টি। এরপর থেকে আবার বাড়তে থাকে—২০২১ সালে ২০ হাজার ১১০ আবেদন, ২০২২ সালে ৩৩ হাজার ৭২৯ ও ২০২৩ সালে জমা পড়ে ৪০ হাজার ৩৩২টি আবেদন। ২০২৪ সালে তা বেড়ে এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৩ হাজার ২৩৬টিতে পৌঁছায়।

ইউরোপে ২০২৫ সালে সামগ্রিক আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশীদের আবেদনও কিছুটা কমে আসে। তবে ইউরোপজুড়ে আশ্রয়প্রার্থীদের উৎস দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল চতুর্থ। ওই বছর ইইউ প্লাস দেশগুলোয় মোট আশ্রয় আবেদনের প্রায় ৪ শতাংশই ছিল বাংলাদেশীদের। এ তালিকায় বাংলাদেশের আগে ছিল কেবল আফগানিস্তান, ভেনিজুয়েলা ও সিরিয়া।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, কৃষিকাজে আয় কমে যাওয়া, বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার সুযোগের সংকট এবং মানব পাচারকারী চক্রের তৎপরতা—সব মিলিয়ে অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকি বাড়ছে। ইউরোপে পৌঁছাতে পারলেই আশ্রয়ের সুযোগ মিলবে, এমন ধারণা ছড়িয়ে দিয়ে পাচারকারীরা মানুষকে বিপজ্জনক যাত্রায় প্রলুব্ধ করছে।

গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশী আশ্রয়প্রার্থীদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে ইতালি। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫—টানা তিন বছরই বাংলাদেশীদের আশ্রয় আবেদনের ক্ষেত্রে দেশটি প্রথম অবস্থানে ছিল। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ফ্রান্স। ২০২৫ সালে তৃতীয় অবস্থানে উঠে আসে গ্রিস।

অন্যদিকে আশ্রয় আবেদনের জট কমাতে নিষ্পত্তির গতি বাড়িয়েছে ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ। ২০২৫ সালে বাংলাদেশীদের ৪৩ হাজার ৫২৩টি আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়, যা ওই বছরের নতুন আবেদনের সংখ্যার চেয়েও বেশি। এর ফলে অপেক্ষমাণ আবেদনের সংখ্যা ২০২৪ সালের ৪৭ হাজার ৭৭৮ থেকে কমে ২০২৫ সালে দাঁড়ায় ৪১ হাজার ৬৯২টিতে।

ইউরোপে আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে সামগ্রিক পরিসংখ্যানেও। ২০২৫ সালে ইইউ প্লাস দেশগুলোয় আশ্রয়ের আবেদন স্বীকৃতির গড় হার ছিল ২৯ শতাংশ। এর মধ্যে বাংলাদেশী আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানের হার ৯৯ শতাংশে পৌঁছানো পরিস্থিতির প্রতিকূলতাকে আরো স্পষ্ট করছে।

অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম মনে করেন, দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষি খাতে আয় কমে যাওয়া এবং প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত মানব পাচারকারী চক্রের বিস্তারের কারণে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মাদারীপুরে ওকাপের সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের সমীক্ষায় ৬৯৯টি খানার মধ্যে ৪০২টি থেকেই লিবিয়া রুট ব্যবহার করে প্রধানত ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অনিয়মিত অভিবাসনের তথ্য উঠে এসেছে। মূলত গ্রাম পর্যায় থেকে শুরু করে লিবিয়া ও ইতালি পর্যন্ত একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী নেটওয়ার্ক অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে। এর প্রতিটি স্তরে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূতরা সম্পৃক্ত এবং লিবিয়া অংশে স্থানীয় মিলিশিয়ারা তা নিয়ন্ত্রণ করছে।’

এ অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, ‘অনিয়মিত উপায়ে ইউরোপে পৌঁছাতে পারলেই আশ্রয় নেয়া সম্ভব—এমন বার্তা প্রচার করে চক্রটি মানুষকে প্রলুব্ধ করছে। ইতালির দূতাবাস বিষয়টিকে আশ্রয় ব্যবস্থার স্পষ্ট অপব্যবহার হিসেবে দেখছে। অর্থনৈতিক সংকট, জলবায়ুর প্রভাব এবং পাচারকারী নেটওয়ার্ক সচল থাকার কারণেই মানুষ সব জেনেও জীবন বাজি রেখে অবৈধ পথে ইউরোপমুখী হচ্ছে।’

এদিকে মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতার চিত্র উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৬ সালের ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস’ (টিআইপি) প্রতিবেদনে। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশকে আগের মতোই ‘টিয়ার-২’ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। গত সাত বছর ধরেই এ অবস্থান। মানব পাচার নির্মূলে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম মানদণ্ড পুরোপুরি পূরণ করতে না পারলেও প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য সরকারি প্রচেষ্টার কারণে বাংলাদেশকে এ শ্রেণীতে রাখা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের সময়ের তুলনায় বাংলাদেশ সরকার মানব পাচার-সংক্রান্ত তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম বাড়িয়েছে। পাশাপাশি ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ অধ্যাদেশ ২০২৬’ প্রণয়ন, ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ নির্দেশিকা হালনাগাদ এবং দ্রুত সুরক্ষা সেবা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ‘ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজম’ (এনআরএম) পরীক্ষামূলকভাবে চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষা জোরদারেও কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মানব পাচার প্রতিরোধে সরকারি প্রচেষ্টা বাড়লেও বিচারপ্রক্রিয়া, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, দেশের অভ্যন্তরে পাচার মোকাবেলা এবং অভিবাসী শ্রমিকদের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে মূল্যায়ন করা হয়।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর মনে করেন, অনিয়মিত অভিবাসন ও আশ্রয় ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত নজরদারি বাড়ানো জরুরি। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হলেও দালাল ও পাচারকারী চক্রের প্ররোচনায় শিক্ষার্থী, পর্যটক কিংবা অনিয়মিত অভিবাসন পথে ইউরোপমুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। অন্যদিকে আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার তথ্য ও পরিণতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় প্রতারণার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে রাজনৈতিক নিপীড়ন বা সমকামিতার মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে ভুয়া মানবিক কারণ দেখিয়ে মিথ্যা নথিপত্রের মাধ্যমে আশ্রয়ের আবেদন করা হচ্ছে। উচ্চ প্রত্যাখ্যানের হার দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিদেশে অবস্থানরত কিছু প্রবাসী ও স্থানীয় ইমিগ্রেশন আইনজীবী এ ধরনের প্রক্রিয়ায় পথ দেখালেও তা প্রতিরোধে সরকারের তৎপরতা যথেষ্ট নয়।’

এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ মিশন ও দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে প্রবাসী ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের সতর্ক করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ওয়েবসাইটে সচেতনতামূলক প্রচার বাড়ানো এবং ভুয়া আবেদনের সম্ভাব্য আইনি পরিণতি সম্পর্কে মানুষকে জানানো প্রয়োজন বলে মনে করেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পাসপোর্ট অধিদপ্তর ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন পথ ও মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে নজরদারি জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

আরও