উড়োজাহাজের সবচেয়ে বেশি চাহিদা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে, কিন্তু বেশি এয়ারক্রাফট তৈরি করে পশ্চিমারা। আমরা জনসংখ্যার ভিত্তিতে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম দেশ। জনগণের সেবার জন্য হলেও আমাদের এ সেক্টরের দিকে নজর দেয়া উচিত।
চীনের চাহিদার দিকে তাকালে দেখা যায়, সেবায় তাদের সেক্টরটি পশ্চিমাদের তুলনায় ভালো করছে। ফলে এভিয়েশনে আমাদের স্বার্থেই চীনের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দরকার। এখন থেকে পলিসি মেকিংয়ের ক্ষেত্রেও বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। ইকোনমিক্যালি ও জিওপলিটিক্যালি—সব ক্ষেত্রেই এটা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতি বছর আকশপথে আমাদের যাত্রীর পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। এ অঞ্চলে (এশিয়া-প্যাসিফিক) বিশ্বের ৫৫ শতাংশ মানুষ বসবাস করে। এটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে যে পরিমাণ মানুষ উড়োজাহাজ ব্যবহার করছে, ২০৪০ সালে এ সংখ্যা দ্বিগুণ হবে। মধ্যবিত্ত মানুষও এভিয়েশন ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে। প্রতি বছর ৫ দশমিক ৩ শতাংশ হারে উড়োজাহাজ ব্যবহারকারী বাড়ছে। ঢাকা থেকে প্রতিদিন গড়ে সাত-আট হাজার অভ্যন্তরীণ এবং প্রায় ৩০-৩১ হাজার আন্তর্জাতিক যাত্রী আকাশপথ ব্যবহার করে। তবে যাত্রীসংখ্যা বাড়লেও সে তুলনায় অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়েনি। এ বিষয়ে আমাদের আরো কাজ করা উচিত।
দেশের আকাশপথে যাত্রী পরিবহন বাজারের বর্তমান আকার প্রায় ৬০০ কোটি ডলার। বর্তমান প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৮ সালের মধ্যে দেশের বিমান পরিবহন খাত ১৬৮ শতাংশ পর্যন্ত সম্প্রসারণ হতে পারে। এতে অতিরিক্ত ১ কোটি ২১ লাখ থেকে তিন কোটি পর্যন্ত যাত্রী আকাশপথে যাতায়াত করতে পারে। এতে অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ খাতের প্রবৃদ্ধির ফলে দেশের জিডিপিতে ২১০ থেকে ৩২০ কোটি ডলার যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি দুই-চার লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০৪৫ সাল নাগাদ আমাদের আরো অনেক পাইলট দরকার হবে। পাইলটের সংখ্যা বাড়াতে হবে ২৮ শতাংশ, টেকনিশিয়ান ৩০ শতাংশ। অনেক কেবিন ক্রুও প্রয়োজন হবে, চাহিদা বাড়বে ৪২ শতাংশ। আমাদের দেশে প্রতি বছর ৭০-১০০ জন পাইলট প্রয়োজন। বিশ্ব দ্রুত এ মার্কেটের দিকে ঝুঁকছে। অথচ আমাদের প্রস্তুতি নেই। আমাদের এয়ারক্রাফটের সংকটও প্রবল।
বিশ্বব্যাপী ২০২৫-২০৪৫ সালের মধ্যে প্রায় সাত লাখ পাইলট, ৭ লাখ ২৮ হাজার উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী ও প্রায় ১০ লাখ কেবিন ক্রুর প্রয়োজন হতে পারে। ভারতে বছরে ৩ হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার পাইলট দরকার হতে পারে। এ পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যাচ্ছে, এভিয়েশনের সুযোগ কতটা বড়। ভারতে প্রতিবছর ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলীর প্রয়োজন হতে পারে।
বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি রয়েছে। সেটি অর্থনৈতিক সংকটে সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারছে না। সামগ্রিকভাবে আমাদের দেশে প্রয়োজনীয়সংখ্যক পাইলট তৈরির সক্ষমতা নেই। গ্যালাক্সি ফ্লাইং একাডেমিতে বর্তমানে তিনটি উড়োজাহাজ সচল রয়েছে। এসব উড়োজাহাজের মাধ্যমে বছরে মাত্র দুজন পাইলট প্রশিক্ষণ নিয়ে তৈরি হতে পারেন। পাশাপাশি আরাং ফ্লাইং স্কুলের কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে পাইলটের চাহিদা বাড়লেও সেই অনুযায়ী প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির সক্ষমতা দেশে নেই। এ কারণে দেশের পাইলট প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
লাইসেন্সপ্রাপ্ত মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ারেও সংকট রয়েছে। রিক্রুটমেন্ট প্রসেসটা সময়োপযোগী নয়। এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ইউনিভার্সিটি এ বিষয়ে কাজ করছে। তারা এয়ারক্রাফট ইঞ্জিনিয়ারিং মেইনটেন্যান্সের ওপর বিএসসি কোর্স চালু করেছে। এটা দেশের জন্য ভালো খবর।
বাংলাদেশের জিডিপিতে এভিয়েশন খাতের অবদান খুবই কম। ভিয়েতনাম ও শ্রীলংকা এক্ষেত্রে খুব ভালো করছে। আমাদেরও এদিকে নজর দিতে হবে। আমাদের লোকাল এয়ারলাইনসগুলো চাহিদার ২০-৩০ শতাংশ কভার করে। বাকি অংশ কভার করছে বাইরের দেশগুলো। দেশের টাকা চলে যাচ্ছে, অথচ এ অর্থ আমরা নিজেদের দেশে রাখতে পারতাম।
ভবিষ্যতের জন্য আমরা এখনো প্রস্তুত নই। এভিয়েশন খাতের যথাযথ উন্নয়ন হলে তা জিডিপিতে ২ দশমিক ১ বিলিয়ন থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারের সাপোর্ট দিতে পারবে। এভিয়েশনের উন্নয়নের জন্য এখন থেকেই পরিকল্পনা করা উচিত। চাহিদার কারণে বিমান লিজ নিয়ে এ সংকট সমাধান করতে চাচ্ছে। তিন-চারটি কোম্পানি মিলে ২০২৭ সালের মধ্যে ৪০টি বিমান ভাড়া নিতে চাচ্ছে। দেশের এয়ারলাইনসগুলোও আগামী কয়েক বছরে বহর বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। বিমান বাংলাদেশ, ইউএস-বাংলা, এয়ার অ্যাস্ট্রা ও নভোএয়ার—চারটি এয়ারলাইনস ২০২৭ সালের মধ্যে তাদের বহরে মোট ৪০টি উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে।
এর বাইরে বেসিক চ্যালেঞ্জ হচ্ছে লিডারশিপ ক্রাইসিস। আমাদের এখনো ইকোসিস্টেম তৈরি হয়নি। পাইলট, উদ্যোক্তা, টেকনিক্যাল ও নন-টেকনিক্যাল বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা তেমন কিছুই করতে পারিনি।
আমাদের ইনফ্রাস্ট্রাকচারও তেমনভাবে তৈরি হয়নি। আমাদের উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। একাডেমিয়াগুলোকে এক্ষেত্রে দূরদর্শী ভূমিকা রাখতে হবে। আমরা কীভাবে আমাদের উন্নয়ন করতে পারি, সেদিকে নজর দিতে হবে।
দেশে ১১টি ডমেস্টিক এয়ারপোর্ট রয়েছে, যার মধ্যে পাঁচটি কার্যকর আছে। এয়ারপোর্ট তৈরি হলে কানেক্টিভিটি বাড়ে, অর্থনীতি শক্তিশালী হয়। সিভিল অথরিটি নন-অপারেশনাল এয়ারপোর্টগুলো চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা দেয়ার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তখন বছরে ২ কোটি ৪০ লাখের বেশি যাত্রীকে সেবা দেয়া সম্ভব হবে। তবে শুধু টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না, এর সঙ্গে অন্যান্য অবকাঠামোগত সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
স্টেকহোল্ডারদের সব ধরনের সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, এভিয়েশন গ্রোথের জন্য। গ্লোবাল গ্রোথের জন্যও কাজ করে। বেবিচককে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে হবে। যদিও এটি চ্যালেঞ্জের।
বেবিচকের উচিত আমেরিকার সঙ্গেও আলোচনা করা। তাদের কাছ থেকে কেনা এয়ারক্রাফটগুলো যাতে যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালনা করতে পারি, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এয়ারক্রাফটগুলোর যথাযথ ব্যবহার হবে না।
সামগ্রিকভাবে এভিয়েশন খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেক বড়। যাত্রী সংখ্যা বাড়ছে, বাজার সম্প্রসারণ হচ্ছে এবং দক্ষ জনবলের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু সে তুলনায় আমাদের পাইলট প্রশিক্ষণ, মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার, এয়ারক্রাফট, বিমানবন্দর অবকাঠামো ও নীতিগত প্রস্তুতি এখনো পর্যাপ্ত নয়। তাই ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।