গ্রিন শিপইয়ার্ডে রূপান্তরের পরও কমছে না চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জাহাজ ভাঙা শিল্পে শ্রমিকের প্রাণহানি। বরং আন্তর্জাতিক মানের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতার মধ্যেই ঘটছে একের পর এক দুর্ঘটনা। গত প্রায় ২২ বছরে এখানকার ইয়ার্ডগুলোতে প্রাণ হারিয়েছেন ২৭৯ শ্রমিক। এর মধ্যে ১৯৮ জনই মারা গেছেন ভারী লোহা-স্টিলের আঘাত, আগুন-বিস্ফোরণ ও উঁচু স্থান থেকে পড়ে, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ।
সর্বশেষ গত ১৪ আগস্ট ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে (গ্রিন শিপইয়ার্ড) বিষাক্ত গ্যাসের বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয়েছে ১০ শ্রমিকের। এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আরেক গ্রিন ইয়ার্ডে গ্যাস বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান সাত শ্রমিক।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের (ইপসা) ২০০৫ থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে সবচেয়ে বেশি ৯৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে ভারী লোহা বা স্টিলের আঘাতে। আগুন ও বিস্ফোরণে মারা গেছেন ৬৩ জন, জাহাজ থেকে নিচে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৬ জন এবং বিষাক্ত গ্যাসে ৩০ জন। একই সময়ে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১ হাজার ৫৪০ শ্রমিক। আন্তর্জাতিক হংকং কনভেনশনের আওতায় ২০২৫ সালের ২৬ জুন থেকে গ্রিন ইয়ার্ড ছাড়া দেশে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানির সুযোগ না থাকলেও দুর্ঘটনার এ চিত্র বলছে কাগজে-কলমে গ্রিন ইয়ার্ডের স্বীকৃতি মিললেও শ্রমিকের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে।
এদিকে আহতদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ওই ২২ বছরে সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডগুলোতে মোট ১ হাজার ৫৪০ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে আহত হন ১ হাজার ৩৯ জন এবং পরবর্তী ১২ বছরে (চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত) আহত হয়েছেন ৫০১ জন। সংস্থাটির ২০০৫-পরবর্তী ১০ বছরের হতাহতের কারণ রেকর্ডভুক্ত করা হয়নি। ২০১৫ সাল থেকে আহত ৫০১ জনের মধ্যে ১৮৫ জনের আহতের রেকর্ড থাকলেও বাকি ৩১৬ জনের তথ্য সংগ্রহ করতে পারেনি সংস্থাটি।
এই আহত ১৮৫ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৫ জন অগ্নিকাণ্ড ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়েছেন, উঁচু স্থান থেকে নিচে পড়ে আহত হয়েছেন ৩৪ জন, ভারী লোহা বা স্টিলের পাতের আঘাতে ৩০ জন, বিষাক্ত গ্যাসে জ্ঞান হারিয়েছেন ৭ জন, যানবাহন দুর্ঘটনায় ১ জন এবং অন্যান্য বা অজানা দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪৮ জন শ্রমিক।
জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডের এসব দুর্ঘটনায় আহতদের কেউ শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাত নিয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়েছেন, আবার কেউ স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। কিন্তু আহত শ্রমিকদের কতজন পরবর্তী সময়ে কাজে ফিরতে পেরেছেন, সে বিষয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নেই কোনো সরকারি-বেসরকারি সংস্থার কাছে।
ইপসার হেড অব অ্যাডভোকেসি মোহাম্মদ আলী শাহিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জাহাজ ভাঙা শিল্প খাতে গত দুই দশকে হতাহতের বেশির ভাগ ঘটনা অগ্নিকাণ্ড, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, উপযুক্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়া উঁচুতে কাজ করা এবং প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অভাবের কারণে ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনার পেছনে ইয়ার্ডগুলোতে শোভন কর্মপরিবেশের অভাব বা শ্রমিকদের কাজে নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল সেটা স্পস্ট। শুধু শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও প্রাণহানি বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে গ্রিন শিপইয়ার্ডের জন্য হংকং কনভেনশন রেটিফাই করেছে। ২০২৫ সালের ২৬ জুনের পর থেকে হংকং কনভেনশন সার্টিফিকেশন রুলস অনুযায়ী গ্রিন ইয়ার্ড ছাড়া দেশে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানির সুযোগ নেই। গ্রিন ইয়ার্ডে গত দুই-তিন বছরেই কয়েকটি ঘটনায় প্রায় ২০ জনের বেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।’
তিনি আরো জানান, ‘আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ও নথিপত্রে ইয়ার্ডগুলোকে গ্রিন ইয়ার্ড বা নিরাপদ কর্মস্থল হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা বাড়লেও হতাহতের এ ঘটনা অস্বাভাবিক। কার্যকর আন্তর্জাতিক তদারকি এবং মালিক পক্ষের সদিচ্ছা ছাড়া শুধু নীতিমালার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শ্রমিকদের জীবনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।’ শ্রমিকের নিরাপদ কর্মপরিবেশ গঠনে ইয়ার্ড মালিক ও সরকারি তদারকি সংস্থাগুলো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করুক এবং যেকোনো দুর্ঘটনায় সঠিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া জোরদার করার দাবি জানান তিনি।
শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষায় জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলোকে আধুনিক ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় আনতে হংকং কনভেনশনের আওতায় গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৬ জুন থেকে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পে হংকং কনভেনশনের সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। এর আওতায় নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী গ্রিন ইয়ার্ড ছাড়া স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানির সুযোগ নেই।
শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে সেফটি কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। শ্রমিক আইনের ৭৮(ক) ধারা অনুযায়ী প্রতিটি ইয়ার্ডে মালিক পক্ষের তিনজন ও শ্রমিক পক্ষের তিনজন সদস্য নিয়ে ছয় সদস্যের সেফটি কমিটি গঠন করতে হয়। এই কমিটির মাসে অন্তত একবার সভা করার কথা। এসব সভায় শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও অন্যান্য সেফটি ইস্যু পর্যালোচনা করার বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফেরদৌস শিপইয়ার্ডে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা খুবই দুঃখজনক। বিগত বছরগুলোতে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তবে গ্রিন ইয়ার্ড হওয়ার পরে দুর্ঘটনার সংখ্যা কমেছে। ইয়ার্ডগুলোকে আরো সতর্ক হয়ে আন্তর্জাতিক গাইডলাইন মেনে পুরনো জাহাজ কাটার কাজ করতে হবে। গ্রিন ইয়ার্ডের মূল শর্তই হলো শ্রমিকদের শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। জাহাজ কাটায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি শ্রমিকদের সেফটি পোশাক পরে কাজ করতে হবে। এসব বিষয় মালিকদের নিশ্চিত করতে হবে। আমি নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর মালিক পক্ষকে আইন ও নিয়ম মেনে কাজের বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘ফেরদৌস শিপইয়ার্ডের ঘটনার পরে শিল্প মন্ত্রণালয়ে এ খাত পরিচালনার জন্য নতুন গাইডলাইন চেয়েছি। তাছাড়া গ্রিন ইয়ার্ড পরিচালনার জন্য বিভিন্ন ধাপে মালিক পক্ষ থেকে শ্রমিক পর্যন্ত সবাইকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করার কাজ চলছে। জাহাজ ভাঙা শিল্প খাতে শ্রমিকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া স্ক্র্যাপ জাহাজ কেনার আগে পরিদর্শন প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন সনদ যাচাই-বাছাই করতে হবে মালিকদের। নয়তো এমন ঘটনা আবার ঘটলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে।’
ভুক্তভোগী কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিপইয়ার্ডগুলোতে শ্রমিকদের সুরক্ষায় নামমাত্র ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে দু-একটি ইয়ার্ডে সেফটি কমিটি আছে। এই কমিটি দেখিয়ে সব ইয়ার্ডে সেফটি কমিটি আছে বলে দেখানো হয়। প্রতি মাসে মাসিক যে আলোচনা সভা করার নিয়ম আছে, সেটাও মানা হয় না। শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য যেসব পোশাক দরকার, সেগুলো ব্যবহারের উপযোগী নয় বলে বেশির ভাগ সময়ই শ্রমিকরা তা পরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তাছাড়া অনেক ইয়ার্ড মালিক তাদের কাজ ঠিকাদারের মাধ্যমে করিয়ে থাকেন। ঠিকাদারদের তাদের অধীন শ্রমিকদের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করার কথা থাকলেও তারা করছেন না। অন্যদিকে শ্রমিকদের বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করা যায়নি, এমনকি কাজের পরিচয়পত্রও দেয়া হয় না। বিশেষ করে সাব-কন্ট্রাক্টে শ্রমিকদের কাজে নেয়ার হার বাড়ছে।
জাহাজ ভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ শিল্প আধুনিকায়ন হয়েছে বলা হলেও সেটার বাস্তব প্রতিফলন দেখা নেই। এত বড় ঘটনা ঘটে গেলেও শ্রমিকদের সেভাবে মুখ খুলে কথা বলতে দেখা যায়নি। এমনকি সীতাকুণ্ডের স্থানীয় শ্রমিক ও বাইরে থেকে আসা, বিশেষ করে উত্তর বা দক্ষিণবঙ্গের শ্রমিকদের মধ্যে বিভাজন আছে। এ কারণে শ্রমিকরা মালিকদের জুলুমের বিষয়ে মুখ খুলতে চান না। মালিক পক্ষের ঘটনার কারণ লুকানোর বিষয়টি আমরা খেয়াল করেছি। শ্রমিকদের দাবি আদায় করে দিতে পারিনি, সেজন্য সংগঠন কিংবা আমরা যারা নেতা আছি, তারাও ব্যর্থ।’
তিনি আরো জানান, যারা আহত হচ্ছেন, তাদের নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। আহত শ্রমিকরা কাজে ফিরতে পেরেছেন কিনা, সেই বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান নেই। তাদের অনেকের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে, কারো হাত-পা অচল হয়ে গেছে কিংবা দাঁড়িয়ে কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন এমন অনেক শ্রমিক আছেন। এ শ্রমিকদের কেউ খবর নেয় না। অন্য খাতের শ্রমিক এবং জাহাজ ভাঙা খাতের শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এক নয়। সে কারণে মালিক পক্ষের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।