আবাসিক গ্যাসের অপচয় রোধ, গ্রাহক সচেতনতা বৃদ্ধি, সিস্টেম লস ও বকেয়া আদায় জটিলতা কমাতে গ্যাসের প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয় প্রায় পাঁচ বছর আগে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে দুটি বিতরণ কোম্পানির আওতায় ১৮ লাখ ৭০ হাজার মিটার স্থাপনে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার তিনটি প্রকল্প নেয়া হয়। তার জন্য ঋণ চুক্তিও হয় বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে। তবে গ্যাস সংকট ও বিপুল বৈদেশিক ঋণের সুদকে বিবেচনায় নিয়ে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন থেকে পিছিয়ে আসছে সরকার। প্রকল্পগুলো অসমাপ্ত রেখেই শেষ করার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে। এরই মধ্যে বাতিলের সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন।
দেশে বিদ্যুতের প্রি-পেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকের তীব্র অসন্তোষ, ক্ষোভ থাকলেও গ্যাসের মিটারে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। তিতাসের আবাসিক প্রি-পেইড মিটারের বেশকিছু গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিটারবিহীন গ্রাহককে গ্যাস ব্যবহার না করলেও প্রতি মাসে নির্দিষ্ট হারে বিল পরিশোধ করতে হয়। আর প্রি-পেইড মিটারের ক্ষেত্রে দিতে হয় ব্যবহার অনুযায়ী। অর্থাৎ একজন গ্রাহক যতটুকু গ্যাস ব্যবহার করেন, ঠিক ততটুকুরই বিল দেন। সে ক্ষেত্রে মিটারবিহীন গ্রাহকের চেয়ে প্রি-পেইড মিটারে খরচ নেমে আসে অর্ধেকে।
মোট ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির আওতায় দেশে আবাসিক গ্রাহক রয়েছেন প্রায় ৩৬ লাখ। এর মধ্যে প্রি-পেইড মিটার ব্যবহার করেন সাত লাখের মতো গ্রাহক। বাকি ২৯ লাখ গ্রাহকের আঙিনায় মিটার স্থাপনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি (টিজিটিডিসিএল) ও পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (পিজিসিএল) আওতায় তিনটি প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে তিতাসের দুটি প্রকল্পে ১৭ লাখ ৫০ হাজার এবং পিজিসিএলের একটি প্রকল্পে ১ লাখ ২০ হাজার মিটার স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল।
প্রকল্পগুলোর অর্থায়নে ২০২৩ সালের নভেম্বরে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ৩০ কোটি ডলার এবং এডিবির সঙ্গে ২০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। বাকি অর্থায়নের কথা ছিল বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর। তবে গ্রাহকের ব্যয় সাশ্রয়ের পাশাপাশি গ্যাসের অপচয় ও বিতরণ ব্যবস্থার সিস্টেম লস কমানোর যে লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পগুলো নেয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের আগেই থমকে যাচ্ছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, আবাসিক গ্রাহকদের আঙিনায় মিটার স্থাপন করে বিনিয়োগের অর্থ তুলে আনতে দীর্ঘ সময় লাগবে। এর মধ্যে আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ দেয়ার বিষয়ে সরকারের আগ্রহ কম; বরং শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। ফলে বিপুল অংকের ঋণ নিয়ে মিটার স্থাপন করেও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে গ্রাহকদের অসন্তোষ বাড়তে পারে। এর সঙ্গে আগে স্থাপন করা মিটারের ত্রুটি ও রিচার্জ-সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে অভিযোগও রয়েছে। সব মিলিয়ে নতুন করে বড় পরিসরে প্রি-পেইড মিটার স্থাপনে আগ্রহ হারিয়েছে বিতরণ কোম্পানিগুলো।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রি-পেইড মিটার প্রকল্পগুলো অসমাপ্ত অবস্থায় সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে। গ্রাহকদের অসন্তুষ্টি, গ্যাস সংকট ও ঋণের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়সহ বিভিন্ন কারণে সরকার এখন আর প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে চায় না।’
জানা গেছে, তিতাসের ১১ লাখ আবাসিক গ্রাহকের আঙিনায় স্মার্ট প্রি-পেইড গ্যাস মিটার স্থাপনে বিশ্বব্যাংক, বাংলাদেশ সরকার ও তিতাসের অর্থায়নে ‘গ্যাস সেক্টর ইফিশিয়েন্সি ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড কার্বন অ্যাবেটমেন্ট প্রজেক্ট—ইনস্টলেশন অব স্মার্ট প্রি-পেইড গ্যাস মিটার ফর টিজিটিডিসিএল’ শীর্ষক প্রকল্প নেয়া হয়। ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ অঞ্চলে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ৩ হাজার ৫৪২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ছিল ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে সর্বশেষ হিসাবে এর আর্থিক অগ্রগতি মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ এবং বাস্তবায়ন অগ্রগতি দশমিক ৩৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রকল্পটির জন্য ৩০০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দও রাখা হয়েছিল। তবে গত ১৩ সেপ্টেম্বর প্রকল্পটি অসমাপ্ত অবস্থায় সমাপ্তের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
তিতাসের দ্বিতীয় প্রকল্পটির আওতায় ঢাকা মহানগরের দক্ষিণাঞ্চল ও নারায়ণগঞ্জের আবাসিক গ্রাহকদের জন্য সাড়ে ছয় লাখ স্মার্ট প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। ‘স্মার্ট মিটারিং এনার্জি ইফিশিয়েন্সি ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট—ইনস্টলেশন অব প্রি-পেইড গ্যাস মিটার ফর টিজিটিডিসিএল’ শীর্ষক প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। এতে অর্থায়নের কথা ছিল এডিবি, বাংলাদেশ সরকার ও তিতাসের। ২০২৩ সালের অক্টোবরে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। আর এটি বাস্তবায়িত হলে আবাসিক গ্যাসের অপচয় রোধ, গ্রাহকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, সিস্টেম লস ও বকেয়া আদায়ের জটিলতা কমানো এবং তিতাসের পরিচালন ব্যয় হ্রাসের প্রত্যাশা ছিল।
তিতাস সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি দশমিক ১৩ শতাংশ এবং বাস্তবায়ন অগ্রগতি দশমিক ৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এডিপিতে এর জন্য বরাদ্দ ছিল ১৭৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এরই মধ্যে প্রকল্পটি অসমাপ্ত অবস্থায় সমাপ্ত করার প্রস্তাব জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
জানতে চাইলে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহনেওয়াজ পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাস সংকট ও উচ্চ সুদের ঋণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রি-পেইড মিটার প্রকল্প দুটি বাতিল করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ও এডিবির সঙ্গে ঋণ চুক্তি হলেও মিটার কেনা বা প্রকল্পের কোনো টেন্ডার হয়নি। ফলে ঋণের অর্থ এখনো ব্যয় হয়নি। প্রকল্পগুলো অসমাপ্ত রেখেই সমাপ্ত করা হচ্ছে। এজন্য সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) তৈরি করা হচ্ছে।’
এদিকে পিজিসিএলের আওতায় ১ লাখ ২০ হাজার আবাসিক গ্রাহকের জন্য স্মার্ট প্রি-পেইড গ্যাস মিটার স্থাপনের পাশাপাশি সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডেটা অ্যাকুইজিশন (স্কাডা) ও ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা (জিআইএস) স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল ২০২৩ সালের অক্টোবরে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৮১ কোটি টাকা। এর সিংহভাগ অর্থায়নের কথা ছিল বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে। বাকি অর্থ দেয়ার কথা ছিল সরকার ও পিজিসিএলের। তবে প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি এখনো ১ শতাংশের নিচে, শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ। আর বাস্তবায়ন অগ্রগতি শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ বলে পেট্রোবাংলা সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা যায়। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে প্রকল্পটির জন্য ২২০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এটিও অসমাপ্ত অবস্থায় সমাপ্ত করার প্রস্তাব জ্বালানি বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
আবাসিক গ্রাহকদের প্রকৃত গ্যাস ব্যবহার নিরূপণে গবেষণা করছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আগামী জানুয়ারিতে একজন গ্রাহক দুই চুলার সংযোগে গড়ে কতটুকু গ্যাস ব্যবহার করেন, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার প্রত্যাশা করছে সংস্থাটি। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে আবাসিক গ্যাস ব্যবহারের প্রকৃত চিত্র আরো স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাধারণত প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করাই সঠিক প্রক্রিয়া। এতে একজন গ্রাহক বুঝতে পারবেন তিনি কতটুকু গ্যাস ব্যবহার করছেন। বিইআরসি আবাসিক গ্রাহকের গ্যাস ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করছে। জানুয়ারিতে ফলাফল পাওয়া যাবে। তখন বোঝা যাবে, একজন গ্রাহক প্রকৃতপক্ষে কতটুকু গ্যাস ব্যবহার করেন।’