বেলা ৩টা থেকে শুরু হওয়া এ অধিবেশনে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়াসহ কয়েকটি বিল আনার কথা আছে। এ দুটি আইনের খসড়া নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। তাই সংসদের এ অধিবেশনে এ দুটি বিল নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। পাশাপাশি চলমান বিদ্যুৎ-গ্যাস, সার সংকটের মতো বিষয় নিয়ে সংসদে উত্তাপ তৈরি হতে পারে।
গতকাল সংসদ ভবনে গণমাধ্যমের সঙ্গে সংসদীয় কমিটি, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা, সংবিধান সংশোধন এবং আসন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিল নিয়ে কথা বলেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। পরে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানানো হয়। চিফ হুইপ বলেন, ‘তৃতীয় অধিবেশনে প্রায় ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিল উত্থাপিত হতে পারে। এর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর, গুম ও মানবাধিকার সুরক্ষা-সংক্রান্ত বিল উল্লেখযোগ্য।’ সম্পত্তি হস্তান্তর-সংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দিলেও তারা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তির ভোগদখল ও ব্যবহারের অধিকার বজায় রাখবেন। এর মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের পর বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের অবহেলা রোধের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।’
জুলাই সনদ ও সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গে নূরুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাই সনদের ধারাবাহিকতায় জনগণ নির্বাচনী ইশতাহার দেখেই ভোট দিয়েছেন এবং তাদের ওপর আস্থা রেখেছেন। সেই আস্থার ভিত্তিতেই তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। দেশের স্বার্থে প্রয়োজন হলে নতুন আইন প্রণয়ন এবং বিদ্যমান আইনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে।’
সংবিধানের একটি কমা, দাঁড়ি কিংবা সেমিকোলনের পরিবর্তনও সংবিধান সংস্কারের অংশ বলে উল্লেখ করেন চিফ হুইপ। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সব রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে যে অঙ্গীকারে স্বাক্ষর করেছে, তার প্রতিটি বিষয় যথাযথভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে।’
চিফ হুইপ বলেন, ‘সংবিধান সংশোধনের জন্য ১৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এতে বিএনপি থেকে সাতজন এবং জামায়াত থেকে পাঁচজন সদস্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যান্য ছোট দল থেকেও একজন করে সদস্য রাখার প্রস্তাব রয়েছে। বিরোধী দল তাদের সদস্যদের নাম দিলে তাদেরও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংবিধান সংশোধন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি ভারতের সংবিধান গত ৭৬ বছরে ১০৬ বার সংশোধনের বিষয়টি উল্লেখ করেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিরোধী দল সংসদের বাইরে অস্থিরতা সৃষ্টি না করে জনগণের সমস্যা ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সংসদে তুলে ধরবে এবং আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করবে।
চিফ হুইপ বলেন, ‘(বিরোধী দল) সংসদের বাইরে আন্দোলন করে আবার স্বৈরাচারী ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি করে দেবে না আশা করি। ১৭ বছর ধরে জেল, গুম ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যে অর্জন এসেছে, সেই অর্জন অন্য কারো হাতে তুলে দেয়া হবে—এটা আমি বিশ্বাস করি না। আমরা চাই বিরোধী দল সংসদে এসে জনগণের কথা বলবে, সরকারের ভুল ধরিয়ে দেবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমাধানের পথ বের করবে।’
বিদ্যুৎ খাতের চুক্তি প্রসঙ্গে নূরুল ইসলাম বলেন, ‘বিগত সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ খাতে করা বিভিন্ন চুক্তি দেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক দায় সৃষ্টি করেছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, দায়মুক্তির ব্যবস্থা রেখে এমন আইন করা হয়েছিল, যার ফলে এসব চুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ সীমিত হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের কারণে জনগণের অর্থের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
আদানির সঙ্গে করা বিদ্যুৎ চুক্তিকে ‘গর্হিত অপরাধ’ হিসেবে উল্লেখ করে নূরুল ইসলাম বলেন, ‘এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে উচ্চ মূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। দেশের স্বার্থে এ ধরনের চুক্তির অর্থনৈতিক চাপ থেকে বেরিয়ে আসতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’
সাধারণত বছরের এ সময়ে ডাকা অধিবেশন খুব একটা দীর্ঘ হয় না। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকায় মূলত এ অধিবেশন ডাকা হয়ে থাকে। এ সময়ে ডাকা অধিবেশন সপ্তাহখানেক চলে। তবে এবারের অধিবেশন কত দিন চলবে, তা অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে চূড়ান্ত করা হবে বলে জানা গেছে।