সীমান্তবর্তী যশোরের চৌগাছা উপজেলা। প্রাচীনকাল থেকেই বাওড় ও নদীবেষ্টিত এ জনপদ সবজি উৎপাদনের জন্য পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া ও ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় এখানকার অনেক চাষী সবজি থেকে সরে এসে ঝুঁকছেন ফল চাষে। প্রায় দুই দশক আগে এ উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে আম, পেয়ারা, কলা, বরইসহ কয়েকটি দেশীয় ফলের আবাদ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখন বেড়েছে বিদেশী ফলের চাষও। বর্তমানে উপজেলার ২২ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার হেক্টরে ফল চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জমিতেই চাষ হচ্ছে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার সুপরিচিত ফল ড্রাগন। চাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বল্প খরচ, উচ্চফলন, পর্যাপ্ত বাজার চাহিদা ও ভালো দামের কারণে দিন দিন চৌগাছায় ফল চাষের পরিধি বাড়ছে। কৃষিসংশ্লিষ্টরাও মনে করছেন, ফল চাষ এখন এ অঞ্চলের কৃষির অন্যতম শক্তিশালী সম্ভাবনা হয়ে উঠছে।
শুধু যশোরের চৌগাছা উপজেলা নয়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ছয় জেলা যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরজুড়েই বাড়ছে ফল চাষ। যশোর অঞ্চলের মোট ৫৩ হাজার ৭৭৮ হেক্টর জমিতে বর্তমানে বিভিন্ন ফলের আবাদ হচ্ছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৬৫৬ হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে ১০ ধরনের বিদেশী ফল, যার বার্ষিক উৎপাদন ৬০ হাজার ৯০৫ টন।
কৃষি বিভাগ জানায়, একসময় এসব বিদেশী ফল চাষ হতো শুধুই শখের বশে বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় কিংবা ছাদে সীমিত পরিসরে। কিন্তু বর্তমানে বাজারে চাহিদা ও আবাদ লাভজনক হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে ফলগুলোর আবাদ ক্রমেই বাড়ছে। এতে একদিকে যেমন দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হচ্ছে, অন্যদিকে আমদানিনির্ভরতা কমে সাশ্রয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোর অঞ্চলের তথ্যমতে, দেশীয় ফলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাষ হয় আম, পেয়ারা, কাঁঠাল, কলা ও লিচু। পাশাপাশি অন্যান্য ফলের সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে যশোর অঞ্চলে চাষ হচ্ছে মোট ১০ ধরনের বিদেশী ফল, যার মধ্যে রয়েছে কমলা, মাল্টা, লটকন, অড়বরই, স্ট্রবেরি, ড্রাগন, কাজুবাদাম, রাম্বুটান, আঙুর ও অ্যাভোকাডো। এ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে ভিয়েতনামের জাতীয় ফল ড্রাগন, যার আওতায় রয়েছে ১ হাজার ৮২৩ হেক্টর জমি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে শীতপ্রধান দেশের ফল মাল্টা ও কমলা, যেগুলোর চাষ হচ্ছে ৮২০ হেক্টর জমিতে। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে অ্যাভোকাডো ও স্ট্রবেরি, যেগুলোর চাষ হচ্ছে মোট ১০ হেক্টর জমিতে। দেশীয় ফলের পাশাপাশি বিদেশী ফলের চাষ ও উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে ঝিনাইদহ জেলা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যশোর ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চুয়াডাঙ্গা।
বাণিজ্যিকভাবে বিদেশী ফল চাষের পাশাপাশি শৌখিনভাবে বাসাবাড়িতেও চাষ হচ্ছে কিছু বিশেষ জাতের ফল। এর মধ্যে রয়েছে ভিয়েতনামের ছোট জাতের নারিকেল ও আম, চীনের পার্সিমন ও লংগান (কাঠলিচু), বারোমাসি কাঁঠাল, থাই কুল, থাই পেঁপে, থাই সফেদা ও থাই মিষ্টি তেঁতুলসহ আরো কয়েকটি বিদেশী জাত। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এসব ফল চাহিদা ও উৎপাদনে সহজলভ্য হলে ভবিষ্যতে তাদের চাষাবাদ বাণিজ্যিকভাবে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হবে। যশোর ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এসএম সাইফুল ইসলাম লিটন বলেন, ‘দেশে এখন বিদেশী ফল উৎপাদন বাড়ায় আমদানি অনেকটা কমেছে। দুই বছর আগেও থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে ড্রাগন ফল আমদানি করতে হতো। এখন এ ফলের চাহিদার ৯০ শতাংশই দেশীয়ভাবে পূরণ হচ্ছে। লিচু, আম, আনারসের মতো ফলের চাহিদাও পুরোপুরি দেশে উৎপাদিত ফলের মাধ্যমেই মেটানো হয়। তবে এখনো বিপুল পরিমাণ খেজুর, আঙুর, কমলা, নাশপাতি ও আপেল আমদানি করতে হচ্ছে। এসব ফল দেশেই আবাদ হলে আমাদের আর আমদানিনির্ভরতা থাকত না। ফলে একদিকে যেমন ডলার বিদেশে খরচ হতো না, অন্যদিকে ভোক্তারাও কম দামে এসব ফল কিনতে পারতেন।’
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, কমলার চাষ হচ্ছে যশোরে ১৩ হেক্টর, ঝিনাইদহে ৭৩, মাগুরায় ১ দশমিক ৭, কুষ্টিয়ায় নয়, চুয়াডাঙ্গায় ৮১ ও মেহেরপুরে চার হেক্টর জমিতে। সব মিলিয়ে মোট ১৮১ দশমিক ৭ হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে ফলটি। মাল্টার চাষ হচ্ছে যশোরে ১৬৫ হেক্টর, ঝিনাইদহে ১৪৬ হেক্টর, মাগুরায় ২১ দশমিক ৩ হেক্টর, কুষ্টিয়ায় ৩১ হেক্টর, চুয়াডাঙ্গায় ১৯৯ হেক্টর ও মেহেরপুরে ৭৬ হেক্টর জমিতে। লটকন যশোরে এক হেক্টর ও অড়বরইয়ের চাষও যশোরেই এক হেক্টর জমিতে হচ্ছে। স্ট্রবেরির চাষ হচ্ছে কুষ্টিয়ায় এক হেক্টর ও চুয়াডাঙ্গায় তিন হেক্টর জমিতে, অর্থাৎ মোট চার হেক্টরে। সবচেয়ে বেশি বিস্তার ঘটেছে ড্রাগনের চাষে—যশোরে ৪৬৯ হেক্টর, ঝিনাইদহে ১ হাজার ১২ হেক্টর, মাগুরায় ১২ হেক্টর, কুষ্টিয়ায় ১৭ দশমিক ৫ হেক্টর, চুয়াডাঙ্গায় ৩০৪ দশমিক ৫ হেক্টর ও মেহেরপুরে ৮ হেক্টর। সব মিলিয়ে মোট এক হাজার ৮২৩ হেক্টর জমিতে ড্রাগন ফলের চাষ হচ্ছে। এছাড়া কাজুবাদামের চাষ হচ্ছে যশোরে শূন্য দশমিক ৮ হেক্টর জমিতে, রাম্বুটানের চাষ ঝিনাইদহে এক হেক্টরে, আঙুর চাষ হচ্ছে যশোরে শূন্য দশমিক ২৪১ হেক্টর ও ঝিনাইদহে ১ দশমিক ৫৪ হেক্টর জমিতে, মোট ১ দশমিক ৭৮১ হেক্টর জমিতে। অ্যাভোকাডোর চাষ হচ্ছে যশোরে ১ দশমিক ৩৬৮ হেক্টর ও ঝিনাইদহে ৩ হেক্টর জমিতে। সব মিলিয়ে ৪ দশমিক ৩৬৮ হেক্টর জমিতে অ্যাভোকাডো ফলানো হচ্ছে।
এদিকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় দিন দিন দেশী-বিদেশী বাণিজ্যিক ফল চাষে তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে। যশোর অঞ্চলে গত এক দশকে এক হাজারের বেশি তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে অবদান রেখে চলেছেন। তাদেরই একজন যশোরের চৌগাছা উপজেলার তিলকপুর গ্রামের ইসমাইল হোসেন। চাকরি ছেড়ে তিনি থাই পেয়ারা, আপেল ও বাউ কুলের বাগান দিয়ে চাষ শুরু করেন। নতুন কিছু করার চিন্তা থেকে ইন্টারনেটে ড্রাগন ফল চাষ সম্পর্কে জানতে পেরে উৎসাহিত হন। ২০১৫ সালে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারা সংগ্রহ করে নিজের দুই বিঘা জমিতে ড্রাগনের আবাদ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ১০ বিঘা জমিতে ড্রাগন চাষ করছেন।
ইসমাইল জানান, প্রতি বছর প্রতি একর বাগান থেকে প্রথম পর্যায়ে বছরে ছয়-সাত লাখ টাকার ড্রাগন ফল বিক্রি করেন তিনি। পাশাপাশি চারা বিক্রি করেও আরো কয়েক লাখ টাকা আয় হয়। তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর গাছে ফলের পরিমাণ বাড়ছে এবং বছরের সাত মাস ধরেই এ ফল পাওয়া যায়। একবার চারা রোপণ করলে ৩০-৪০ বছর পর্যন্ত ফল পাওয়া সম্ভব, যা এ খাতকে দীর্ঘমেয়াদি লাভজনক করে তোলে।’
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা ও বিপণন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা গেলে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
ড্রাগন ফল চাষে ফলন বাড়াতে প্রয়োগ করা হচ্ছে অভিনব প্রযুক্তি। গাছকে বেশি সময় ধরে দিনের আলো অনুভব করাতে ব্যবহার হচ্ছে বিশেষ বৈদ্যুতিক বাল্ব। ফলে গাছের ধারণায় দিন বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে ১৮ ঘণ্টার মতো—সূর্য ডোবে রাত ১০টায়, আবার ওঠে ভোর ৫টায়। এভাবে দীর্ঘ সময় আলো পাওয়ায় গাছ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় চালু রাখতে পারে। ফলে বেশি পরিমাণ খাদ্য তৈরি করতে সক্ষম হয়, দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং আগেভাগেই ফুল ফোটে। আগাম উৎপাদনের লক্ষ্যেই বাগানজুড়ে এ কৌশলের প্রয়োগ করা হচ্ছে।
তবে চাষের এ সফলতার পেছনে রয়েছে বিভিন্ন সংকটও। চৌগাছার পাঁচনামনা গ্রামের উদ্যোক্তা সুমন হোসেন বলেন, ‘বিদেশী ফল চাষে সবচেয়ে বড় সংকট ভালো মানের চারা পাওয়া। এরপর রয়েছে সার ও কীটনাশকের ক্রমবর্ধমান মূল্য। বাজারে ভেজাল কীটনাশকে ভরে যাওয়ায় অনেক সময় তা ব্যবহারে গাছ মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়ে। এছাড়া ফলন ভালো হলেও বিক্রিতে সমস্যা দেখা দেয়। কারণ পর্যাপ্তসংখ্যক বেপারি পাওয়া যায় না। সরকারি ঋণ না পাওয়ায় অনেকেই চাষাবাদ সম্প্রসারণে পিছিয়ে পড়েন।’ তার মতে, সরকারিভাবে সহযোগিতা বাড়ালে বিদেশী ফল চাষে আরো বেশি বিস্তৃতি সম্ভব।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক আলমগীর বিশ্বাস বলেন, ‘প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে বিদেশী ফলচাষ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সরবরাহ করা হচ্ছে চারাও। অনেকেই প্রদর্শনী প্লটের সফলতা দেখে উৎসাহী হয়ে চাষে এগিয়ে আসছেন। বর্তমানে এ অঞ্চলে দুই হাজারের বেশি বিদেশী ফলের বাগান রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।’