বাগেরহাটে একের পর এক বন্ধ হচ্ছে নারকেল তেল কারখানা

একসময় বাগেরহাট ছিল নারকেল তেলের জন্য বিখ্যাত। বাগেরহাটকে নারকেল তেলের রাজধানী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অনেকেই। বর্তমানে একদিকে বাজারে মোড়কজাত তেলের আধিপত্য, অন্যদিকে পর্যাপ্ত নারকেলের অভাবে চাহিদা অনুযায়ী তেল উৎপাদন করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা।

একসময় বাগেরহাট ছিল নারকেল তেলের জন্য বিখ্যাত। বাগেরহাটকে নারকেল তেলের রাজধানী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অনেকেই। বর্তমানে একদিকে বাজারে মোড়কজাত তেলের আধিপত্য, অন্যদিকে পর্যাপ্ত নারকেলের অভাবে চাহিদা অনুযায়ী তেল উৎপাদন করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। ফলে দিন দিন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে জেলার নারকেল তেল কারখানাগুলো। নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান যন্ত্রাংশ। এছাড়া কর্মহীন হয়ে পড়েছেন কারখানা শ্রমিকরা। ২০ বছরের ব্যবধানে উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ১০ ভাগে। তার পরও হাতেগোনা কয়েকজন কারখানা মালিক ধরে রাখতে চান ব্যবসা।

জানা গেছে, আশির দশকে বাগেরহাটে ৬০টির অধিক কারখানায় উৎপাদিত হতো নারকেলের তেল। এর আগে ঘানিতে তেল উৎপাদন হতো। জেলার চাহিদা মিটিয়ে তেল চলে যেত ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়া, সিলেট, কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায়। তবে নারকেলের উৎপাদন কমায় ক্রমেই কারখনাগুলো বন্ধ হচ্ছে। বর্তমানে চালু আছে মাত্র ১০টি কারখানা। এর মধ্যে বিসিক শিল্প নগরীর ১৫টি কারখানার মধ্যে চালু আছে ছয়টি মিল। যার উৎপাদনও কমেছে প্রায় ৯০ ভাগ।

বিসিক কারখানা মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, বাগেরহাটের বিসিক শিল্প এলাকাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৬০টি নারকেল তেলের কারখানা চালু ছিল। তখন প্রতিদিন উৎপাদন হতো প্রায় ২৬ টন নারকেল তেল। সে উৎপাদন এখন নেমে এসেছে মাত্র ১০ ভাগে। নারকেল প্রক্রিয়াজাতের সঙ্গে জড়িত ছিল দুই হাজারের অধিক নারী পুরুষ শ্রমিক। তবে বর্তমানে বিসিকে ছয়টি এবং যাত্রাপুর, চুলকাঠি, সিএন্ডবি বাজারসহ মোট ১০টি তেলের মিল চালু রয়েছে।

বাগেরহাট শিল্প এলাকায় অবস্থিত কোকোনাট ওয়েল মিল সাহা এন্টারপ্রাইজ-এর স্বত্বাধিকারী জীবন কৃষ্ণ সাহা বলেন, ১৯৯৮ সালে মিলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দৈনিক ৫০০ কেজি তেল উৎপাদন হতো। চাহিদা থাকায় এক পর্যায়ে উৎপাদন বেড়ে ৮০০-৯০০ কেজিতে দাঁড়ায়। জেলায় দৈনিক নারকেল তেল উৎপাদন ছিল ২৪-২৫ টন। তখন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন অসংখ্য ব্যবসায়ী। কিন্তু ২০০৬ সালের দিকে বাজারে মোড়কজাত তেল বিক্রি শুরু হলে কমতে থাকে এখানকার তেলের চাহিদা। পাশাপাশি নারকেলের উৎপাদনও কমে যায়। বর্তমানে আমার কারখানায় দৈনিক ২০০ কেজির বেশি তেল উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। কারখানা চালুর প্রথম দিকে প্রতি কেজি তেল ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো। পরে ৬০০-৭০০ টাকা দরেও বিক্রি করেছি। এখন সে তেল বিক্রি করতে হচ্ছে ৪০০ টাকায়।

আরেক ব্যবসায়ী অশোক সাহা বলেন, নারকেল তেলের জন্য বাগেরহাট ছিল বিখ্যাত। দিন দিন তেলের উৎপাদন কমায় এখন আর সেই জৌলুস নেই। উৎপাদন বাড়লেও হাটে পর্যাপ্ত নারকেল ওঠে না। উৎপাদিত নারকেল বেশির ভাগই ডাব হিসেবে চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন শহরে। এতে শুকনা নারকেলের অভাব দেখা দিয়েছে হাটগুলোতে। পর্যাপ্ত নারকেলের জোগান না থাকার জন্যই আগের মতো তেল উৎপাদন হয় না বলে দাবি করেন ব্যবসায়ী।

বন্ধ হয়ে যাওয়া স্বর্ণালী অটো কোকোনাট অয়েল মিলের স্বত্বাধিকারী শংকর সাহা বলেন, একদিকে চাহিদা অনুযায়ী নারকেল পাই না, অন্যদিকে মোকামে পাইকারদের কাছে বকেয়া থাকায় মিল চালাতে কষ্ট হচ্ছিল। এর মধ্যে আবার করোনা মহামারী। সবকিছু মিলিয়ে মিল বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছি।

রামপালের চাকশ্রী এলাকার নারকেল ব্যবসায়ী শেখ ইউসুফ আলী বলেন, এক যুগ আগেও বিভিন্ন হাট থেকে পাঁচ-ছয় হাজার পিস নারকেল কিনতাম। বর্তমানে হাটে নারকেল না পাওয়ায় এক হাজারের বেশি নারকেল কেনা সম্ভব হয় না। আগের মতো ব্যবসা না হওয়ায় এখন সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়।

সদর উপজেলার বৈটপুর এলাকার বাসিন্দা রাজিব মল্লিক বলেন, আমার প্রায় ৩০টি নারকেল গাছ রয়েছে। আগে শুকনা নারকেল হাটে নিয়ে বিক্রি করতাম। কিন্তু এখন ডাব ক্রেতারা বাড়িতে এসে ডাব ক্রয় করে নিয়ে যায়। কষ্টও হয় না, দামও ভালো পাই।

তেল মিলের শ্রমিক হেলেনা বেগম বলেন, আট বছর আগে নারকেল ভেঙে প্রতি মাসে - হাজার টাকা আয় করতাম। বর্তমানে হাজার টাকার বেশি আয় করতে পারি না। অন্য কোনো কাজ না থাকায় বাধ্য হয়ে মিলে কাজ করছি। এর আগে অন্য দুটি মিলে কাজ করেছি। সে মিলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।

জেলা বিসিক কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শরিফ সরদার বলেন, বাগেরহাট বিসিক শিল্প এলাকায় ১৫টি নারকেল তেলের কারখানা চালু ছিল। এর মধ্য বর্তমানে নয়টি বন্ধ। বাকি ছয়টির উৎপাদনও আগের তুলনায় অনেক কম। নারকেলের সংকটের কারণে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে পড়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় নারকেল তেলের কারখানা গড়ে ওঠায় জেলার তেলের চাহিদাও কমে গেছে।

আরও