কভিড-১৯ মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় জনগণকে সাহস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আপনাদের শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সরকার সব সময় আপনাদের পাশে রয়েছে। গতকাল বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় গত বছরের মতো এবারো সবাইকে ঘরে বসে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানার পর দরিদ্র-নিম্নবিত্ত মানুষদের সহায়তার জন্য নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। পল্লী অঞ্চলে কর্মসৃজনের জন্য ৮০৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ৬৭২ কোটিরও বেশি টাকা বরাদ্দ দিয়েছি। এর মাধ্যমে দেশের প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ ৪২ হাজার নিম্নবিত্ত পরিবার উপকৃত হবে।
গত বছর কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের পর থেকে ভিজিএফ, টেস্ট রিলিফসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৫৩ কোটি টাকার ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি। কলকারখানায় যাতে উৎপাদন ব্যাহত না হয়, কৃষি উৎপাদন বাড়ে তেমন উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক, হকার, রিকশাওয়ালা, দোকান কর্মচারী, স্কুলশিক্ষক, মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন, অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সেবাদানকারী, সাংবাদিকসহ নিম্ন আয়ের নানা পেশার মানুষকে সহায়তা দিয়েছি। প্রায় আড়াই কোটি মানুষকে বিভিন্ন সরকারি সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে।
করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির কারণে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, গত সপ্তাহে দ্বিতীয় ঢেউ প্রবল আকার ধারণ করলে মানুষের চলাচলের ওপর আমাদের কিছু কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হয়। তার পরও সংক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে তাই আমাদের আরো কিছু কঠোর ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে। আমি জানি এর ফলে অনেকেরই জীবন-জীবিকায় অসুবিধা হবে। কিন্তু আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, সবার আগে মানুষের জীবন। বেঁচে থাকলে আবার সবকিছু গুছিয়ে নিতে পারব।
তিনি বলেন, মানুষের জীবন রক্ষার পাশাপাশি আমাদের অর্থনীতি, মানুষের জীবন-জীবিকা যেন ভেঙে না পড়ে সেদিকে আমরা কঠোর দৃষ্টি রাখছি। সবার সহযোগিতায় আমরা বেশকিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছিলাম। ফলে গত বছর করোনাভাইরাস মহামারীর প্রভাব আমরা সফলভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়েছি।
পর্যায়ক্রমে দেশের সবাইকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বিজ্ঞানীরা বেশ কয়েকটি ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছেন। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। আমাদের সৌভাগ্য টিকা উৎপাদনের শুরুতেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টিকার ডোজ আমরা নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। এরই মধ্যে ৫৬ লাখের বেশি মানুষকে প্রথম ডোজ টিকা দেয়া হয়েছে। যারা প্রথম ডোজ গ্রহণ করেছেন তাদের দ্বিতীয় ডোজ দেয়া শুরু হয়েছে। আমরা পর্যায়ক্রমে দেশের সবাইকে টিকার আওতায় নিয়ে আসব। আমাদের সে প্রস্তুতি রয়েছে। তবে টিকা দিলেই একজন সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। কাজেই টিকা নেয়ার পরও আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকাসহ সারা দেশের প্রতিটি জেলায় করোনাভাইরাস রোগীর চিকিৎসা সুবিধার আওতা আরো বাড়ানো হচ্ছে। করোনাভাইরাস রোগীদের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিদ্যমান আইসিইউ সুবিধা আরো বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমাদের সবাইকে সাবধান হতে হবে। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব নিজের, পরিবারের সদস্যদের ও প্রতিবেশীকে সুরক্ষা দেয়া। কাজেই ভিড় এড়িয়ে চলুন। বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করুন। নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে সরকার ১৮ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে অবশ্যই এ মহামারীকে আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হব।
সবাইকে ঘরে থেকে পহেলা বৈশাখ পালনের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত বছরের মতো এ বছরও আমরা বাইরে কোনো অনুষ্ঠান করছি না। কারণ করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ নতুন করে আঘাত হেনেছে সারা দেশে। দ্বিতীয় ঢেউয়ের করোনাভাইরাস আরো মরণঘাতী হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। পহেলা বৈশাখের আনন্দ তাই গত বছরের মতো এবারো ঘরে বসেই উপভোগ করব আমরা। টেলিভিশন চ্যানেলসহ নানা ডিজিটাল মাধ্যমে অনুষ্ঠানমালা প্রচারিত হবে। সেসব অনুষ্ঠান উপভোগ ছাড়াও আমরা নিজেরাও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘরোয়া পরিবেশে আনন্দ উপভোগ করতে পারি।