দক্ষিণাঞ্চলের বাণিজ্যক রুট হিসেবে পরিচিত যশোর-খুলনা মহাসড়ক। দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল, নওয়াপাড়া নদীবন্দর, মোংলা বন্দর ও ভোমরা স্থলবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার হয় এটি। অথচ ভোগান্তি পিছুই ছাড়ছে না গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম মহাসড়কটিতে। বসুন্দিয়া থেকে চেঙ্গুটিয়া পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার অংশ যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। টানা বৃষ্টিতে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। কোথাও হাঁটুসমান কাদা। দেখে বোঝার উপায় নেই এটি একটি মহাসড়ক। সীমিত হয়ে পড়ছে যান চলাচল। এ অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ এ বাণিজ্যিক রুটে পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
সড়ক বিভাগের তথ্য বলছে, শহরের পালবাড়ি মোড় থেকে অভয়নগরের রাজঘাট পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণে এরই মধ্যে ৩২১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। নতুন করে আরো ১৭২ কোটি টাকার কাজ চলমান।
সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের চালকরা বলছেন, মহাসড়কটি দেখলে মনে হবে চাষের জমি। বেহাল সড়কের কারণে নওয়াপাড়া নদীবন্দরে যেতে অনীহা দেখাচ্ছেন ট্রাকচালকরা। ফলে সঠিক সময়ে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানো নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ট্রাকচালক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রূপদিয়া থেকে নওয়াপাড়া পর্যন্ত সড়কটি খানাখন্দে ভরা। বিশেষ করে চেঙ্গুটিয়া থেকে বসুন্দিয়া অংশটি একেবারেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। রাস্তায় হাঁটুসমান কাদা। গাড়ি নিয়ে চলাচল করা কঠিন। অনেক গাড়ির এক্সেল ভেঙে আটকে যাচ্ছে। উল্টে রাস্তার পাশে পড়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন বাস ও ট্রাক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সড়কে ট্রিপ নিলে যানজটে দুই-তিনদিন আটকে থাকতে হয়।’
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সড়কটির বিভিন্ন অংশে আরসিসি ঢালাইয়ের কাজ চলছে। ২ হাজার ৩৫২ মিটার কাজের মধ্যে ৭০২ মিটার পড়েছে মুরলী মোড়ে। বাকিটা নওয়াপাড়া থেকে প্রেমবাগ গেট পর্যন্ত বিভিন্ন অংশে। কাজটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩১ কোটি ৬৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। কাজটি শুরু হয়েছে গত ২৩ মার্চ। এর আগে দুজন ঠিকাদার ৩২১ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কের অভয়নগরের রাজঘাট থেকে যশোরের পালবাড়ি মোড় পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটার নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে। তবে নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যেই সড়কটির বিভিন্ন অংশ বেহাল হয়ে পড়ায় আবার সংস্কার করতে হচ্ছে।
স্থানীয়রা বলছেন, মহাসড়কে প্রতিদিন কয়েক হাজার পণ্যবাহী ছোট-বড় যানবাহন চলাচল করে। সরকার ২০১৭ সালে সড়কটি সম্প্রসারণ ও পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। যদিও কাজের মেয়াদ কয়েক দফা বাড়িয়ে ২০২৩ সালে সম্পন্ন হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ে। এরপর থেকে লাগাতার সংস্কারকাজ চালানো হলেও তা কার্যকর হয়নি। চলাচলে দুর্ভোগের কারণে নওয়াপাড়া নৌবন্দর কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বিশেষ করে ভরা মৌসুমে সার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কৃষক বিপাকে পড়ছেন।
প্রেমবাগ এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সবুর বলেন, ‘গত তিন-চার বছর সড়কটির উন্নয়নকাজ চলমান। তবে সংস্কার শেষ হতে না হতেই আবার সড়ক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চেঙ্গুটিয়া বাজারে তিনটি স্কুল ও কলেজ রয়েছে। সড়কের হাঁটুসমান কাদার কারণে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সমস্যা হচ্ছে। যানবাহন চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।’
রাজিব হোসেন নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘মহাসড়কে ২০২২ সাল থেকে সংস্কারকাজ চলছে। সরকার এখানে কোটি কোটি টাকা খরচ করছে, কিন্তু সঠিকভাবে কাজ হয়নি। বরং দুর্নীতির কারণে সড়কটি খানাখন্দে ভরে গেছে।’
নওয়াপাড়া নদীবন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের বিভিন্ন পণ্য এ সড়ক দিয়ে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য জেলায় পাঠানো হয়। দেশের চাহিদার ৬০ ভাগ আমদানীকৃত সার মোংলা থেকে নদীপথে নওয়াপাড়া নদীবন্দরে এনে খালাস করা হয়। সেই সার ট্রাকের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়।
নওয়াপাড়া শিল্পনগরীর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান নওয়াপাড়া গ্রুপের ম্যানেজার রাজু আহমেদ বলেন, ‘নওয়াপাড়া শুধু একটি নৌবন্দর নয়, এটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পনগরীও। বন্দর দিয়ে দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানীকৃত সার খালাস করে বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। মহাসড়কের বেহাল অবস্থার কারণে সার সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে চেঙ্গুটিয়া থেকে বসুন্দিয়া পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার এতটাই খারাপ যে ট্রাকচালকরা যেতেই চান না।’
নওয়াপাড়া সার, সিমেন্ট ও খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী সমিতির নেতা নূরে আলম বাবু বলেন, ‘নওয়াপাড়া নৌবন্দর কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। সড়ক দ্রুত সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী না করলে সার ও খাদ্যশস্য সরবরাহ ব্যাহত হবে। সময়মতো কৃষকের হাতে সার পৌঁছাতে না পারলে তার প্রভাব পড়বে উৎপাদনে, যা থেকে খাদ্য সংকটও দেখা দিতে পারে।’
সওজ বিভাগ বলছে, সড়কের বিভিন্ন অংশে ঢালাই রাস্তা নির্মাণের কাজ চলমান। কাজ শেষ হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান মিলবে।
এ ব্যাপারে সওজ বিভাগ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মহাসড়কের মাটির গুণাগুণ ভালো নয়। আবার ওভারলোড যানবাহন চলাচলের কারণে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। বুয়েটের পরামর্শে ঢালাই রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছে। চার কিলোমিটার শেষ হয়েছে, ২ দশমিক ৩ কিলোমিটারের কাজ চলছে। আরো আট কিলোমিটার ঢালাই রাস্তা করা হবে। সব কাজ শেষ হতে দেড় বছর সময় লাগবে।’