নিলামে মূল্যস্তর বৃদ্ধি

চা বাগানগুলোর আয় বেড়েছে ৪৬৫ কোটি টাকা

কয়েক বছর টানা লোকসান গুনেছেন দেশের চা বাগান মালিকরা। উৎপাদন খরচের চেয়ে নিলামে বিক্রয়মূল্য কম হওয়ায় দেশে চায়ের উৎপাদন ও মান ধারাবাহিকভাবে কমছিল।

টানা দুই বছর নিলামে ন্যূনতম মূল্যস্তর বসানোয় পরিস্থিতি পাল্টেছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ নিলাম মৌসুমে আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৪৬৫ কোটি টাকা বেশি বিক্রয়মূল্য পেয়েছে দেশের পৌনে দুইশ চা বাগান ও ক্ষুদ্র চা চাষীরা।

দেশে বর্তমানে চা বাগান রয়েছে ১৭২টি। এছাড়া উত্তরাঞ্চল ও পার্বত্য দুই জেলায় ক্ষুদ্র পরিসরে চা চাষ হয়। কভিড-১৯-এর পর থেকে দেশে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বাড়লেও চায়ের দাম বাড়েনি। এর পর থেকে নিলামে দাম না বাড়ায় বাগানগুলোকে লোকসানে চা বিক্রি করতে হয়। ফলে দেশের এক-তৃতীয়াংশ চা বাগানই রুগ্‌ণ হয়ে পড়ে। অনেক বাগান মজুরি পরিশোধ করতে না পারায় শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি সামলাতে অনেক বাগান মালিক উৎপাদন কমিয়ে এবং সাধারণ মানের চা উৎপাদনের পথে হেঁটেছেন।

এমন পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালে দেশে প্রথমবারের মতো নিলামে চা বিক্রিতে লিকারভিত্তিক রেটিং বিবেচনায় ন্যূনতম মূল্যস্তর নির্ধারণ করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতে এক বছরেই চায়ের গড় দাম কেজিপ্রতি ৩০ টাকা বেড়ে যায়। কিন্তু চায়ের কস্ট অব প্রডাকশন (সিওপি) আরো বেশি হওয়ায় লোকসানের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি অনেক বাগান। এ কারণে বাগান মালিকদের সুরক্ষায় গত বছরের জুনে দ্বিতীয় দফায় নিলামে চা ক্রয়ে ন্যূনতম মূল্যস্তর বসায় চা বোর্ড। এতেই এক বছরের ব্যবধানে চা বিক্রিতে ৪৬৫ কোটি টাকা আয় বেড়েছে বাগানগুলোর।

দ্য কনসলিডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানির (বাংলাদেশ) প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা তাহসিন আহমেদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফ্লোর প্রাইস দেশের মুমূর্ষু চা খাতকে নতুন প্রাণ দিয়েছে। সমাপ্ত নিলাম বর্ষে ভালো দাম পাওয়ায় চলতি মৌসুমেও চায়ের উৎপাদন ভালো হবে। নিলামে চায়ের ভালো দাম পাওয়ায় পঞ্চগড়সহ দেশের পিছিয়ে থাকা বাগানগুলো পরিমাণের চেয়ে চায়ের মানে প্রাধান্য দিচ্ছে।’ এ ঘটনাকে চা খাতের জন্য ইতিবাচক বলে মনে করছেন এ কর্মকর্তা।

চা বোর্ডের তথ্য বলছে, সমাপ্ত ২০২৫-২৬ নিলাম বর্ষে দেশের তিনটি নিলাম কেন্দ্র যথাক্রমে চট্টগ্রাম, শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে ৯ কোটি ৬ লাখ ৫৮ হাজার কেজি চা বিক্রি হয়েছে। কেজিপ্রতি গড় মূল্য ২৪২ টাকা ২০ পয়সা হিসাবে ২ হাজার ২৪১ কোটি ১ লাখ টাকা আয় করেছেন বাগান মালিকরা। আগের মৌসুমের ৮ কোটি ৭৭ লাখ ২২ হাজার কেজি চা বিক্রি থেকে বাগান মালিকরা পেয়েছিলেন ১ হাজার ৭৭৬ কোটি ২ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে চা বাগান মালিকদের বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৪৬৫ কোটি টাকা। সর্বশেষ মৌসুমে ভালো মানের চা উৎপাদনকারী প্রায় সব বাগানই মুনাফার মুখ দেখেছে বলে জানিয়েছেন চা খাতসংশ্লিষ্টরা।

চলতি বছর দেশে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও ২০২৫ সালে ১০ কোটি ৩০ লাখ কেজি লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ২৭ হাজার কেজি। সর্বশেষ নিলাম মৌসুমে ভালো দাম পাওয়ায় এ বছর চা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াবে বলে আশা চা বোর্ডের।

একসময় সীমিত আকারে শুরু হলেও বর্তমানে দেশের দ্বিতীয় প্রধান চা উৎপাদনকারী অঞ্চল পঞ্চগড় জেলা। ২০২৫ সালে দেশে উৎপাদিত চায়ের ২১ শতাংশই হয়েছে উত্তরের এ জেলায়। শীর্ষে থাকা মৌলভীবাজার জেলায় উৎপাদন হয়েছে ৪৭ শতাংশ চা। এছাড়া হবিগঞ্জে ১৬ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে উৎপাদন হয়েছে ১১ শতাংশ চা। একসময় পঞ্চগড়ের বাগানগুলো উত্তোলনে বিলম্ব করায় মান কমে যেত। ফলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চা উৎপাদন করেও নিলামে কেজিপ্রতি ১০০-১৫০ টাকা দরে চা বিক্রি করতেন ক্ষুদ্র চা চাষীরা। সর্বশেষ নিলাম বর্ষের প্রথম নিলামে পঞ্চগড়ে কেজিপ্রতি চা বিক্রি হয়েছে গড়ে ২৪৬ টাকা ১৩ পয়সায়। মূলত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চা উৎপাদনকারী জেলার ভালো মানের চা সর্বশেষ নিলাম বর্ষে চায়ের গড় দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন চা খাতসংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশীয় চা সংসদের সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটা ঠিক যে ফ্লোর প্রাইসের কারণে নিলামে চায়ের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে জ্বালানিসহ উৎপাদনসংশ্লিষ্ট উপকরণের মূল্যবৃদ্ধিতে এ দামেও বাগানগুলো বিনিয়োগ তুলে আনতে পারছে না। চা বাগানে ব্যাংকগুলোর অর্থায়নে অনাগ্রহ এ খাতের উদ্যোক্তাদের বড় ধরনের সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে।’ এমন পরিস্থিতিতেও অনুকূল আবহাওয়াকে পুঁজি করে ভালো মানের চা উৎপাদনের মাধ্যমে দেশীয় চাহিদা পূরণে চা উদ্যোক্তারা কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

আরও