বিস্তৃত জলাশয় আর খালজুড়ে ছিল পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, যা শুধু যোগাযোগের মাধ্যমই নয়, এলাকার পরিবেশের ভারসাম্যও ধরে রাখত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সে চিত্র। পরিকল্পিত উন্নয়নের নামে একে একে গড়ে উঠেছে সরকারি দপ্তর, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। উন্নয়নের এ ধারায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেখানকার জলাশয়গুলো, যা আজ মানচিত্র থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
আগারগাঁও তাই আর আগের মতো জল-সবুজে ঘেরা কোনো শান্ত অঞ্চল নয়। কংক্রিটের ঘনত্ব এখানে এতটাই বেড়েছে যে আশপাশের পরিবেশে তার তাপমাত্রাগত প্রভাব স্পষ্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাশয় ও সবুজ কমে যাওয়ায় এলাকাটি এখন পরিণত হয়েছে ‘আরবান হিট আইল্যান্ডে’। গরমের দিনে তাই ওই অঞ্চলে স্বাভাবিক চলাচল ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো এলাকায় যখন কংক্রিটের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে জলাশয়, গাছপালা ও উন্মুক্ত ভূমি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়; তখন সে এলাকা আশপাশের তুলনায় অনেক বেশি তাপ শোষণ ও ধারণ করে। ফলে গ্রীষ্মকালে সেখানে অনুভূত তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৫-৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হতে পারে। আর এতে বিপন্ন হয়ে পড়ে ওই এলাকায় বসবাসরত প্রাণিকুলের জীবন।
আগারগাঁওয়ের বাসিন্দা ও নিয়মিত যাতায়াতকারীরা বলছেন, দুপুরের সময় এখানে হাঁটাচলা করা ক্রমেই কষ্টকর হয়ে উঠছে। সরকারি অফিস ও হাসপাতালকেন্দ্রিক ব্যস্ততা থাকলেও গরমের তীব্রতা যেন দিন দিন জীবনযাত্রাকে আরো দুর্বিষহ করে তুলছে।
পরিবেশবিদরা সতর্ক করছেন, এ প্রবণতা কেবল আগারগাঁও নয়, ঢাকার বিস্তৃত নগরায়ণের জন্যই এক বড় সংকেত। এমন বাস্তবতাই যেন ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনার সামনে নতুন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. এএসএম সাইফুল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিমেন্টেড এরিয়ায় যদি পর্যাপ্ত জলাশয় ও সবুজ এলাকা না থাকে তাহলে সেখানকার তাপমাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কংক্রিটের ভবন ও সড়ক দিনের তাপ ধরে রাখে। সূর্যের আলো কমে গেলে বা না থাকলে ধরে রাখা সে তাপ আবার প্রকৃতিতে ছেড়ে দেয়। ফলে রাতেও তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেশি থাকে।’
আগারগাঁওয়ের মতো পরিকল্পিত ও আধুনিক এলাকায় সবুজ ও জলাশয় কমে যাওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করেন ড. এএসএম সাইফুল্লাহ। পরিবেশের এ অধ্যাপক বলেন, ‘এখানে বড় বড় হাসপাতাল ও সরকারি অফিস রয়েছে, কিন্তু তাপ শোষণের জন্য প্রয়োজনীয় জলাশয় নেই। এটা অবশ্যই পরিকল্পনাগত অবহেলা।’
ঢাকার শেরেবাংলা নগর ও আগারগাঁও এলাকার উন্নয়ন নিয়ে পূর্ববর্তী মাস্টারপ্ল্যান বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে জলাশয় সংরক্ষণের ওপর জোর দেয়ার বিষয়টি। শেরেবাংলা নগরকে নিয়ে পাকিস্তান আমলে সমন্বিত পরিকল্পনা করেন স্থপতি লুই আই কান। তার প্রণীত মহাপরিকল্পনার তৎকালীন মানচিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী ও মিরপুরের মধ্যবর্তী এলাকাটিই বর্তমান শেরেবাংলা নগর। এখানকার জলাশয়গুলোকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেই উন্নয়ন পরিকল্পনা করেছিলেন লুই আই কান। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাজধানীর সীমা বাড়াতে গিয়ে পরিকল্পনাটি বদলে ফেলা হয়। নতুন পরিকল্পনায় জলাশয় সংরক্ষণের বিষয়টিকে আর গুরুত্ব দেয়া হয়নি।
সরকারি দপ্তর নির্মাণের জন্য আশির দশকে শুরু হয় ভূমি অধিগ্রহণ। সংসদ ভবনকে ঘিরে পাল্টাতে থাকে ওই এলাকার চিত্র। তখন শেরেবাংলা নগরে পাকা ভবন বলতে ছিল শুধু সংসদ ভবন, এমপি হোস্টেল ও স্টাফ কোয়ার্টার। বাকি এলাকাজুড়ে ছিল টিনের ঘরবাড়ি, নিচু ভূমি আর জলাশয়। ২০০০-০৫ সময়কালে বেশকিছু অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। ২০১০ সালের পর আগারগাঁও এলাকায় একের পর এক বৃহৎ সরকারি ভবন নির্মিত হয়। জলাশয় ও নিচু ভূমি ভরাট করে স্থাপনা গড়ে তোলায় প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষমতা প্রায় হারিয়ে যায়।
আগারগাঁও এখন কার্যত জলাশয়বিহীন একটি নগর অঞ্চল বলে জানান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘১৯৫৯ সালে শেরেবাংলা নগর নিয়ে করা পরিকল্পনায় আগারগাঁওকে রাখা হয় সচিবালয়ের জন্য। স্বাধীনতার পর সে পরিকল্পনা বদলে যায়। এখন আগারগাঁওয়ে সরকারি অফিসগুলো স্থানান্তর হয়েছে, কিন্তু সেখানে কোনো জলাশয় নেই। সম্প্রতি আমরা একটি গবেষণার জন্য ঢাকার বিভিন্ন এলাকার জলাশয়ের তথ্য কালেকশন করতে শিক্ষার্থীদের পাঠাই। কিন্তু তারা আগারগাঁওয়ে তেমন কোনো জলাশয় পায়নি।’
এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় তিনি বিকল্প নগর পরিকল্পনার ওপর জোর দেন। অধ্যাপক মনিরুজ্জামান বলেন, ‘তাপ দুর্যোগ থেকে আগারগাঁওকে বাঁচানোর জন্য সবুজের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি ছোট ছোট জলাশয় তৈরি করা জরুরি। এক্ষেত্রে রাস্তার এক পাশে ২০ ফুটের মতো বড় ড্রেন বানানো যেতে পারে। তখন এটি বৃষ্টির পানি যেমন সরিয়ে নেবে, একই সঙ্গে জলাশয়ের ঘাটতিও কিছুটা পূরণ করবে। বাইরের দেশে এ রকম চর্চা দেখেছি।’
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শেরেবাংলা নগরে বড় জলাশয় ছিল অন্তত সাতটি। এর মধ্যে আইডিবি ভবন থেকে লায়ন্স হাসপাতাল পর্যন্ত একটি; সংগীত কলেজের চারপাশে নিচু ভূমি ও জলাশয়; ইউজিসি ভবনের পাশে একটি; শেরেবাংলা বয়েজ স্কুল, এলজিইডি ভবন ও পাসপোর্ট অফিস এলাকাজুড়ে আরো একটি; জিটিসিএল, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, শ্যামলী ১ নম্বর রোডের শেষ মাথা পর্যন্ত বিশাল ডোবা; বেতার ভবনের পেছনে একটি এবং শেরেবাংলা গার্লস স্কুলের পেছনে একটি বড় জলাশয় ছিল। এর মধ্যে চারটির এখন কোনো অস্তিত্বই নেই। কেবল ইউজিসি ভবন, বেতার ভবন ও শেরেবাংলা বয়েজ স্কুলের তিনটি জলাশয় আংশিকভাবে টিকে আছে। অবকাঠামো উন্নয়ন করতে গিয়ে সেগুলোও এখন ভরাটের পরিকল্পনা চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। জলাশয় ভরাট করে ওই এলাকায় গড়ে উঠেছে পাসপোর্ট অফিস, এলজিইডি ভবন, আইডিবি ভবন, বেতার ভবনের নতুন বিল্ডিং, ইউজিসির নতুন ভবন, শেরেবাংলা বয়েজ স্কুল, লায়ন্স হাসপাতাল, ফিল্ম আর্কাইভ ভবন, পরিবেশ অধিদপ্তর ভবন, মমতা বহুমুখী মার্কেট, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, জিটিসিএল কার্যালয়, কিডনি হাসপাতাল, নাক-কান-গলা হাসপাতালসহ সরকারি অনেক অফিস।
ঢাকাসহ দেশের পাঁচটি বড় শহর—চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেটে তাপমাত্রার ঝুঁকি নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় বছর দুই আগে। যুক্তরাজ্যের ব্রুনেল ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) এবং সরকারের দুটি সংস্থা মিলে গবেষণাটি পরিচালনা করে। তাতে দেখা যায়, পাঁচটি শহরের মধ্যে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকি ঢাকার নগর এলাকার। এখানে ২০০৫-১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় দেড় দশকে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়েছে দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপ্রতুল পানির আধার, বৃক্ষনিধন আর কংক্রিটের আচ্ছাদনের কারণে ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলো পরিণত হয়েছে আরবান হিট আইল্যান্ডে। ফলে নগরীর তাপমাত্রা ৩৪-৩৬ ডিগ্রি থাকলেও তার অনুভূতি ৪০-৪২ ডিগ্রিতে গিয়ে পৌঁছায়। এ কারণে গরমের মৌসুমে এ নগরীর তাপমাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়। বিভিন্ন এলাকায় পানিরও তীব্র সংকট দেখা দেয়। বাড়ে রোগবালাইয়ের প্রবণতাও। আগারগাঁওয়ের বর্তমান সংকটও কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত অবহেলার ফল।
ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শহরের প্রয়োজনে অফিস ও হাসপাতাল অবশ্যই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। কিন্তু কোনো এলাকা উন্নয়ন করতে এবং সেটিকে বাসযোগ্য রাখতে হলে অন্তত ১০-১৫ শতাংশ জলাশয় সংরক্ষণ করা জরুরি। জলাশয় শুধু তাপ শোষণই করে না; বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, অগ্নিকাণ্ডের সময় পানি সরবরাহ, বিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং সামগ্রিক পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আগারগাঁওয়ের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অবশ্য এ মৌলিক বিষয়গুলো উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে অত্যাধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ হলেও এলাকার পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।’
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, আগারগাঁওয়ের অভিজ্ঞতা শুধু একটি এলাকার গল্প নয়; এটি পুরো ঢাকার নগর উন্নয়ন দর্শনের প্রতিচ্ছবি। উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা না করা গেলে ভবিষ্যতের নগর জীবন আরো কঠিন হয়ে উঠবে। আর তাই আগারগাঁও আজ শুধু একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র নয়, বরং নগর পরিকল্পনার সাফল্য ও ব্যর্থতার জীবন্ত এক উদাহরণ। ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহের মাত্রা বাড়লে এসব ভবন আরো বেশি শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়বে। এতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে এবং নগর পরিবেশের ওপরও সৃষ্টি হবে অতিরিক্ত চাপ।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকায় প্রয়োজনের চেয়ে কম জলাশয় ও সবুজ ভূমি রয়েছে। ফলে পুরো ঢাকাই আরবান হিট আইল্যান্ডে পরিণত হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পিত এলাকা হিসেবে আগারগাঁওয়ে পর্যাপ্ত জলাশয় রাখার সুযোগ ছিল। সরকার এখনো চাইলে জলাশয় ও সবুজ সৃষ্টি করতে পারে। সে সুযোগ রয়েছে। জলাশয় সৃষ্টি না করে আসলে কোনো উপায়ও নেই।’