পুরনো বছরের শেষ দিন ও নতুন বছরে পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্যে অবকাশযাপনে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়ে মুখরিত হয়ে ওঠে পার্বত্য শহর রাঙ্গামাটি। গত বৃহস্পতিবার থেকে পর্যটন শহর রাঙ্গামাটিতে ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের আনাগোনা বেড়েই চলেছে। খ্রিস্টীয় বছরের শেষ দিন ও নতুন বছরের শুরুতে পাহাড়ে অবকাশযাপনে অন্যান্য বছরের মতো এবারো বিপুলসংখ্যক পর্যটক এসেছেন। এতে ফের প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে পর্যটন খাতে।
গতকাল জেলা শহরে অবস্থিত ‘সিম্বল অব রাঙ্গামাটি’
খ্যাত ঝুলন্ত সেতু, পলওয়েল পার্ক, রাঙ্গামাটি পার্ক, আরণ্যক, আসামবস্তি, বার্গী লেক ভ্যালিসহ বিভিন্ন পর্যটন ও বিনোদনকেন্দ্রে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ নীল জলে নৌ-ভ্রমণ করতে দেখা গেছে অনেককেই। আবার কেউ কেউ ঐতিহ্যবাহী সুবলং ঝরনায় গিয়ে ঝরনায় পানি না থাকায় তা দেখে হতাশ হয়ে ফিরে এসেছেন। তবে করোনার এই সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মানতে ও মানাতে পর্যটক ও সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা লক্ষ করা গেছে।
এদিকে, শহরে পর্যটকদের উপস্থিতিতে স্থানীয় হোটেল-মোটেল ব্যবসা, টেক্সটাইল পণ্যসহ পর্যটন খাতসংশ্লিষ্টদের ব্যস্ততা বেড়েছে। পর্যটক এলাকার ভাসমান মৌসুমি ফল ব্যবসায়ীরা জানান, রাঙ্গামাটিতে আসা পর্যটকদের এখানকার স্থানীয় আনারসের প্রতি আগ্রহ বেশি। পর্যটকে লোকারণ্য হওয়ায় আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যেও গতি ফিরেছে। এভাবে চললে আমরা আর্থিকভাবে আরো লাভবান হব।
গতকাল বিকালে রাঙ্গামাটি জেলা শহরের তবলছড়ি এলাকায় অবস্থিত টেক্সটাইল মার্কেটে গিয়ে দেখা গিয়েছে সেখানেও পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত পর্যটকরা স্থানীয়ভাবে তৈরি, থামি, গামছা, শীতের চাদরসহ বিভিন্ন বার্মিজ পণ্য ক্রয় করছেন। টেক্সটাইল মার্কেটের কয়েকজন বিক্রেতা জানান, বছরের সব সময় বেচাকেনা হয় না। বিশেষত ভ্রমণ মৌসুমে বেচাকেনা বাড়ে। বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত পর্যটকদের পাহাড়ি শীতের চাদরের প্রতি আগ্রহ বেশি।
রংপুর থেকে আগত পর্যটক আবু সালেহ মো. শিহাব জানান, সাজেক ঘুরে রাঙ্গামাটি শহরে পরিবার নিয়ে বেড়াতে এসেছি। সাজেকের কংলাক পাহাড় চূড়া ও নয়নাভিরাম কাপ্তাই হ্রদ আমাকে মুগ্ধ করেছে। এর আগে কখনো পাহাড়ে আসা হয়নি। প্রথমবারের মতো এখানে এসে পাহাড়ের প্রেমে পড়েছি। সময়স্বল্পতার কারণে বান্দরবানে যেতে পারিনি। তবে আগামীতে পাহাড়ের তিন জেলায় সময় নিয়ে বেড়ানোর জন্য আবার আসব।
চট্টগ্রাম থেকে আসা দীপংকর সাহা বলেন, রাঙ্গামাটিতে বিভিন্ন সময়ে নানান কাজেই আসা হয়েছে। এখানকার সুবিশাল কাপ্তাই হ্রদ দূর-দূরান্ত থেকে আগত পর্যটকদের মন কাড়বেই।
ঢাকা থেকে আসা রিমি-সালেহ দম্পতি জানান, রাঙ্গামাটির ঝুলন্ত সেতুতে আসার অধীর আগ্রহ দীর্ঘদিনের। নতুন বিয়ে করেছি, তাই নতুন মানুষকে সঙ্গে করে প্রথমে এখানেই এলাম। ঝুলন্ত সেতু, পলওয়েল পার্ক ও কাপ্তাই হ্রদ সবকিছুরই সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করেছে। পর্যটন ঝুলন্ত সেতু এলাকার ভেতরে কোনো পাবলিক টয়লেট নেই, এটি আমাদের বিরক্ত লেগেছে। এত নামডাকের একটি স্থানে এমন উদাসীনতা কারোরই ভালো লাগার মতো নয়।
রাঙ্গামাটি পর্যটন বোটঘাটের ব্যবস্থাপক রমজান আলী বণিক বার্তাকে বলেন, থার্টিফার্স্ট নাইট ও নতুন বছরের আগমনকে সামনে রেখে রাঙ্গামাটিতে বিপুল পরিমাণ পর্যটক এসেছেন। প্রতি বছরই শীতকালীন এ সময়ে রাঙ্গামাটিতে পর্যটকদের সমাগম বেড়ে যায়; এবারো তেমনটাই হয়েছে। গত কয়েকদিনে আমাদের ট্যুরিস্ট বোট চালকরাও ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। পর্যটকরা কাপ্তাই হ্রদের বিভিন্ন প্রান্তে ট্যুরিস্ট বোটে করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তবে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আগের চেয়ে ট্যুরিস্ট বোট ভাড়া কিছুটা বেড়েছে।
পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স রাঙ্গামাটির ব্যবস্থাপক সৃজন বিকাশ বড়ুয়া জানান, বর্তমানে পর্যটক মৌসুম হিসেবে আমরা একটা ভালো সময় পার করছি। আমাদের হোটেল-মোটেল ও ঝুলন্ত সেতুতে বিপুল পরিমাণ পর্যটক এসেছেন। পর্যটকদের সেবায় আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। এদিকে, মেঘের উপত্যকা হিসেবে পরিচিত রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত নয়নাভিরাম পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালিতেও পর্যটকদের উপস্থিতি বেড়েছে। বছরের শেষ সূর্যাস্ত ও প্রথম সূর্যোদয় দেখতে সাজেকে ভিড় জমিয়েছেন পর্যটকরা। রাঙ্গামাটি কটেজ মালিক সমিতির হিসাব বলছে, সাজেকে অবস্থিত শতাধিক কটেজ-রিসোর্ট বর্তমানে প্রায় শতভাগ পরিপূর্ণ হয়েছে।
রাঙ্গামাটি জেলা হোটেল-হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি মঈনুদ্দীন সেলিম বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, গত তিন-চারদিনে পার্বত্য শহর রাঙ্গামাটিতেই অগণিত পর্যটকের সমাগম ঘটেছে। আমাদের সমিতির তালিকাভুক্ত প্রায় ৪৫ হোটেলে আনুমানিক ১০-১২ হাজার পর্যটক অবকাশযাপন করতে পারেন। এই সময়টাতে প্রায় সব হোটেলই ৮০-৯০ শতাংশ পরিপূর্ণ ছিল। আগামী আরো কয়েকদিন রাঙ্গামাটিতে পর্যটকদের চাপ থাকার আশঙ্কা করেছেন এ আবাসিক হোটেল ব্যবসায়ী।