বিশ শতকের প্রথমার্ধ। ঔপনিবেশিক বাংলায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে দশমিক ৮ শতাংশ। কৃষির প্রবৃদ্ধি দশমিক ৩ শতাংশ। ১৯২০-৪৬ সালের মধ্যে কৃষির উৎপাদনে নিম্নহার থাকায় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্য ও কাজ জোগানো যায়নি। নতুন জমি আর চাষে আসেনি। এজন্য যে পুঁজি দরকার, তা সাধারণের হাতে ছিল না। সেচের ব্যবস্থা, সারের ব্যবহার, বছরে একাধিক ফসল, উন্নত কৃষি যন্ত্রপাতি, উন্নত বীজ ব্যবহারের মতো বিষয়ে বিশেষ উন্নতি ঘটেনি। পাট ছিল বাংলার কৃষিজ পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ পাটের বাজার ছিল বৈদেশিক চাহিদার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। বিশ্ববাজারে পাটের চাহিদা ওঠানামার ওপর নির্ভর করে বাংলার পাট চাষীরা শক্তিশালী হতে পারেননি। ব্রিটিশ শাসনামলে ফরিদপুর জেলার সেটলমেন্ট কর্মকর্তা জে সি জ্যাক তার দি ইকোনমিক লাইফ অব আ বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গ্রন্থে জানিয়েছেন, বিশ শতকের শুরুর ভাগে বাংলায় কৃষকরা অধিক হারে ঋণগ্রস্ত হতে শুরু করেন। ১৯১৬ সালে বাংলার কৃষক পরিবারপ্রতি ঋণ ছিল গড়ে ৫৫ টাকা। ৫৫ শতাংশ পরিবার তখনো ঋণমুক্ত। সুদের হার ছিল ৩৬ থেকে ৪৮ শতাংশের বেশি। ১৯৩০-এর দশকের শুরুতে ফরিদপুরে জমি আছে এমন কৃষক পরিবারের মাত্র ১৭ শতাংশ ঋণমুক্ত ছিল। কৃষক পরিবারপ্রতি ঋণের পরিমাণ তখন ২১৭ টাকা। (পৃ. ৭৭-৭৮) কৃষকদের ঋণগ্রস্ত হওয়ার এ চিত্র এখানকার মানুষের অর্থনৈতিক ভাগ্যের স্থবিরতার দিকে ইঙ্গিত করে। বাংলার অর্থনীতির এ গতিহীন চেহারা মানুষের জীবনকে দারিদ্র্যের চক্রে আটকে রেখেছিল। ১৯৪৫ সালের মার্চে বাংলার গভর্নর আর. জি. কেসি ভারতের গভর্নর ওয়াভেলকে লিখেছিলেন, ‘বাংলার কৃষি ব্যবস্থা মধ্যযুগীয়। রাস্তাঘাট নেই, শিক্ষা নেই, কুটির শিল্প নেই।’ এ অবস্থার জন্য মোগলদের পাশাপাশি ব্রিটিশ প্রশাসনের প্রায় শত বছরের দায়ও স্বীকার করেছেন বাংলার এ গভর্নর। বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসনের শুরু হয়েছিল ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষ দিয়ে। সমাপ্তিটাও ঘটে ব্রিটিশ শাসনে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের দায় নিয়ে।
ঔপনিবেশিক আমলে এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল, যাতে কেবল কেরানি তৈরি হয়, শিল্প কিংবা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন না হয়। ফলে আধুনিক ব্যাংকিং, বীমা, রাস্তাঘাট ও যানবাহনের উন্নতি হয়নি। রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এখানকার অভিজাতবর্গের ভাগ্য বদলেছে। সাধারণ মানুষের ভাগ্যে পরিবর্তন আসেনি। কৃষক ও শ্রমজীবীদের খোরাকি অর্থনীতিই এখন পর্যন্ত শহর ও গ্রামের সাধারণ মানুষের ভাগ্যকে ঘিরে রেখেছে।
১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শোষণ ও সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হয়ে মুসলমানদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা হলো নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ইনসাফভিত্তিক একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানকে গড়ে তোলার কথা বলেন। কিন্তু পাকিস্তানের পূর্ব অংশের মানুষ যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করেছিলেন তা ধীরে ধীরে ফিকে হতে শুরু করে। পাকিস্তান জন্মের কয়েক বছরের মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ভাষার ওপর আঘাত আসে। তখন থেকে আত্মপরিচয়ের নতুন আকাঙ্ক্ষা মাথাচাড়া দিতে শুরু করে। এরপর অর্থনীতিতেও পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীরা তাদের অধিকার হারাতে থাকে। মাথাপিছু আয়, শিক্ষা-চাকরির সুযোগ, প্রশাসন, সেনাবাহিনী—সবখানেই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পশ্চিম অংশের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে নানা বৈষম্যের শিকার বাঙালি পাকিস্তান পর্বেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন, ন্যায্যতার দেখা পেল না। বৈষম্য ও গোষ্ঠীতন্ত্রের বিরুদ্ধে আবারো সংগ্রামে নামতে হলো পূর্ববঙ্গের জনগোষ্ঠীকে। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা পেল স্বাধীন বাংলাদেশ।
স্বাধীন বাংলাদেশ জন্মের অর্ধশত বছর পার হলেও এ দেশের মানুষ বৈষম্য থেকে মুক্তি পায়নি। ২০২৪ সালে এসেও বৈষম্য ও গোষ্ঠীতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম-অভ্যুত্থান ঘটাতে হয়েছে, যেমনটা পাকিস্তান থেকে আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে করতে হয়েছিল। স্বৈরাচারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হয়েছে। প্রাণ দিতে হয়েছে শিশু, কিশোর, ছাত্র-তরুণ, নারী, শ্রমজীবী, দিনমজুরকে। ১৯৭১ সালে প্রাণ দিতে হয়েছিল বারশ মাইল দূরে থাকা শাসকদের হাত থেকে স্বাধীনতা পেতে। আর ২০২৪ সালে সেই স্বাধীনতা আনার দাবিদার দলটি নিজ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে প্রাণঘাতী অস্ত্র। এ ঘটনাকে গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের বাইনারিতে ব্যাখ্যা করা হলেও এর সূত্র লুকিয়ে আছে বৈষম্যের মাঝে। বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে পূর্ববঙ্গের মানুষ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু স্বাধীনতার পর গত ৫৩ বছর পার হলেও বৈষম্য কমেনি বাংলাদেশে—প্রতি চারজনে একজন এখানে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার। দেশের বেশির ভাগ সম্পদ ঘনীভূত হয়েছে ৫ শতাংশ মানুষের হাতে। সৃষ্টি হয়েছে অলিগার্ক। এ অলিগার্কদের অনেকে আবার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ছেড়েছেন। উল্টোদিকে ২০২৪ সালে প্রকাশিত অক্সফোর্ড পোভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ ও ইউনাইটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রতি চারজনে একজন বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের (মাল্টিডাইমেনশনাল পোভার্টি) সীমায় বাস করেন। আধুনিক যুগে শুধু মাথাপিছু আয় দারিদ্র্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানের জন্য নিরাপদ পানি, পুষ্টি, কর্মসংস্থান—এ রকম আরো অনেক বিষয় এখন মানুষের জীবনমানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এবং এগুলো সবই তার দারিদ্র্যের সীমার সূচক (ইন্ডিকেটর)। অক্সফোর্ড পোভার্টি অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, বাংলাদেশের ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার। অর্থাৎ প্রতি চারজনে একজন।
এত দারিদ্র্য ও বৈষম্যের মধ্যেও এখানকার মানুষকে ঐক্যসূত্রে বেঁধে রেখেছে তার ভাষা ও বর্ণমালা। তাদের ঐক্য ও পরিচয়ের মৌল উপাদান বাংলা ভাষা ও বর্ণমালা। বাংলা বর্ণমালার জন্ম ব্রাহ্মীলিপি থেকে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সম্রাট অশোকের আমলে এ লিপির নিদর্শন পাওয়া যায়। এ সময়ে কোনো বর্ণের আকার বড়শি আর কোনোটার আকার ক্রুশের মতো। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে কুশান আমলে লিপিতে আসে বড় পরিবর্তন। মূলত কুশানদের পরেই ব্রাহ্মীলিপি উত্তরী ও দক্ষিণী–এই দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। উত্তরী লিপিগুলোর মধ্যে পূর্বদেশীয় গুপ্তলিপি প্রধান, এটি চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে প্রচলিত ছিল। গুপ্তলিপি থেকে সিদ্ধমাতৃকালিপি হয়ে আবির্ভাব ঘটে কুটিললিপির, যা নয় শতক পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। কুটিললিপি থেকে উদ্ভব হয় নাগরীলিপির। প্রাচীন নাগরীলিপির পূর্ব শাখা থেকে দশম শতকের শেষভাগে এসে উৎপত্তি হয়েছে বাঙলালিপির। অর্থাৎ ব্রাহ্মীলিপি > অশোকলিপি বা মৌর্যলিপি > কুশাণলিপি > উত্তরী গুপ্তলিপি (পূর্বদেশীয়) > কুটিললিপি > নাগরীলিপি > বাঙলালিপি।
বাংলার পাল যুগে আসে সিদ্ধমাতৃকালিপি, যা সমগ্র উত্তরাপথ জুড়ে পাল সাম্রাজ্যে ব্যবহৃত হয়েছিল। বাংলার রাজনৈতিক উত্থান, এ অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের তান্ত্রিক ধারার প্রসার এবং এ সিদ্ধমাতৃকালিপির মধ্যে সংযোগ ঘনিষ্ঠ। তন্ত্রধারা একসময় বাংলায় আধিপত্য করেছে। খোদ চর্যাপদও তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের সিদ্ধদের দ্বারাই লেখা। এজন্যই ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা সাহিত্যের আরম্ভ ৬৫০ সাল বিবেচনা করতে চান। যা হোক, বাঙলালিপির বিবর্তনের চূড়ান্ত রূপ লাভ করে এগারো ও বারো শতকে। এ সময়ে লিপির সঙ্গে বর্তমান বাংলা লিপির পার্থক্য সামান্যই। তেরো শতকের মাঝামাঝি থেকে সতেরো শতক পর্যন্ত বাংলা লিপিতে রচিত সাহিত্য তার বড় প্রমাণ। ১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দে আমস্টারডাম থেকে প্রকাশিত ‘চায়না ইলাস্ট্রেটা নামক বইয়ে বাংলা বর্ণমালার নমুনা ছাপা হয়েছিল। ১৭৪৩ সালে লাইডেন থেকে প্রকাশিত ‘ডিসারতিও সিলেকটা’ নামের বইয়েও ছাপা হয় বাংলা বর্ণমালার নমুনা। নিজস্ব বর্ণমালা বাংলা ভাষাকে স্থায়ী করেছে।
বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সমীকরণে শাসকের ভাষা বদলে গেলেও এখানকার জনভাষা বাংলার প্রভাবকে ম্লান করতে পারেনি। বরং শাসকগোষ্ঠীই এখানকার ভাষাকে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে সময়ের প্রয়োজনে। আর এজন্যই দেখা যায়, স্বাধীন সুলতানি আমলেই ভাষা ও সাহিত্যের জাগরণ ঘটে। সুলতানি আমলে কাব্যচর্চায় উজ্জ্বল হয়ে আছেন—চণ্ডীদাস, মালাধর বসু, বিপ্রদাস পিপলাই, বিজয়গুপ্ত। এ সময় বাংলা অনুবাদ করেছেন কৃত্তিবাস ও কবীন্দ্র পরমেশ্বর। পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কখনো ছিলেন গিয়াস উদ্দীন আজম শাহ, কখনো বা জালাল উদ্দীন মুহম্মদ শাহ; কখনো রুকন উদ্দীন বরবক শাহ আবার কখনো আলাউদ্দিন হোসেন শাহ। স্রোতে যুক্ত ছিলেন শাহ মুহম্মদ সগীর, আলাউল, দৌলত উজির, শেখ ফয়জুল্লাহর মতো অজস্র নাম। ফলে চর্যাপদ ও শূন্যপুরাণ থেকে শুরু করে হাল আমল পর্যন্ত বাংলার যে ভাষিক উত্তরাধিকার, তা অন্য অনেক ভাষার তুলনায় সমৃদ্ধ। শাসক ও অভিজাতের ভাষায় বদল এলেও সাধারণ মানুষ বাংলার ভেতর দিয়েই নিজেদের হাসি ও কান্নাকে প্রকাশ করেছে যুগের পর যুগ। যখনই সেই ভাষিক ঐতিহ্যে আঘাত এসেছে, তারা হয় নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে; নাহলে প্রতিরোধ করেছে।
ফোর্ট উইলিয়াম যখন ভদ্রলোকের ভাষা নির্মাণ করছিল তখন বাংলার নানা স্থানে চলছে পুঁথি চর্চা। পুঁথির ভাষা ও বিষয়বস্তু বঙ্গীয় জনপদের বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। এখনো বাংলার শব্দভাণ্ডারে দেখা যায় বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলমান উপাদান। মঙ্গলকাব্যের কবিদের তালিকায় যেমন মুসলমান পাওয়া যায়; মর্সিয়া সাহিত্যে সেভাবেই পাওয়া যায় হিন্দু নাম। ফলে ভাষা যেন এখানে স্বতন্ত্র এক পরিচয় দাঁড় করিয়েছে গত হাজার বছরে। সেই পরিচয়ের রাজনীতি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রামে ভাষা পালন করেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। শাসকের চোখ রাঙানো কিংবা ধর্মীয় ভেদ—কোনোটাই বাংলাদেশের মানুষকে তার নিজস্ব ভাষা চর্চার আবেগকে দমিত করতে পারেনি।
মানুষের ভৌগোলিক অবস্থান, জীবিকা, শ্রম, সংগ্রাম থেকে একসময় ভাষা আর সুরের আশ্রয়ে তৈরি হয় গান। জুলাই অভ্যুত্থান যে আমাদের মুক্তির গান গাওয়ার সুযোগ নিয়ে এসেছে। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের বেশি সময়ের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন আমাদের সমাজের সামান্য স্বাধীনতাও হরণ করেছিল। তাই জুলাই অভ্যুত্থানের পর মানুষ যে মুক্ত পরিবেশ ফিরে পেয়েছে, সেখানে সবাই বিভিন্নভাবে তাদের মুক্তির স্বাদকে উদযাপন করেছে। এর মধ্যে একটি ছিল তরুণদের উদ্যোগে কাওয়ালির আসর। এই কাওয়ালি এ সময়ের মুক্তির গান হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মুক্তির গান আছে নিজেদের সংস্কৃতিতেই, যা পূর্বপুরুষরা তাদের রক্ত-ঘামে তৈরি করে রেখে গেছেন।
নদী, গ্রাম আর কৃষি সমাজ—এ নিয়েই বাংলার সংস্কৃতির গড়ন ও বিকাশ। এক জাতির মধ্যেও এসব উপাদানের রকমফের সংস্কৃতিতে ভিন্নতা আনতে পারে। চট্টগ্রামের গানে পাওয়া যাবে সাম্পানের কথা, উত্তরবঙ্গে তা অনুপস্থিত। রংপুরের চরে গরুর গাড়িই ছিল ভরসা, নিঃসঙ্গ গাড়োয়ানের কণ্ঠে কোনো একদিন জন্ম নিল ভাওয়াইয়ার সুর—কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই দরাজ গলায় কেউ একদিন গেয়ে উঠেছিলেন—ওকি গাড়িয়াল ভাই....। রংপুরের ভূগোল আর মানুষের পেশাই জন্ম দিয়েছে ভাওয়াইয়ার। আবার নদীবিধৌত ময়মনসিংহ অঞ্চলে পাওয়া যাবে ভাটিয়ালির সুর। নদীর পাড়ের মানুষ কিংবা নৌকার মাঝি—তাদের গান ভাটিয়ালি। নদীর স্রোত আর তার ছুটে চলার দর্শন সবই প্রতিধ্বনিত হয় ভাটিয়ালির সুর ও কথায়। মন মাঝি তোর বৈঠা নে রে/ আমি আর বাইতে পারলাম না—এ গান কবে কে লিখেছিলেন তা আর উদ্ধার করা যাবে না। কিন্তু আমাদের জীবন ও সংস্কৃতিতে এ গান অমর। আবার ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাবেও গানের রীতি তৈরি হয়েছে বাংলায়, যেমন জারি গান। কারবালার করুণ সুর ফার্সি থেকে একসময় বাংলার মুসলমান সমাজেও অনুরণিত হতে থাকে। বাংলা ভাষায় রচিত ও নিজস্ব কায়দায় গীত হয় এ গান।
জীবিকা যে সংগীতে ভূমিকা রাখে তার সহজলভ্য নিদর্শন সারি গান। সারি গান এক কথায় বাংলার শ্রমিক ও কর্মজীবীদের ‘শ্রম-সংগীত’ বা ‘কর্ম-সংগীত’। ভবন নির্মাণে ছাদ পেটানোর সময় শ্রমিকরা তাদের কাজের সুবিধার্থে তৈরি করে নিয়েছে ছাদ পেটানোর গান। নৌকার মাঝি-মাল্লারাও দলবদ্ধভাবে গাইতে শুরু করে তাদের নিজস্ব সারি গান। সারিবদ্ধ শ্রমিকের কর্মস্পৃহা আর মনের জোর টিকিয়ে রাখতে সারি গানের ভূমিকা ছিল। হাওরের মানুষের ভাবের মূর্ছনা আছে হাছন রাজার গানে। লালনের সংগীত আছে জাতের ঊর্ধ্বে উঠে আত্মিক সম্পর্কের কথা।
সংস্কৃতি পুকুর কিংবা চৌবাচ্চার পানির মতো স্থির নয়, নদীর মতো বহমান। সময়ের প্রবাহে এর রূপের বদল হতে পারে, কিন্তু সমূলে বিনাশ হতে পারে না। আর সে রকমটা হলে সেই নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীও আর তার আত্মপরিচয়কে ধরে রাখতে পারে না। কোনো অঞ্চলের সংস্কৃতির নির্মাণ হয় তার ভূগোল, জীবন, জলবায়ু, জীবিকাকে কেন্দ্র করে। বিশ্বায়নের যুগে সংস্কৃতি এখন অনেক বেশি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সারা দুনিয়ায়ই, কিন্তু জাতির নিজস্ব অস্তিত্ব বজায় রাখছে নিজের সংস্কৃতি দিয়েই। এখনো ইংরেজি ভাষায় আমেরিকান আর ব্রিটিশ রীতির ফারাক ঘুচে যায়নি।
এ দেশের মাটি, নদী, ভাবকে সরিয়ে রেখে দূর থেকে কিছু আমদানি করলে তা সাময়িক গ্রহণযোগ্যতা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা রক্ষিত হবে না। বরং এ দেশের মানুষ বারবারই ভিনদেশী চাপিয়ে দেয়া যেকোনো কিছুকে হটিয়ে দিয়েছে, বর্জন করেছে। জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের মুক্তির স্বাদ এবং প্রশ্ন করার স্বাধীনতা দিয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসের এ বিশেষ পর্বে এসে আমরা চাই মুক্তির গান। এখনো আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ ‘দিন আনি দিন খাই’ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে প্রয়োজন সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়ন। এ প্রক্রিয়া টেকসই চেহারায় ঘটতে পারে তার নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতির চর্চাকে শক্তিশালী করে। কাওয়ালি কিংবা রবীন্দ্রসংগীত—কোনোটাই এ বদ্বীপের মানুষের মুক্তির গান হিসেব ভূমিকা রাখেনি। পারস্য, আরব, তুর্কি ও হিন্দুস্তানি উপাদানের সমন্বয়ে কাওয়ালির উদ্ভব উত্তর ভারতে। খেয়াল করলে দেখা যাবে রবীন্দ্রনাথের বিকাশ ঔপনিবেশিক যুগে, আবার তার গুণগ্রাহীরা ছিলেন মূলত সে আমলে শাসকদের সহযোগী হিসেবে গড়ে ওঠা নতুন এক মধ্যবিত্ত শ্রেণী। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন এখনো অনেক নিম্নস্তরে। তিন বেলা খাবার জোটাতেই তাদের জীবন কাটে। স্বপ্ন দেখা বা রূপকল্প সাজানোর সুযোগ তাদের নেই। এই দুই ধারার সংগীত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবিকা নির্বাহে কোনো পরিবর্তনের প্রেরণা জোগাতে বা তাদের স্পর্শ করতে পারে সামান্যই। বরং চব্বিশের অভ্যুত্থানে জেনজি ও সাধারণ মানুষকে একত্রিত করেছে বাংলা র্যাপ সংগীত।
এখানকার কৃষক, জেলে, মুটের আছে নিজস্ব গান। চাকমা, মারমা, গারো কিংবা সাঁওতালদের ভাষা ও গানও নিজস্ব। আমাদের ভূখণ্ডের বিভিন্ন জাতি, শ্রেণীর মানুষের এ গান, এ সংস্কৃতি তাদের শ্রম, সংগ্রামের স্মারক। বিভিন্ন কালপর্বে এ দেশে এসেছে চীন, পারস্য, আরবসহ আরো নানা অঞ্চলের সংস্কৃতি। সেগুলোর অনেক কিছু বাংলাদেশের মানুষ গ্রহণ করেছে। কিন্তু কোনো কিছুই তাদের নিজস্বতাকে ভাঙতে পারেনি। এ দেশের মানুষের ওপর বহিরাগত কোনো কিছুই চাপিয়ে দেয়া যায়নি। ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ শাসকদের লেজুড়বৃত্তি করে কলকাতায় গড়ে উঠেছিল বাবু সম্প্রদায়। তারা অন্ধভাবে সাহেবদের অনুকরণ করতে চেয়েছেন। কিন্তু জাতে উঠতে পারেননি। ব্রিটিশদের সহযোগী হিসেবে দ্বারকানাথ ঠাকুররা পুঁজিপতি হয়ে ওঠার চেষ্টা করেন। একদিকে সাহেবদের সংস্কৃতিকে অনুকরণ করে গড়ে ওঠা বাবু সম্প্রদায় কিংবা তাদের পুঁজির দালাল হিসেবে অর্থনৈতিক উদ্যোগ শেষমেশ মানুষের মুক্তি আনতে পারেনি। অন্যদিকে বাংলার পূর্বাংশের কৃষিজীবী সমাজ ব্রিটিশদের সঙ্গে যেমন সহজ হয়নি, তেমনি পরিবর্তী সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যও মেনে নেয়নি। নিজের ভাষা-সংস্কৃতির স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে তারা জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীন-সার্বভৌম মানচিত্রকে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় সংস্কৃতির নিজস্বতাকে নিয়ে লড়াই করেই এ দেশের মানুষ তার মুক্তি-স্বাধীনতার বিভিন্ন সিঁড়িতে পা রেখেছে। দেশের সাধারণ মানুষকে উন্নত জীবনের স্বাদ দেয়া, তার ভাষা-সংস্কৃতির স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, তার মত প্রকাশ নির্ভয় করাই এ যুগের মুক্তির গান। জুলাই অভ্যুত্থান এ সুযোগ নিয়ে হাজির হয়েছে। এ বিপুল ইতিবাচক শক্তিকে কাজে লাগানোর বড় সুযোগ আমরা হাতছাড়া করতে যাচ্ছি তাড়াহুড়ো ও অসহিষ্ণুতায়। যার যে বিষয়ে স্বাচ্ছন্দ্য, যার যেটা ভালো লাগে সেটা উদযাপনের সুযোগ সৃষ্টিতেই প্রকৃত মুক্তির স্বাদ।
দেওয়ান হানিফ মাহমুদ: সম্পাদক, বণিক বার্তা
[লেখাটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন শানজিদ অর্ণব ও আহমেদ দীন রুমি]