মাছ উৎপাদন সম্প্রারণের লক্ষ্যে আশির দশকে নড়াইলে সরকারিভাবে গড়ে তোলা হয় মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র। শুরুর দিকে দুটি হ্যাচারিতে সাদা মাছের রেণু উৎপাদন হতো। প্রজনন কেন্দ্রটি ঘিরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় মাছের খামারও গড়ে ওঠে। শুরুর দিকে ভালোভাবেই চলছিল জেলার একমাত্র মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রটি। তবে এক যুগ ধরে বন্ধ রয়েছে রেণু উৎপাদন।
কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনবল সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে প্রজনন কেন্দ্রটিতে। এসব কারণে ২০১২ সাল থেকে অফিশিয়ালি বন্ধ রাখা হয়েছে। রেণু উৎপাদনও বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রজনন কেন্দ্রটির ম্যানেজার হাসান পাভেজ।
খামারিদের দাবি, বেসরকারিভাবে জেলায় আর কোনো মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়ে মৎস্য চাষীদের দূর-দূরান্তের জেলা থেকে মাছের পোনা সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন পরিবহন খরচসহ সময় অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের পড়তে হচ্ছে বিড়ম্বনায়।
মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, ৯ একর ৭৫ শতক জমিতে গড়ে ওঠা মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রে প্রতি বছর পোনা উৎপাদন কমতে থাকে। ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রজনন কেন্দ্রটি পুরোপুরি চালু ছিল। এরপর আট-নয় বছর হ্যাচারিতে পোনা উৎপাদন না হলেও কাগজে কলমে চালু ছিল হ্যাচারিটি। ২০১২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় পোনা উৎপাদন কার্যক্রম। শুরুর দিকে দুটি হ্যাচারিতে সাদা মাছের রেণু উৎপাদন হতো এবং তা এখানকার আটটি পুকুরে বড় করে মৎস্য চাষীদের মাঝে কম দামে সরবরাহ করা হতো। নড়াইলের বিভিন্ন এলাকায় মাছের খামারও গড়ে ওঠে। তিন দশকে ঘের আর পুকুরের সংখ্যা বেড়ে এখন প্রায় ১৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এ শিল্পকে কেন্দ্র করে জীবিকা নির্বাহ করছে জেলার অন্তত ৮০ হাজার মানুষ। প্রজনন কেন্দ্রে রেণু উৎপাদন বন্ধ থাকায় মৎস্য চাষীরা যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পোনা সংগ্রহ করছেন।
তবে খামারিদের দাবি, সবসময় সেসব পোনার গুণগত মান ঠিক থাকে না। অতিরিক্ত অর্থও ব্যয় করতে হয় তাদের। এতে বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় মৎস্য চাষীরা।
লোহাগড়া উপজেলার কুমড়ি গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী মো. জিরু শেখ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নড়াইলে আর কোনো মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র নেই। এজন্য আমাদের বিভিন্ন জেলা থেকে পোনা সংগ্রহ করতে হয়। এতে পরিবহন খরচও অনেক বেশি হয়।’
মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, দূর-দূরান্ত থেকে সংগ্রহ করায় অনেক পোনা পথেই মারা যায়, দামও অনেক বেশি পড়ে। অথচ সরকারি মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র পড়ে আছে। যেটা চাষীদের কোনো কাজেই লাগছে না। দ্রুত প্রজনন কেন্দ্রটি চালুর দাবিও জানিয়েছেন তারা।
মৎস্য চাষী মো. আলিমুজ্জামান বলেন, ‘নড়াইল মাছ চাষে একটি সম্ভাবনাময় জেলা। এর সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ জড়িত। অথচ নড়াইলে একটি মাত্র মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র। তাও আবার বন্ধ।’
এ বিষয়ে নড়াইল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এইচএম বদরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নড়াইল মাছ উৎপাদনে উদ্বৃত্ত জেলা। এ জেলার প্রায় আট লাখ মানুষের জন্য মাছের চাহিদা রয়েছে ১৬ হাজার টন। প্রতি বছর এখানে উৎপাদন হয় অন্তত ১৮ হাজার টন। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে অন্তত দুই হাজার টন মাছ উদ্বৃত্ত থাকে। জেলায় মাছের পোনার চাহিদা রয়েছে। প্রজনন কেন্দ্রটি চালু হলে স্থানীয় মৎসজীবীরা উপকৃত হবেন। এটিকে আবার চালু করার জন্য চেষ্টা চলছে।’ দ্রুতই জেলার একমাত্র সরকারি মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রটি চালু হবে বলেও প্রত্যাশা করেন তিনি।
তবে মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রের মধ্যে সব ধরনের সুযোগ থাকতেও সেটি কেন চালু হচ্ছে না, সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ব্যবসায়ীদের মাঝে। প্রজনন কেন্দ্রটি চালু হলে নড়াইলের মাছ চাষীরা উপকৃত হবেন বলেও মনে করেন তারা। দ্রুত প্রজনন কেন্দ্রটি চালুর দাবি তাদের।
এ প্রসঙ্গে নড়াইল ঘের মালিক সমিতির সভাপতি আকরাম শহিদ চুন্নু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রটি সচল না থাকায় চাষীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেকে মাছ চাষ বন্ধ করে দিচ্ছেন।’ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিংড়ি ও সাদা মাছের পোনা উৎপাদন করে চাষীদের মাঝে সরবরাহের দাবি জানান তিনি।