চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বিনিয়োগকারীদের আরো দ্রুত ও কার্যকর সেবা দিতে তিনটি বিশেষায়িত কান্ট্রি ডেস্ক চালু করেছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। শনিবার (১০ অক্টোবর) ঢাকায় আয়োজিত ‘মিট দ্য ইনভেস্টরস’ অনুষ্ঠানে এসব ডেস্কের উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে শতাধিক দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারী অংশ নেন।
বেপজার অধীন আটটি রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) ও দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিশ্বের ৩৮টি দেশের বিনিয়োগ রয়েছে। এসব দেশের মধ্যে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান শীর্ষ তিন বিনিয়োগকারী দেশ। নতুন ডেস্কগুলোর মাধ্যমে এসব দেশের বর্তমান ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হবে। পাশাপাশি তাদের চাহিদা অনুযায়ী বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য, পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হবে। এতে বেপজার ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের প্রক্রিয়াও সহজ হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি বলেন, এ আয়োজনের মাধ্যমে অংশীদারত্ব আরো দৃঢ় করা, বিনিয়োগকারীদের কথা সরাসরি শোনা এবং তাদের সমস্যা ও প্রত্যাশা বোঝার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও ব্যবসাবান্ধব করার উপায় খুঁজে বের করাও এ আয়োজনের লক্ষ্য।
বৈশ্বিক বাণিজ্যের অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বেপজা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে বলে জানান নির্বাহী চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেপজা ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি করেছে। এ সময়ে বেপজার অধীন জোনগুলো থেকে ৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ রফতানি ২ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি।
চলতি বছরে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-১, বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল-২, যশোর ইপিজেড ও পটুয়াখালী ইপিজেডকে পূর্ণাঙ্গ জোন হিসেবে ঘোষণা করাকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এসব নতুন জোনে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য বিনিয়োগকারীদের তাদের সরবরাহব্যবস্থার অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পায়নের বিষয়ে নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, বেপজা ‘থ্রি-আর’ নীতির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার এবং পুনর্ব্যবহারভিত্তিক শিল্পচর্চা চালুর কাজ করছে। বিনিয়োগকারীদের সেবা উন্নত করতে বিদ্যুৎ সরবরাহের মান বাড়ানো, বিনিয়োগকারীদের ক্লাব, অগ্নিনির্বাপণ কেন্দ্র, উন্নত চিকিৎসাসেবা এবং সহজ একক সেবা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।
নতুন কান্ট্রি ডেস্কগুলো চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বর্তমান বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, এসব ডেস্ক বিনিয়োগকারীদের ব্যবসা সম্প্রসারণে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বেপজার জোনগুলোতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণেও ভূমিকা রাখবে। বিনিয়োগকারীদের মূল্যবান অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে বেপজা তাদের মতামতের ভিত্তিতে কৌশল আরো উন্নত করবে। যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিনিয়োগকারীদের পাশে থাকার অঙ্গীকারও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বেপজার সদস্য (বিনিয়োগ উন্নয়ন) মো. তানভীর হোসেন তার উপস্থাপনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ অর্জন ও অগ্রগতি তুলে ধরেন। বিনিয়োগ আকর্ষণ, রফতানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন বিনিয়োগ চুক্তি, শ্রমিকদের কল্যাণে নেয়া পদক্ষেপ এবং বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজ করার বিষয়ে আলোচনা করেন তিনি। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে নীতি ও প্রক্রিয়াগত উন্নয়নের কথাও তুলে ধরেন। পাশাপাশি বেপজার অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং যশোর ও পটুয়াখালীতে নতুন ইপিজেড স্থাপনের অগ্রগতি তুলে ধরে এসব জোনে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
বেপজার চালু জোনগুলোতে জমির সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও তুলে ধরেন মো. তানভীর হোসেন। তিনি বলেন, সীমিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে বেপজা জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। এ ধারা অব্যাহত রাখতেও কাজ করছে সংস্থাটি।
বেপজার অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক (প্রতিষ্ঠানসেবা ও শিল্প সম্পর্ক) নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া তার উপস্থাপনায় ইপিজেডে শ্রমিক কল্যাণ, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক, ইপিজেড শ্রম আইন সংশোধন এবং ভবিষ্যতের শ্রমসম্পর্কিত চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেন।
পরে বেপজার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উন্মুক্ত মতবিনিময় হয়। এতে বেপজার বিভিন্ন সেবা, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, বিদ্যমান শিল্প পরিচালনার সমস্যা সমাধান, সম্ভাব্য বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আরো উন্নত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। ‘বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন, ২০১৯’ নিয়েও মতবিনিময় করেন অংশগ্রহণকারীরা। এ সময় আন্তর্জাতিক শ্রমমান বজায় রেখে বিনিয়োগকারী ও শ্রমিক, উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষায় বেপজার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
অনুষ্ঠানে কোরিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক মিলিয়ন পার্ক বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। বাংলাদেশ এবং বেপজার জোনগুলোতে আরো বেশি কোরীয় বিনিয়োগ আকর্ষণে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নীতিগত প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এপিক গ্রুপের ভাইস প্রেসিডেন্ট পিন্টু কুমার শ বেপজার ব্যবসা-সহায়ক সেবার প্রশংসা করেন এবং কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বেপজার নতুন দুই ইপিজেড, যশোর ও পটুয়াখালীতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেন।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পাল খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে তাদের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণ উৎপাদনকারী পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
সমাপনী বক্তব্যে বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-চীন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, কোরিয়া-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এছাড়া বেপজার অধীন ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চলের শতাধিক দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারী উপস্থিত ছিলেন।
১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেপজা দেশের রফতানিমুখী শিল্পায়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখে আসছে। বর্তমানে সংস্থাটির অধীন আটটি ইপিজেড ও দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিশ্বের ৩৮টি দেশের বিনিয়োগ রয়েছে। এসব জোনে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার। ক্রমপুঞ্জীভূত রফতানির পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। দেশের মোট রফতানিতে বেপজার জোনগুলোর অবদান প্রায় ২০ শতাংশ।