চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয় ৪৪তম বিসিএসের গেজেট। এর কিছুদিন পরই শিক্ষা ক্যাডারের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা অন্য ক্যাডারে যোগ দিতে চাকরি ছাড়েন। ৪ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আলাদা দুটি প্রজ্ঞাপনে পাঁচজন ও ১৮ জুন পৃথক চারটি প্রজ্ঞাপনে ১০ জন কর্মকর্তার অব্যাহতির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এ কর্মকর্তারা প্রশাসন, পররাষ্ট্র, সমবায়, করসহ অন্যান্য ক্যাডারে যোগদান করছেন।
শুধু ৪৪তম বিসিএসই নয়, প্রায় প্রতিটি বিসিএসেই শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা অন্য কোনো ক্যাডারে সুযোগ পেলে চাকরি ছাড়ছেন। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তুলনামূলক কম সুযোগ-সুবিধা ও পদোন্নতি জটিলতা থাকায় এবং সামাজিক অবস্থানেও ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ার জেরে শিক্ষকরা অন্য কোনো চাকরির সুযোগ পেলে সেটিকেই বেছে নিচ্ছেন। প্রাথমিক-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যেও এ প্রবণতা দেখা যায়।
অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, দেশের প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকরা পিছিয়ে আছেন দক্ষতায়ও। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে ন্যূনতম যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে বাংলাদেশ অন্যতম পিছিয়ে পড়া দেশ। চলতি বছর ইউনেস্কো প্রকাশিত বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৫-এ এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভর করে ন্যূনতম যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের হার তুলে ধরা হয়েছে। পরিসংখ্যানে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার মোট ১২টি দেশ—বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ভারত, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও ইরানের মধ্যে বাংলাদেশই সবচেয়ে পিছিয়ে আছে।
এমন বাস্তবতায় সারা বিশ্বের মতো আজ দেশেও উদযাপিত হতে যাচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবস’। ‘শিক্ষকদের পাশে: পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা বৃদ্ধি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ার ৬০ বছর’ প্রতিপাদ্যে এবার উদযাপন হবে দিবসটি। এ উপলক্ষে প্রথমবারের মতো সরকারের পক্ষ থেকে ১০০ শিক্ষককে সম্মাননা প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ধরনের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও দেশের বর্তমান বাস্তবতায় শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষকতাকে মেধাবীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় পেশায় পরিণত করায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক স্তর থেকে। বর্তমানে এ স্তরে শিক্ষকতার ন্যূনতম যোগ্যতা স্নাতক ডিগ্রি। দেশে প্রথম শ্রেণী বা নবম গ্রেডের চাকরির ক্ষেত্রেও শিক্ষাগত যোগ্যতা একই। তবে একই যোগ্যতা চাওয়া হলেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন সহকারী শিক্ষকের গ্রেড ১৩তম, যা তৃতীয় শ্রেণীর সমমানের। এছাড়া দেশের প্রায় প্রতিটি খাতেই চাকরিজীবীদের জন্য কয়েক ধাপের পদসোপান রয়েছে। তবে প্রাথমিক শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এ চিত্র ব্যতিক্রম। প্রাথমিক শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বর্তমানে পদোন্নতির ধাপ একটি। এ পদোন্নতির মাধ্যমে সহকারী শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষক হয়ে থাকেন। তবে এ পদোন্নতি বন্ধ রয়েছে ১৭ বছর ধরে।
ইউনেস্কোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শিক্ষকদের যোগ্যতায় দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় ন্যূনতম যোগ্যতাসম্পন্ন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। বর্তমানে দেশের প্রাথমিক স্তরে ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষকের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ রয়েছে, সেখানে ভুটান ও কাজাখস্তানে এ হার শতভাগ। এছাড়া ভারতে ৯১ দশমিক ৭, নেপালে ৯৫ দশমিক ৮ ও শ্রীলংকায় এ হার ৮৬ দশমিক ৪ শতাংশ। এ তালিকায় বাংলাদেশের তুলনায় পিছিয়ে আছে শুধু পাকিস্তান।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান শাহীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি বন্ধ থাকায় ৬৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধেকেই প্রধান শিক্ষকের পদ বর্তমানে শূন্য। ফলে প্রশাসনিক কাজসহ পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া সরকারি কলেজে প্রভাষক পদে যোগদানের পর পরবর্তী সময়ে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং সর্বশেষ অধ্যাপক হওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি মাত্র পদোন্নতি—সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক। সেটিও বন্ধ থাকায় অনেকেই প্রাথমিক শিক্ষকতাকে শেষ পছন্দ হিসেবে বাছাই করছে। একজন শিক্ষক হিসেবে মনে করি স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর মাধ্যমে সহকারী শিক্ষক, সিনিয়র শিক্ষক, সহযোগী শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক—এ চারটি ধাপে গ্রেড পরিবর্তন করে পদোন্নতি দিলে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক হবে।’
একই চিত্র মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরেও। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা যোগদান করেন দশম গ্রেডে। একসময় সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে পদোন্নতির ক্ষেত্রে চারটি স্তর ছিল—সহকারী শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক ও উপপরিচালক। তবে পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতিও দুটো ধাপে নিয়ে আসা হয়—সহকারী শিক্ষক ও নবম গ্রেডের সিনিয়র শিক্ষক। এছাড়া দেশে সরকারি কোষাগার থেকে যেসব শিক্ষক বেতন পেয়ে থাকেন, তাদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই এমপিওভুক্ত। এ শিক্ষকরা ১১তম গ্রেডে যোগদান করেন। বাংলাদেশে এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক শিক্ষকদের প্রবেশন পর্যায়ের ন্যূনতম বেতন সব মিলিয়ে ১৫ হাজার ৮৭৫ টাকা, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন এবং বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন। তবে সম্প্রতি ঘোষিত নবম পে স্কেল অনুযায়ী, এ বেতন বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এছাড়া এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভোগান্তি পোহাতে হয় অবসর-পরবর্তী অর্থ উত্তোলনেও। অনেক ক্ষেত্রে অর্থ পেতে পাঁচ বছরেরও বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়।
এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী বলেন, ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের জটিলতার মধ্যে রয়েছেন। আগে তারা মাত্র ১ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া পেতেন। শিক্ষকদের আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বাড়ি ভাড়া মূল বেতনের অর্ধেক নির্ধারণ করেছে। তবে একজন শিক্ষকের জন্য মানসম্মত জীবনযাপনের জন্য এটি যথেষ্ট নয়। শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান ও পেশাগত মর্যাদা বিবেচনায় নিয়ে এসব সুযোগ-সুবিধা পুনর্নির্ধারণ করা উচিত।’
অন্যদিকে পরিসংখ্যান অনুযায়ী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই সবচেয়ে পিছিয়ে। নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের হার মাত্র ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এ স্তরে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ৯২ শতাংশ, শ্রীলংকার ৮২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ভুটান ও উজবেকিস্তানে শতভাগ শিক্ষকই ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ করেছেন।
মাধ্যমিক স্তরে ৫৫ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষক প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের আওতায় রয়েছেন। অথচ এ স্তরগুলোতে পাকিস্তান (৭২.১%), শ্রীলংকা (৭৮%), নেপাল (৮৯.৮%) এবং ভারতের (৯২.৭%) মতো দেশগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে।
ঢাকা কলেজিয়েটে স্কুলের সহকারী শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল নাহিয়ান বলেন, ‘বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেসব শিক্ষক কর্মরত আছেন তাদের মূল সমস্যা হচ্ছে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। এ কারণে আমাদের শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবনে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যেমন মাউশি থেকে সর্বশেষ গত ২৫ মার্চে যে হিসাব দেয়া হয়েছে, সেখানে সহকারী শিক্ষক পদ প্রায় ১৬ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৭ হাজারের মতো পদ শূন্য রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ শূন্য পদের বিপুল ওয়ার্কলোড বা কাজের প্রেশারের কারণে শিক্ষকরা ক্লাসে যে মাত্রায় বা মানে পাঠদান করা উচিত সেটা পারছেন না।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের বেতন-ভাতা যদি না বাড়ুক, এ ৪০ শতাংশ শিক্ষকের অভাব কিন্তু আমরা ক্লাসের কার্যক্রমে পড়তে দিই না। আমরা অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে বা অন্য যেকোনোভাবে এ কাজগুলো সম্পন্ন করছি। তার মানে শিক্ষকদের বর্তমান যে বেতন আছে এ বেতনে অতিরিক্ত ১৪০ শতাংশ সার্ভিস আমরা মানুষকে দিচ্ছি। কিন্তু আমাদের যে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সেটাও বিভিন্ন জটিলতার কারণে আমরা পাচ্ছি না।’
আব্দুল্লাহ আল নাহিয়ান আরো বলেন, ‘আর পদোন্নতির ক্ষেত্রে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে কোনো পদসোপান নেই। এজন্য পদোন্নতি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশে মনে হয় শিক্ষাই একমাত্র খাত, যেখানে ২৫-৩০ বছরের আগে কখনো পদোন্নতি হয় না। সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করে সেই পদেই অবসরের একমাত্র ঘটনা শিক্ষকদের ক্ষেত্রেই পাওয়া যায়। এ সমস্যাগুলো নিরসন হওয়া অত্যন্ত জরুরি, অন্যথায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করা বা শিক্ষার মানোন্নয়ন ক্রমশ অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে।’
এদিকে পদোন্নতির জটিলতা রয়েছে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারেও। একই গ্রেডের প্রশাসন ক্যাডারসহ অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিয়মিত পদোন্নতি পেলেও শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষক পদে কর্মরতদের পদোন্নতি হয়েছে মাত্র একবার। ২০২৫ সালে এ পদোন্নতি দেয়া হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিসিএস প্রশাসনসহ অন্যান্য বেশির ভাগ ক্যাডারে ২০২২, ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে কর্মকর্তারা নিয়মিত ষষ্ঠ গ্রেডে পদোন্নতি পেয়েছেন। তবে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৬ সালে ষষ্ঠ গ্রেডে কোনো পদোন্নতি হয়নি।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বরিশালের এক সরকারি কলেজের প্রভাষক বলেন, ‘বর্তমান বাস্তবতাই এমন দাঁড়িয়েছে যে কেউ নিরুপায় না হলে শিক্ষকতায় থাকতে চান না। ছোটবেলায় স্বপ্ন দেখতাম ভালো শিক্ষক হওয়ার। কিন্তু আমিই যখন স্নাতক সম্পন্ন করলাম আমার প্রথম পছন্দ শিক্ষকতা ছিল না। সামাজিক প্রেক্ষাপটে এখন একজন শিক্ষক সবচেয়ে কম মর্যাদা পান। শিক্ষকরাই জাতি গঠন করেন অথচ সমগ্রেডের একজন পররাষ্ট্র ক্যাডার, প্রশাসন ক্যাডার, পুলিশ ক্যাডার কিংবা কর ক্যাডার যে পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা, সম্মান ও গুরুত্ব পান তা একজন শিক্ষক পান না। তাহলে কারো যদি এসব পদে যাওয়ার সুযোগ আসে সে কেন শিক্ষকতায় থাকতে চাইবে?’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক সুযোগ-সুবিধা বেশি থাকলেও তাদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার কোনো কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম মূল কাজ গবেষণা হলেও গবেষণায় বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম পিছিয়ে থাকা দেশ। কিউএস কিংবা টাইমস হায়ার এডুকেশনের সর্বশেষ র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের সেরা ৫০০-এর তালিকায়ও স্থান পায়নি।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষকদের দক্ষতার এ ঘাটতির প্রধান কারণ শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের অবহেলা, বেতন কাঠামোর নিম্নগতি এবং পদোন্নতির জটিলতায় মেধাবীদের এ পেশায় অনীহা এবং যথাযথ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অভাব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান সমস্যা হলো শিক্ষকদের মর্যাদা ও উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি। পদোন্নতির বৈষম্য, অপর্যাপ্ত বেতন-ভাতা এবং অনিয়মপূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে উৎসাহিত হচ্ছেন না। অর্থনৈতিক বাস্তবতার চাপে শিক্ষকদের কোচিংমুখী হতে হচ্ছে, যা তাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করছে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও নজরদারির অভাব শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির পথ রুদ্ধ করছে। অন্যদিকে মূলধারার শিক্ষায় ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন, পরীক্ষানির্ভরতা, ইতিহাসচর্চার সীমাবদ্ধতা এবং বাল্যবিবাহ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে ছাত্রীদের ঝরে পড়ার মতো সমস্যাগুলো শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো ভঙ্গুর করে তুলছে।’
এ সংকট কাটিয়ে উঠতে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী শিক্ষা খাতকে জাতীয় অগ্রাধিকারে রাখার তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘প্রথমত, মেধাবীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করতে শিক্ষকদের যথাযথ সামাজিক মর্যাদা, সম্মানজনক বেতন-ভাতা, বৈষম্যহীন পদোন্নতি এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের নিয়মিত আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রদান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সঠিক নজরদারি বাড়ানো জরুরি। দ্বিতীয়ত, জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে এবং সেই অর্থ যেন দুর্নীতি ও অপচয়মুক্ত থেকে সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য বীথিকা বিনতে হোসাইন বলেন, ‘একটি জাতিকে মেরুদণ্ডহীন করার লক্ষ্যেই অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাব, শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি, অটোপাস প্রথা ও ঢালাও জিপিএ-৫ প্রদানের মতো মানহীন মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। এ সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে একটি সুদৃঢ় ও টেকসই শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে প্রকৃত মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হচ্ছে। “লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস” পদ্ধতিতে পাঠদানের মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে শিশুদের পড়ালেখায় উদ্বুদ্ধ করা, পোশাক-পাঠ্যবইসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিত করা এবং প্রাথমিক স্তর থেকেই দক্ষ শিক্ষক তৈরির ওপর বিশেষ জোর দেয়া হচ্ছে। বর্তমান সরকার কোনো মুখরোচক মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাসী নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপে জোর দিচ্ছে এবং শিক্ষা খাতের বিদ্যমান প্রতিটি সমস্যা চিহ্নিত করে ক্রমান্বয়ে সমাধানের মাধ্যমে ভবিষ্যতে একটি মজবুত, বৈষম্যহীন ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য।’