ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই, আধিপত্য নয়— সংবাদ সম্মেলনে মুসলিম হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য ফোরাম

সংগঠনের সভাপতি সুরঞ্জন ঘোষ বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, অসম সম্পর্ক নয়। সহযোগিতা চায়, আধিপত্য নয়। বাংলাদেশের পোশাক কারখানার শ্রমিক আন্দোলনকে ভারতীয় গণমাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন বাংলাদেশের সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। এ ধরনের উপস্থাপন দুই দেশের মানুষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে

পোশাকশ্রমিকদের সাম্প্রতিক আন্দোলনকে ভারতীয় গণমাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন বাংলাদেশে সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে— এমন অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ মুসলিম হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য ফোরাম। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশী হস্তক্ষেপ ও দুই দেশের মধ্যে অসম সম্পর্কের সমালোচনা করে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং বাণিজ্যিক বৈষম্য দূর করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

আজ সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনটির সভাপতি সুরঞ্জন ঘোষ।

তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, অসম সম্পর্ক নয়। সহযোগিতা চায়, আধিপত্য নয়। বাংলাদেশের পোশাক কারখানার শ্রমিক আন্দোলনকে ভারতীয় গণমাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন বাংলাদেশের সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। এ ধরনের উপস্থাপন দুই দেশের মানুষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে।

সুরঞ্জন ঘোষ বলেন, এত দিন তিস্তা চুক্তি না হওয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কথা বলা হয়েছে। এখনো কেন বাংলাদেশ পানির ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না, সেই প্রশ্ন রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে কিছু কুচক্রী মহলের কারণে ভারত এসব করার সুযোগ পাচ্ছে। এদের চিহ্নিত করে শাস্তির দাবি জানান তিনি।

কলকাতায় বাংলাদেশের উপহাইকমিশনে হামলার চেষ্টার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভারতের দায়িত্ব। বিদেশী রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে দেশের ভেতরে কিছু দালালচক্র ষড়যন্ত্র করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

লিখিত বক্তব্যে কানাডায় শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জরের হত্যাকাণ্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ভারতের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তুলে ধরে আন্তর্জাতিক তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান জানানোর আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের ভূমিকার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্য দেশের হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেন তিনি।

ভারতের মণিপুর রাজ্যে জাতিগত সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সংগঠনটি। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, মণিপুরে চলমান জাতিগত সংঘাতে অনেক মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাও উদ্বেগের বিষয়। ভারতের দলিত, মুসলিম, খ্রিষ্টান ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্য ও সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানানো হয়।

ভারতের তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনকে তাদের নাগরিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকার সবার রয়েছে। কোনো দেশের জনগণের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান নয়; বরং আধিপত্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অবস্থান।

লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং জনগণের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশী গোয়েন্দা হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক হত্যাকাণ্ড ও হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়াকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানায় সংগঠনটি।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে ভারতের কাছে ১০ দফা দাবি জানানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে— ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের সব কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রতি সম্মান দেখানো; অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশী গোয়েন্দা হস্তক্ষেপের অভিযোগ তদন্ত; মণিপুরসহ ভারতের সব ধর্মীয় ও জাতিগত জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; দলিত, মুসলিম, খ্রিষ্টান ও আদিবাসীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও সহিংসতা বন্ধ করা এবং বিচারাধীন বন্দিদের দ্রুত ও ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করা।

এছাড়া বাংলাদেশের প্রাপ্য পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, বাণিজ্যিক বৈষম্য দূর করা এবং ভারতে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানানো হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে পরিচালনার আহ্বান জানায় সংগঠনটি।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, অপরাধীর কোনো ধর্ম নেই, অপরাধী শুধুই অপরাধী। বাংলাদেশে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর অন্যায় হলে তারা প্রতিবাদ করবেন। একইভাবে ভারতে মুসলিম, খ্রিষ্টান, দলিত কিংবা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন হলেও প্রতিবাদ জানাবেন।

তারা বলেন, ‘বিভেদ নয়, ঐক্য। ধর্ম যার যার, দেশ সবার। এ দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে এ দেশের জনগণ, অন্য কোনো দেশ নয়।’

আরও