বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি ও শ্রমবাজার নিয়ে একের পর এক নেতিবাচক খবর আসছে। মালয়েশিয়ার বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) প্রবাসী বাংলাদেশীদের ভিসা বাতিলের ঘটনার পর এবার লাওসেও বাংলাদেশী কর্মীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। এতে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ আরো সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওস সম্প্রতি বাংলাদেশী কর্মীদের নতুন শ্রম ভিসা ও প্রবেশ স্থগিত করেছে। অবৈধ অভিবাসন, মানব পাচার, অননুমোদিত শ্রমিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং কর্মী নিয়োগের পর দায় এড়িয়ে যাওয়া নিয়োগকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে দেশটির সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরপর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে এমন সংকট বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশে বাংলাদেশী কর্মী গমনের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩২ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালের এ সময়ে ৭ লাখ ৯০ হাজার ৩১৩ জন কর্মী বিদেশে গেলেও চলতি বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ২ লাখ ৫৫ হাজার ৫৯৬ জন কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৭১৭ জনে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর লাওসের শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাংলাদেশীদের জন্য নতুন ওয়ার্ক পারমিট, শ্রমিক আমদানি পরিকল্পনা ও শ্রম প্রকল্পের অনুমোদন স্থগিত করা হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া এ স্থগিতাদেশ ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে। একই সময়ে বাংলাদেশী নাগরিকদের নতুন শ্রম ভিসা (এলএ-বি২) অনুমোদনও বন্ধ থাকবে। নতুন এ নির্দেশনার ফলে কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি, নিয়োগকর্তা বা শ্রমিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশী নাগরিকদের লাওসে প্রবেশ বা কাজে নিয়োগের অনুমোদন দিতে পারবে না। তবে নির্দিষ্ট চুক্তি ও সময়সূচি অনুযায়ী পরিচালিত বড় সরকারি অনুমোদিত অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলো এ স্থগিতাদেশের আওতামুক্ত থাকবে।
বিএমইটি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর লাওসের বিভিন্ন খাতে ৩ হাজার ২৮৯ জন বাংলাদেশী কর্মী গেছেন। দেশটিতে নিয়মিত কর্মী পাঠাতেন রিক্রুটিং এজেন্সি এম আবদুল্লাহ ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মো. মাহবুব আলম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লাওসে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন কর্মী ভিসা ও অনুমোদন স্থগিতের বিষয়টি উদ্বেগের। তবে কেন বন্ধ হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানি না। মৌখিকভাবে জেনেছি, মধ্যস্থতাকারী দালালদের প্রতারণা, কর্মীদের নির্ধারিত ওয়ার্ক পারমিট না দেয়া এবং বেতন বকেয়া রাখার বিষয়ে লাওস সরকারের কাছে দেশটির বাংলাদেশী কমিউনিটির সভাপতির লিখিত অভিযোগের কারণেই এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।’
বাংলাদেশী কর্মীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। সিন্ডিকেটের দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে ২০২৪ সালের ৩১ মে বন্ধ হয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার বাজারটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিলেও তাতে অগ্রগতি আসেনি। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়া। এ সফরে শ্রমবাজার চালুর সরাসরি কোনো ঘোষণা আসেনি। পরবর্তী সময়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে এ বিষয়ে নানা বক্তব্য এলেও কবে থেকে এবং কী পরিমাণ কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পারবেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেয়া হয়নি।
বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের জন্য গত ২১ আগস্ট ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করে দেশটির বিদেশী কর্মী নিয়োগ প্লাটফর্ম এফডব্লিউসিএমএস। পরে ‘সিন্ডিকেট হয়েছে’ এমন বিতর্কের মুখে ‘সহযোগী এজেন্সি’ হিসেবে আরো ৩১২ প্রতিষ্ঠানের নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়। যদিও এ ৩১২ এজেন্সির অনেকেই এ প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করে সিন্ডিকেট বাতিলের দাবি তোলেন। বাংলাদেশের সব রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত রাখার দাবি জানিয়ে আসছিলেন জনশক্তি রফতানিকারক এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রার নেতারা। গতকাল প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের ইস্যুতে বিভিন্ন দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) একাংশের সদস্যরা।
এ সময় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এখনো নতুন করে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে কোনো ঘোষণা আসেনি বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মোখতার আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমরা তখনই এফডব্লিউসিএমএস’কে মূল্যায়ন করব যখন মালয়েশিয়ার সরকার বলে দেবে তারা কোন পন্থায়, কার মাধ্যমে নেবে এবং টার্মস অব রেফারেন্স কী হবে। আমি যতটুকু জানি এখন পর্যন্ত মালয়েশিয়া সরকার থেকে আমরা কোনো ধরনের নির্দেশনা পাইনি। গত ১৪ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি নোট ভার্বাল পাঠিয়েছে। তবে কী সিস্টেমে কর্মী যাবে, এসওপিটা কেমন হবে এ বিষয়ে আমরা এখনো কোনো উত্তর পাইনি। এটি পাওয়ার পর নিশ্চিত হতে পারব কোন প্রক্রিয়ায়, কীভাবে মালয়েশিয়ায় কর্মী যাবে।’
বাংলাদেশী কর্মীদের মধ্যপ্রাচ্যে অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটিতে ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশী কর্মী যাচ্ছেন। একসময় এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার ছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় প্রবাসী বাংলাদেশীদের বিক্ষোভের পর বাংলাদেশীদের ভিজিট ও কর্মী ভিসা বন্ধ হয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সীমিত পরিসরে ভিজিট ভিসা চালু হলেও কর্মী ভিসা এখনো চালু হয়নি। ইউএইর বন্ধ শ্রমবাজার পুরোপুরি চালু না হওয়ার মধ্যেই সম্প্রতি ছুটিতে দেশে আসা প্রবাসীদের ভিসা কোনো কারণ ছাড়াই বাতিল করেছে দেশটির সরকার। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ইউএইর ভিসা বাতিলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশীর সংখ্যা ৪ হাজার ৮০০। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি।