এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারের মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরের জন্য সুনির্দিষ্ট জনবল কাঠামো (অর্গানোগ্রাম) ও প্রশাসনিক রূপরেখা তৈরি করা।
এনাম কমিটির অনুমোদিত জনবল কাঠামোর আলোকে ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সমাজসেবা অধিদপ্তরের পদসংখ্যা ছিল চার হাজার ৯২৪। সে সময় অধিদপ্তরের সমাজকল্যাণ ও পুনর্বাসনমূলক বিশেষায়িত ২৪টি কার্যক্রমের আওতায় নিয়মিত সেবা গ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫০ হাজার। বিভিন্ন সময়ে জনবল বেড়ে বর্তমানে ২ কোটি ১০ লাখ সেবাগ্রহীতার জন্য এ অধিদপ্তরের জনবল সংখ্যা ১২ হাজার ৭৯১। এখনকার কাঠামো অনুযায়ী ৪ ভাগের এক ভাগ পদ ফাঁকা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ‘ফ্যামিলি কার্ড’সহ অন্যান্য সেবা সম্প্রসারণে নতুন ৪৫ হাজার পদ সৃষ্টি করতে চায় সমাজসেবা অধিদপ্তর।
বিশালসংখ্যক মানুষকে সেবা দিতে বর্তমান কাঠামো সংস্কার প্রয়োজন উল্লেখ করে এরই মধ্যে নতুন পদ সৃজন চেয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। চিঠিতে সেবাগ্রহীতা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে নতুন ৪৫ হাজার ৭৯৬টি পদ সৃজনের প্রস্তাব করা হয়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর দেয়া সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শাহ মোহাম্মদ মাহবুব স্বাক্ষরিত এ চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের অনগ্রসর, অসচ্ছল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক নিরাপত্তা বিধান, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্র বিনির্মাণে সমাজসেবা অধিদপ্তর একটি অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিরলসভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। জাতীয় প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক অগ্রগতির সঙ্গে সংগতি রেখে অধিদপ্তরের কল্যাণমূলক সেবা কাঠামোর পরিধি উত্তরোত্তর সম্প্রসারিত হচ্ছে। সেই লক্ষ্যে দেশের সর্বস্তরে এ কল্যাণমুখী সেবা সফলভাবে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সদর কার্যালয় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট ৪৫ হাজার ৭৯৬টি নতুন পদ সৃজনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এতে সদর কার্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম সুদৃঢ় করতে ৪৪২টি পদ এবং জাতীয় সমাজসেবা একাডেমি ও আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ১৫৩টি পদের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভাগীয় কার্যালয়ের জন্য ২৯২টি, জেলা কার্যালয়ের জন্য ৮৯৬টি, মেট্রোপলিটন ও শহর-সমাজসেবা কার্যালয়ের জন্য ২ হাজার ৩২৮টি এবং উপজেলা ও প্রবেশন কার্যালয়ের জন্য ৩ হাজার ৪৬০টি পদের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোয় রোগী কল্যাণ সমিতির মাধ্যমে সেবা সচল রাখতে ৫৪৭টি হাসপাতালে ৬ হাজার ২০৭টি, তৃণমূল স্তরে নিবিড় সেবা নিশ্চিত করতে ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়ন সমাজসেবা অফিসে ২৮ হাজার ৮৩৪টি এবং শিশু ও প্রবীণ সুরক্ষাসংশ্লিষ্ট আবাসিক ও পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক পদের সংস্থান এ প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি হচ্ছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সরকার গঠনের পর এক মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এ কার্যক্রম শুরু করা হয়। এ কার্যক্রমে নতুন করে যুক্ত হওয়া দুই কোটি উপকারভোগীসহ সমাজসেবা অধিদপ্তরের বার্ষিক নিয়মিত সেবাগ্রহীতার সংখ্যা চার কোটিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। বিশাল এ জনগোষ্ঠীকে সেবা দিতে বর্তমান জনবল কাঠামো পরিবর্তন করা প্রয়োজন বলে মনে করছে অধিদপ্তর। নতুন কাঠামোতে বর্তমানের সঙ্গে এর প্রায় চার গুণ নতুন পদ সৃষ্টি করতে চায় অধিদপ্তর। সংস্থাটি বলছে, এ বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য জরিপ পরিচালনা, ডিজিটাল ডেটাবেজ প্রণয়ন এবং সরাসরি ডিজিটাল উপায়ে (জিটুপি) অর্থ প্রেরণসহ অন্যান্য সেবাপ্রদান কার্যক্রমকে নিরবচ্ছিন্ন, কার্যকর ও মানসম্মত রাখতে বিদ্যমান ১২ হাজার ৭৯১ পদবিশিষ্ট সীমিত জনবল কাঠামোর আমূল সম্প্রসারণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে বর্তমানে সমাজকল্যাণ ও পুনর্বাসনমূলক বিশেষায়িত ৪৭টি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, এসব কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দেশব্যাপী বিভাগ, জেলা ও উপজেলাসহ বিভিন্ন পর্যায়ে মোট ১ হাজার ৪৭টি কার্যালয় রয়েছে। সারা দেশে ১২ হাজার ৭৯১টি পদের প্রায় তিন হাজার পদই ফাঁকা রয়েছে বলে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে। ফাঁকা পদে কর্মরতদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হচ্ছে বিধায় সেবাদানে নিয়মিত হিমশিম খাচ্ছেন সমাজসেবায় কর্মরতরা। সংকটের কারণে একই কর্মকর্তাকে নিজের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলার পাশাপাশি অন্য উপজেলারও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। এতে সব জায়গায় প্রয়োজনমতো লোকবল দেয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমান কাঠামো অনুযায়ীও আমাদের প্রায় তিন হাজার পদ ফাঁকা রয়েছে। জনবল সংকটের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানেই প্রয়োজন অনুযায়ী লোকবল দেয়া যাচ্ছে না। ফলে সব জায়গায় কাজ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিদ্যমান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অতিরিক্ত চাপ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। এতে অনেকের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে। আপাতত এ পরিস্থিতির মধ্যেই আমাদের কাজ চালিয়ে নিতে হচ্ছে। এর মধ্যে দেড় হাজারের মতো নতুন জনবল নেয়ার জন্য আমরা বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি। এজন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে, আবেদন গ্রহণ শেষ হয়েছে এবং এখন নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। কিছু রিট পিটিশনসহ মামলা চলমান থাকায় বাকি পদগুলোতে নিয়োগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ২ কোটি ১০ লাখ মানুষকে সেবা দেয়া হচ্ছে এ অধিদপ্তরের অধীনে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি, হিজড়া জনগোষ্ঠী ও চা শ্রমিকসহ বিভিন্ন খাতে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় ১ কোটি ৬২ লক্ষাধিক মানুষকে সেবা দেয়া হচ্ছে। দারিদ্র্য নিরসন কার্যক্রমের আওতায় পল্লী সমাজসেবা কার্যক্রম, পল্লী মাতৃকেন্দ্র কার্যক্রম, শহর সমাজসেবা কার্যক্রম, দগ্ধ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পুনর্বাসন, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও আশ্রয়ণ প্রকল্প কার্যক্রমের অধীনে মোট সেবাগ্রহীতা ৫৬ লাখ। সেবামূলক, কমিউনিটি ক্ষমতায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা উন্নয়নের আওতায় হাসপাতাল সমাজসেবা কার্যক্রম, প্রবেশন অ্যান্ড আফটার কেয়ার সার্ভিসসহ কয়েকটি খাতে সেবা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম ও সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধের আওতায় সরকারি শিশু পরিবার, ছোটমণি নিবাস, দিবাকালীন শিশু যত্ন কেন্দ্রসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুরক্ষা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় ২৫ লক্ষাধিক মানুষকে সেবা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন কাঠামোতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংস্থাটি।
নতুন পদ সৃজনে মন্ত্রণালয়কে দেয়া চিঠির বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শূন্য পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেয়ার পাশাপাশি বর্ধিত জনবলের একটি নতুন সাংগঠনিক কাঠামোর প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে ১৯৮৪ সালের এনাম কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি জনবল কাঠামো দিয়ে কাজ করছি, যদিও পরবর্তী সময়ে সেবা বৃদ্ধির সঙ্গে কিছু পদ বাড়ানো হয়েছে। তখন জেলা ও তৃণমূল পর্যায়ে মূলত ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ভিত্তিতে এ কাঠামো তৈরি হয়। এরপর বিভিন্ন ধরনের ভাতা কর্মসূচি চালু হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি যুক্ত হয়েছে এবং ২৫০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৩ হাজার মানুষ থাকে। এত বিস্তৃত কার্যক্রম বর্তমান জনবল দিয়ে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।’