ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার

আজীবন সম্মাননা পেলেন হাসনাত আবদুল হাই

বাংলা সাহিত্যের প্রসার ও লেখকদের অনুপ্রাণিত করতে প্রতি বছরের মতো এবারো ‘‌ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০২৩’ প্রদান করা হয়েছে। এ সাহিত্য পুরস্কারের ১৩তম আসর ছিল এটি।

বাংলা সাহিত্যের প্রসার ও লেখকদের অনুপ্রাণিত করতে প্রতি বছরের মতো এবারো ‘‌ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০২৩’ প্রদান করা হয়েছে। এ সাহিত্য পুরস্কারের ১৩তম আসর ছিল এটি। এবার আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন খ্যাতনামা লেখক, ঔপন্যাসিক, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক হাসনাত আবদুল হাই। এছাড়া তিন শাখায় পুরস্কার পেয়েছেন তিন লেখক। প্রবন্ধ, আত্মজীবনী, ভ্রমণ ও অনুবাদ (মননশীল) শাখায় ‘‌প্লেটো প্রবেশিকা’ গ্রন্থের জন্য অনুবাদক আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং কবিতা ও কথাসাহিত্য শাখায় (সৃজনশীল) ‘‌আমাদের পরাবাস্তব টাউনের দিনরাত্রি’ গ্রন্থের জন্য ধ্রুব এষ পুরস্কার পেয়েছেন। এছাড়া তরুণ সাহিত্যিক শাখায় ‘‌টক টু মি’ ছোটগল্পের জন্য পুরস্কার পেয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উম্মে ফারহানা।

গতকাল রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা ও পুরস্কার বিতরণ করা হয়। বাংলা সাহিত্যের প্রসার ও লেখকদের অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে এক যুগের বেশি সময় ধরে লেখক ও সাহিত্যিকদের সম্মাননা দিয়ে আসছে ব্র্যাক ব্যাংক ও দৈনিক সমকাল। এবার তৃতীয়বারের মতো ‘‌আজীবন সম্মাননা পুরস্কার’ দেয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট লেখক এবং বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। অতিথি ছিলেন হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সমকালের কর্ণধার এ কে আজাদ, ব্র্যাক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারপারসন ফারুক মঈনউদ্দীন, ‌‘‌ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০২৩’-এর জুরি বোর্ডের সদস্য গবেষক ও প্রাবন্ধিক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস ও সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী।

‘‌আজীবন সম্মাননা’ পাওয়া হাসনাত আবদুল হাইকে পুরস্কার হিসেবে ৫ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র তুলে দেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। এছাড়া ‘‌প্রবন্ধ, আত্মজীবনী, ভ্রমণ ও অনুবাদ’ এবং ‘‌কবিতা ও কথাসাহিত্য’—এ দুই শ্রেণীতে বিজয়ী প্রত্যেককে পুরস্কার হিসেবে ২ লাখ টাকা এবং ‘‌তরুণ সাহিত্যিক পুরস্কার’ বিজয়ীকে ১ লাখ টাকার চেকসহ ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র তুলে দেয়া হয়।

আজীবন সম্মাননা জানানোর জন্য ব্র্যাক ব্যাংক ও সমকালকে ধন্যবাদ জানিয়ে হাসনাত আবদুল হাই বলেন, ‘সাহিত্যের জন্য এমন সম্মাননা আমার জন্য আনন্দ ও গৌরবের। পঞ্চাশের দশকে কলেজে পড়াকালে লেখালেখি শুরু করেছি। তখন এটি ছিল শখের ব্যাপার। পরে সমাজ, মানুষ, প্রগতি, শান্তি, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার জন্য দায়বদ্ধতা থেকে লিখি। এখন আর শখের জন্য না, দায়িত্ব পালনের জন্য লিখি।’

এবার তিন শাখায় মোট ৪০০টি বই জমা পড়ে। এর মধ্য থেকে ১৮টি বই জুরি বোর্ডের কাছে পাঠানো হয়। সেখান থেকে বিজয়ী তিন লেখকের বই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়। এবারের জুরি বোর্ডে ছিলেন গবেষক ও প্রাবন্ধিক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস, প্রাবন্ধিক আক্তার কামাল ও কবি আবিদ আনোয়ার।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, ‘‌বাংলাদেশ নানা দিক দিয়ে একটি বিপর্যস্ত অবস্থায় আছে। তবে বাংলাদেশে বেশকিছু সম্পদ আছে। বিজ্ঞানের কল্যাণে উচ্চফলনশীল বীজ, হাঁস, মুরগি, মাছ, ধান, গমের উৎপাদন অনেক বেড়েছে। এ বৃদ্ধির ফলে বিশ্বে মানুষ পিছিয়ে পড়া অবস্থা থেকে উত্তীর্ণ হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দিক দিয়ে উন্নততর নেতৃত্ব বিশ্বে সেভাবে দেখা যায় না। এ বাস্তবতার মধ্যে আমাদের লেখকরা এসব বিষয়ে চিন্তা করছেন। সামনে এ চিন্তা আরো বেশি করে করা দরকার। ইউরোপ, আমেরিকাকে অনুকরণ না করে আমাদের বিশেষজ্ঞদেরও উন্নতির সুযোগ খুঁজতে হবে। এজন্য ইতিহাস-ঐতিহ্যে সংযুক্ত থাকতে হবে, বিচ্ছিন্ন হলে সম্ভব নয়। দেশের উন্নয়নের জন্য যে মননশীলতা ও শ্রম দরকার, সেই বোধ আমাদের দেশের লেখকের মধ্যে আরো বেশি করে জাগ্রত হোক। সেজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক গণজাগরণ। কিন্তু রাজনৈতিক জাগরণ এখনো সেভাবে দেখা যায়নি। কোনো জাতির উন্নতির জন্য, ওপরে ওঠার জন্য চিন্তার চর্চা জরুরি। সেদিক থেকে আজকে যারা পুরস্কার পেয়েছেন তারা ভূমিকা রাখবেন। আজ তাদের সমাদৃত করা হয়েছে।’

সাহিত্য প্রসারের এ উদ্যোগ সম্পর্কে ব্র্যাক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারপারসন ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, ‘এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার দেশের সাহিত্য অঙ্গনে একটি স্বীকৃত ও সম্মনজনক স্থান দখল করতে পেরেছে। দেশের লেখক ও সাহিত্যিকদের, বিশেষ করে তরুণ লেখকদের অনুপ্রাণিত করছে। আর পাঠকরা পাচ্ছেন রুচিশীল বই পড়ার সুযোগ।’

এ কে আজাদ বলেন, ‘‌সমকাল বরাবরই বাংলাদেশে শিল্প ও সাহিত্য চর্চার একটি শক্ত ভিত রচনা করে আসছে। শুধু তথ্যের নয়, মনের চাহিদার ওপরও আলোকপাত করে আসছে। আমরা বিশ্বাস করি সমকাল আগামীতেও এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। ভবিষ্যতে আরো বড় পরিসরে আয়োজন করার চেষ্টা করবে। বিবেকবান মানুষ সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি। এজন্য প্রয়োজন শিল্প-সাহিত্যের অবারিত চর্চা। আমরা চর্চার পরিসর আরো বাড়াতে চাই।’

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বণিক বার্তা সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদসহ লেখক, সাংবাদিক, গবেষক ও সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের ব্যক্তিরা।

আরও