বিনিয়োগে আস্থা ফেরানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

মো. কাউসার আলম। দ্য ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) প্রেসিডেন্ট। পেশাগত জীবনে তিনি সেভেন রিংস সিমেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেডের গ্রুপ চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার ও কোম্পানি সেক্রেটারি। পাশাপাশি জনতা ব্যাংক পিএলসির পরিচালক এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক সংস্থা আর্ক ফাউন্ডেশনের সম্মানসূচক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি তিনি বণিক বার্তার সঙ্গে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্সি পেশার নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ব্যবসা ও শিল্প খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ কী?

বর্তমানে ব্যবসা ও শিল্প খাত একসঙ্গে অনেকগুলো চাপ মোকাবেলা করছে। ডলারের বিনিময় হার ৮৫-৮৬ টাকা থেকে একপর্যায়ে ১২৫ টাকায় উঠেছে। এর সঙ্গে প্রায় পাঁচ বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৩-১৫ শতাংশে ওঠা এবং জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব রয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যুতের দামও প্রায় ১৬-১৭ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হওয়ায় এসব ব্যয়ের প্রভাব সরাসরি শিল্পে পড়ে। একই সঙ্গে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রেও সমস্যা হচ্ছে। অথচ আমাদের রফতানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। বিদেশী ক্রেতারা নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা চান। জ্বালানি ও লজিস্টিকসের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো বিনিয়োগে আস্থার ঘাটতি। বিনিয়োগ ঋণের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ শতাংশের আশপাশে, যা দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। ফলে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমাতে সরকারের কী করা উচিত?

প্রথমত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে এর সমাধান হবে না। কৃষি উৎপাদন যাতে ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি, গ্যাস, লজিস্টিকস, আমদানি-রফতানি ও বিনিময় হার—সবগুলো বিষয় সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ টাকার অবমূল্যায়ন হলে আমদানিনির্ভর শিল্পের ব্যয় সরাসরি বেড়ে যায়। পাশাপাশি সুদহার ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন ব্যয়, সেগমেন্ট ও চ্যানেলের খরচ আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করে কোথায় ব্যয় কমানো সম্ভব তা চিহ্নিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অপর্যাপ্ত বাজার গবেষণাও কি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করছে?

অবশ্যই। অনেক শিল্পে এরই মধ্যে চাহিদার তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এর পরও নতুন বিনিয়োগকারী আসছেন। সিমেন্টসহ বিভিন্ন শিল্পে এর উদাহরণ রয়েছে। সরকারের কাছে প্রতিটি শিল্পের সক্ষমতা ও চাহিদার তথ্য থাকা উচিত। কোনো খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকলে সেখানে নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজন আছে কিনা, তা বিবেচনা করা দরকার। একইভাবে কোম্পানিকেও শত বা হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেয়ার আগে যথাযথ বাজার গবেষণা করতে হবে। শিল্পে কারা আছে, তাদের সক্ষমতা কত, ভবিষ্যতে চাহিদা কতটা বাড়বে—এসব বিশ্লেষণ ছাড়া বড় বিনিয়োগ করা উচিত নয়।

করের হার না বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ কতটা রয়েছে?

সুযোগ অনেক বেশি। আমাদের সমস্যা করের হার নয়, বরং করের আওতা কম। যারা করের আওতায় আছে, তাদের কাছ থেকেই বারবার কর আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কর জালের বাইরে রয়েছে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এটি অন্তত ১৫ শতাংশে নেয়া উচিত। গত বছর ৬ দশমিক ৮ শতাংশ কর-জিডিপি অনুপাতে প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব এসেছে। কর-জিডিপি অনুপাত ১২-১৫ শতাংশে নেয়া গেলে রাজস্ব ১০-১১ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে। তাই করদাতার ওপর চাপ না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ করের অংশ বাড়াতে হবে। বর্তমানে ভ্যাটসহ পরোক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভরতা রয়েছে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ে।

কর ব্যবস্থার ডিজিটাইজেশন কি রাজস্ব আদায় বাড়াতে পারে?

ইনভয়েসিং, কর মূল্যায়ন ও কর আদায়—সবকিছু ডিজিটাল করা গেলে ব্যক্তির হস্তক্ষেপ কমবে এবং রাজস্ব আদায় বাড়বে। আমরা আমদানিনির্ভর অর্থনীতি। কোন কোম্পানি কী পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করছে, সেই তথ্য সরকারের কাছে রয়েছে। এ তথ্য ব্যবহার করে কোম্পানির সম্ভাব্য উৎপাদন, বিক্রয় ও কর-ভ্যাটের পরিমাণ অনেক বেশি কার্যকরভাবে অনুসরণ করা সম্ভব। সঠিকভাবে ডিজিটাইজেশন করা গেলে দুই-তিন বছরের মধ্যেই কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ থেকে ১২-১৫ শতাংশে নেয়া সম্ভব। তবে কর ব্যবস্থায় আস্থার ঘাটতিও দূর করতে হবে। কোনো করদাতা সরকারের কাছে অর্থ পাওনা হলে দ্রুত সেই অর্থ ফেরত দেয়ার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। এতে করদাতার আস্থা বাড়বে।

সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনাতেও কি সংস্কার প্রয়োজন?

এখন নাগরিকরা শুধু কত কর দিচ্ছেন তা জানতে চান না; তারা জানতে চান, সেই টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও লজিস্টিকসের মতো সেবা পর্যাপ্ত না হলে নাগরিককে নিজের পকেট থেকে ব্যয় করতে হয়। ফলে করের প্রকৃত বোঝা আরো বেড়ে যায়। সরকারের ব্যয়ের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও দক্ষতা প্রয়োজন। বছরের শুরুতে অনেক মন্ত্রণালয়ে অর্থ ব্যয় হয় না, আবার অর্থবছরের শেষ দিকে তাড়াহুড়ো করে ব্যয় করা হয়। এতে অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হয় না। তাই কর সংগ্রহের পাশাপাশি সরকারি অর্থের ব্যবহারেও স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। পেশাদার সিএমএদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যয় সাশ্রয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতে বিষয়টি সরকারের বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে—এটি বড় অর্জন। এ অগ্রগতিতে ব্যাংক খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু আমাদের আর্থিক সম্পদের প্রায় ৮০-৯০ শতাংশই ব্যাংকনির্ভর। পুঁজিবাজারের অংশ মাত্র ৬-৯ শতাংশ। যদিও পুঁজিবাজার অর্থায়নের বড় উৎস হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও পুঁজিবাজার সমান্তরালভাবে বিকশিত হয়নি।

ব্যাংক খাত এখন বড় সংকটে রয়েছে। সরকারি হিসাবে, ব্যাংক খাতের ৩২-৩৬ শতাংশ পর্যন্ত সম্পদ অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৩ টাকার মধ্যে ১ টাকা অনুৎপাদনশীল ঋণে পরিণত হয়েছে। পুঁজিবাজারেও দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট রয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদন, তথ্যের স্বচ্ছতা ও করপোরেট গভর্ন্যান্সে দুর্বলতা ছিল। আইনকানুনের অভাব নেই, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে।

ব্যাংক খাত ও পুঁজিবাজার পরিস্থিতির উন্নতির জন্য করণীয় কী?

পুঁজিবাজারকে নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হতে দিতে হবে। বাজারে কারসাজি বন্ধ করতে হবে। দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতার কারণে অনেক সক্ষম বিনিয়োগকারী বাজার থেকে দূরে সরে গেছেন। তাদের আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। ব্যাংক খাতে কাঠামোগত ও কারিগরি সংস্কার প্রয়োজন। যেসব মূলধন নষ্ট হয়ে গেছে, সেগুলো মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনঃমূলধনীকরণ করতে হবে। সংকটাপন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দ্রুত পুনর্গঠন করতে হবে। সব সংস্কার একসঙ্গে করা সম্ভব নয়। কোনটি তাৎক্ষণিক, কোনটি স্বল্পমেয়াদি ও কোনটি দীর্ঘমেয়াদি—তা নির্ধারণ করতে হবে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে রাজনৈতিক নিয়োগ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করাও জরুরি।

আইসিএমএবি সভাপতি হিসেবে আপনার মেয়াদের প্রধান অগ্রাধিকার কী?

আমরা সামনের বছরগুলোতে দেশের চাহিদা বিবেচনায় ইনস্টিটিউটকে কোথায় নিতে চাই, সে বিষয়ে একটি কৌশলগত পরিকল্পনা করছি। আমাদের মূল লক্ষ্য উচ্চমানের পেশাদার কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট তৈরি করা। বর্তমান অর্থনীতির আকার অনুযায়ী দেশে ২০-২৫ হাজার পেশাদার অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রয়োজন, অথচ আমাদের সংখ্যা প্রায় ২ হাজারের আশপাশে। অর্থনীতি এক ট্রিলিয়ন ডলারে গেলে এ চাহিদা আরো বাড়বে। তাই আমরা ৬৪ জেলায় আউটরিচ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছি। একই সঙ্গে ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অনলাইন ভর্তি, ক্লাস এবং ভবিষ্যতে পরীক্ষার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য যথাযথ সংখ্যক উচ্চমানের পেশাদার তৈরি করা, যারা দেশের অর্থনীতি ও করপোরেট খাতে অবদান রাখবেন।

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোকে টিকে থাকতে কী করতে হবে?

শুধু উৎপাদন করলেই এখন আর হবে না। কত কম খরচে, কত দক্ষতার সঙ্গে এবং কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে পণ্য উৎপাদন করা যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সাপ্লাই চেইনভিত্তিক ও অ্যাক্টিভিটিভিত্তিক কস্টিং করা দরকার। কোথায় কত খরচ হচ্ছে, কোথায় দক্ষতা বাড়ানো যায়—এসব জানতে হবে। বিশ্ববাজারে কোনো পণ্যই প্রতিযোগিতার বাইরে নয়। যেখানে কম দামে ভালো পণ্য পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই তা আসবে। তাই আমাদের আগের ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে পেশাদার ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা, নির্ভরযোগ্যতা ও কম খরচে ধারাবাহিকভাবে গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য দেয়ার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। সরকারকেও কস্ট অডিট ও ম্যানেজমেন্ট অডিটকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, সামান্য কস্ট অডিটের খরচ বাঁচাতে গিয়ে কোটি বা হাজার কোটি টাকার একটি প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা উচিত নয়।

আরও