প্রশাসনিক উদাসীনতায় অপরাধের দুর্গে রূপ নিয়েছে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার গহিন পাহাড়ে অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুর এখন আর সাধারণ কোনো জনপদ নয়। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল থাকায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা এ এলাকাটি কার্যত একটি অপরাধের দুর্গে পরিণত হয়েছে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার গহিন পাহাড়ে অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুর এখন আর সাধারণ কোনো জনপদ নয়। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল থাকায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা এ এলাকাটি কার্যত একটি অপরাধের দুর্গে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, প্রশাসনের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দীর্ঘদিনের উদাসীনতা ও পরোক্ষ আশ্রয়ে এখানে রাষ্ট্রীয় আইনের চেয়ে অপরাধী চক্রের নির্দেশই বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছে। এ সংকট নিরসনে একাধিক সমন্বিত পরিকল্পনা অজানা কারণে বাস্তবায়ন না হওয়ায় সরকারি প্রশাসনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন জনপদে পরিণত হয়েছে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। আশপাশের বাসিন্দারা বলছেন, অস্ত্র ও মাদক কারবার, পাহাড় কাটার সিন্ডিকেট এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব এতটাই গভীরে পৌঁছেছে যে পুলিশ, র‌্যাব কিংবা জেলা প্রশাসন কেউই সেখানে স্থায়ী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না।

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে র‌্যাবের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।’

সীতাকুণ্ড ভূমি অফিসের তথ্যমতে, জঙ্গল সলিমপুরের মোট আয়তন প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর। প্রায় চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় ও খাসজমি দখল করে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এটি দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। এলাকাটি এখনো সশস্ত্র পাহারায় নিয়ন্ত্রিত হয়, বহিরাগতদের প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ। এক সময় স্বল্পমূল্যে এ এলাকার জমি ও দখলদারদের তৈরি প্লট বিক্রি হলেও চট্টগ্রাম শহর থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত লিংক রোড উদ্বোধনের পর যাতায়াত সুবিধার কারণে জমির মূল্য হঠাৎ বেড়ে প্রতি শতক ১০ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। সড়কটি চালু হওয়ার পরই প্রশাসনের নজরে আসে। প্রশাসনের হিসাবে আলী নগর ও জঙ্গল সলিমপুর ইউনিয়নে লক্ষাধিক মানুষ বাস করে। বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী সরকারি এসব দখল হয়ে যাওয়া জমির আনুমানিক মূল্য ৮-১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এ বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করেই দীর্ঘদিন ধরে সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা চলে আসছে জঙ্গল সলিমপুরে। ২০২৫ সালের ৩০ আগস্ট সেনাবাহিনীর অভিযানে জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকায় একটি দেশীয় অস্ত্র কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়। ওই সময় বিপুল দেশীয় অস্ত্রসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণকারী সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতারা অনেকেই শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছে, যা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেয়ার ক্ষেত্রেও বড় বাধা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সীতাকুণ্ড উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমুল ও আলিনগর মিলিয়ে আনুমানিক ৭০০-৮০০ একর সরকারি জায়গা বেদখল রয়েছে। ওখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেতে পারে না। সলিমপুরের প্রবেশমুখ থেকেই দখলকারীদের অনেক ইনফর্মার রয়েছে। ওখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থাও নাজুক, ফলে দ্রুত প্রশাসনিক তৎপরতা পরিচালনাও সম্ভব হয় না।’

সীতাকুণ্ড ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সীতাকুণ্ড সদর থেকে জঙ্গল সলিমপুরের দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের উত্তরে ভাটিয়ারী ইউনিয়ন, দক্ষিণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, পূর্বে হাটহাজারী উপজেলা ও পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর (সন্দ্বীপ চ্যানেল)। দক্ষিণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আওতাধীন সীমানার পার্শ্ববর্তী হওয়ায় পাহাড়ি খাসজমিতে দশকের পর দশক ধরে উপকূলীয় এলাকার উদ্বাস্তু মানুষের বসতিকে কেন্দ্র করে একটি বৃহৎ ভূমি বাণিজ্য জঙ্গল সলিমপুরকে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে অপ্রতিরোধ্য অঞ্চলে পরিণত করেছে।

চট্টগ্রামের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে জানা গেছে, সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতবাড়ি উচ্ছেদ করতে গিয়ে একাধিকবার হামলা ও বাধার মুখে পড়েছে প্রশাসন। ২০১৯ সালে পাহাড় কাটা বন্ধের অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। ২০২২ সালের আগস্টে অভিযানে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও তাদের পরিচালিত টিম। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে পুনরায় উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয় জেলা প্রশাসন। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের হামলায় জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, থানার ওসি ও পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। ৫ আগস্টের পর সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে দুই সাংবাদিক হামলার শিকার হন। সর্বশেষ সোমবার অস্ত্র ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হন চার র‌্যাব কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে আব্দুল মোতালেব নামে এক র‌্যাব কর্মকর্তা নিহত হন। আহত তিনজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রামের মতো দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর জেলা শহরের একটি এলাকায় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণহীনতার বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. রাসেল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে নিয়মিত সীতাকুণ্ড থানা অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু সোমবারের ঘটনাটি মর্মান্তিক ও দুঃখজনক। এরই মধ্যে র‌্যাবের মহাপরিচালক সংবাদ সম্মেলনে জঙ্গল সলিমপুর বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিকল্পনা ও বিস্তারিত তথ্য শেয়ার করেছেন। এ এলাকার অপরাধ দমন, দায়ীদের গ্রেফতারসহ প্রশাসনিক আধিপত্য পুনরুদ্ধারে শিগগিরই একটি যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হবে।’

২০২২ সালে চট্টগ্রামের পাহাড় কাটা ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে তৎকালীন জেলা প্রশাসনের গঠিত অনুসন্ধান কমিটি পর্যবেক্ষণেও উঠে আসে জঙ্গল সলিমপুরের সংকটের কথা। এ-সংক্রান্ত এক সভার কার্যবিবরণীতে উঠে আসে সার্বিক বিষয়। নথিপত্র অনুযায়ী, জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড় কর্তনের জন্য মূল দায়ী করা হয়েছে দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপসহ উপকূলীয় নদীভাঙন কবলিত ছিন্নমূল মানুষদের। জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর ছিন্নমূল বস্তিতে আনুমানিক ৪০ হাজার লোক অবৈধভাবে বসবাস করছে। এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করা হলেও অভিযুক্তরা আগেই বিষয়টি জেনে যাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছেন প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা। এ এলাকাটি যারা ভোগদখল করে রেখেছে, তাদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। এ সিন্ডিকেটের লোকেরা এমনভাবে রাতের আঁধারে পাহাড় কেটেছে যাতে এ পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি সরকারি দপ্তরগুলোর পক্ষে। মূলত এ এলাকাটি দুর্গম ও পাহাড়ি হওয়ার কারণে এখানে অভিযান পরিচালনা করা দুরূহ বলে দাবি করা হয় ওই বৈঠকে।

২০২২ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত সভার প্রতিবেদনে বলা হয়, জঙ্গল সলিমপুর ও আলিনগর এলাকার দখলদাররা উচ্ছেদ বন্ধ ও পুনর্বাসনের দাবিতে আদালতে রিট করেছে। রিটে উল্লেখ করা হয়, হাইকোর্টের রিট নং ১৪৯৬৮/১৭-এর নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ বসবাসকারীদের অন্যত্র পুনর্বাসন করা যেতে পারে; অথবা কমিউনিটি লিডারদের সঙ্গে সমন্বয় করে পাহাড়/টিলা কর্তন বন্ধ রাখার শর্তে পরিকল্পিতভাবে শুধু ভ্যালি বা সমতল অংশে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।

একই সময়ে জঙ্গল সলিমপুর আলিনগর এলাকার পাহাড়/টিলা কর্তন/মোচন রোধে ১১টি সুপারিশ দেয় চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর। সুপারিশগুলো হলো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা, পাহাড় বা টিলায় পরিষেবা সার্ভিস বন্ধ করা, পাহাড়ের শ্রেণীর ভূমি শ্রেণী সংশোধন, পাহাড়ের শ্রেণীর সরকারি খাসজমি চিহ্নিতকরণ, কমিউনিটি লিডারদের মাধ্যমে পাহাড় ব্যবস্থাপনা করা, পাহাড়ের তথ্যভাণ্ডার ও কন্টুর ম্যাপ বা নকশা প্রস্তুতকরণ, পাহাড় কাটার প্রকৃতি ও পরিমাণ ও কর্তনকারীদের তালিকা প্রণয়ন, পাহাড় কর্তনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও দ্রুত চার্জশিট প্রদান, ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়ের তালিকা প্রণয়ন ও হালনাগাদ করা, রিট পিটিশনের সমাধান এবং পাহাড় কর্তন/মোচন রোধকল্পে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করার সুপারিশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু চট্টগ্রামের প্রশাসন দীর্ঘ এ সময়েও সামগ্রিকভাবে কোনো সুপারিশ ও পরামর্শই বাস্তবায়ন করতে পারেনি।

এমনকি ২০২২ সালের শুরুর দিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জঙ্গল সলিমপুরের ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি উদ্ধার ও সেখানে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে বৈঠক হয়। সেখানে ১৫ দিনের মধ্যে জমি উদ্ধারের নির্দেশ, বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে টাস্কফোর্স, ডিআইজির নেতৃত্বে উচ্ছেদ-কমিটি গঠন এবং পাহাড় ব্যবস্থাপনা অফিস, ব্যারাক ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। আলীনগর-সলিমপুর নিয়ে মাস্টারপ্ল্যানের সিদ্ধান্তও হয়েছিল, কিন্তু উদ্যোগগুলো আজও বাস্তবায়ন হয়নি।

এদিকে গতকাল দুপুরে চট্টগ্রামের পতেঙ্গাস্থ র‌্যাব-৭-এর সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে র‌্যাবের মহাপরিচালক একেএম শহিদুর রহমান বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসী ও তাদের অবৈধ আস্তানা গুঁড়িয়ে দেয়া হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে র‌্যাব প্রতিষ্ঠা থেকে এখন পর্যন্ত ৭৫ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। আমরা যেকোনো মূল্যে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করব।’

আরও