সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া অর্থনৈতিক সংকট থেকে টেকসই উত্তরণ কঠিন

সাব্বীর আহমেদ। প্রায় তিন দশকের পেশাজীবনে রয়েছে এক যুগেরও বেশি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা। চলতি বছরের জুনে দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সম্প্রতি বণিক বার্তার সঙ্গে আলাপচারিতায় দেশের অর্থনীতি, আর্থিক খাত, পুঁজিবাজার ও নিরীক্ষা পেশার বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন তিনি

একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও আর্থিক খাতকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা এখন খুব একটা ভালো নয়। অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। ব্যাংক খাত খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে, যা অত্যন্ত অশনিসংকেত। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হলেও এখনো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে আসেনি। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। সুদহার বাড়ানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হলেও মূল্যস্ফীতি কমছে না। এর সঙ্গে রয়েছে দীর্ঘদিনের নিম্ন রাজস্ব আহরণ ও ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।

করহার না বাড়িয়ে কীভাবে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো সম্ভব?

ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হলে প্রথমেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এন্ড-টু-এন্ড অটোমেশন করতে হবে। করদাতা ও কর কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। এতে অনিয়ম ও আন্ডারহ্যান্ড ডিলিংয়ের সুযোগ কমবে এবং রাজস্ব আহরণ বাড়বে। আরেকটি বিষয় হলো করনীতি প্রণয়নে ব্যবসার বাস্তবতা বিবেচনায় নেয়া। নীতিনির্ধারণে আমলাতন্ত্রের ভূমিকা বেশি হলেও একজন ব্যবসায়ী যে ঝুঁকি নেন, সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের থাকে না। তাই নীতি প্রণয়নে ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের আরো বেশি সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। রাজস্ব বাড়াতে করদাতাকে উৎসাহিত করাও জরুরি। একজন করদাতা যদি দেখেন তার দেয়া অর্থ অপচয় বা দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে চলে যাচ্ছে, তাহলে কর দেয়ার প্রণোদনা কমে যায়। তাই এনবিআর আধুনিকায়নের পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনের মান উন্নত করেও কি রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে?

বিষয়টি পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়। আমাদের অডিটরদের সবাই শতভাগ কমপ্লায়েন্সের সঙ্গে কাজ করছেন—এ কথা বলা কঠিন। আইসিএবি হিসেবে আমরা অডিটরদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ ও ক্যাপাসিটি বিল্ডিং করছি। একই সঙ্গে কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স ও এনফোর্সমেন্ট জোরদার করছি। তবে বড় সমস্যা হলো তথ্যের প্রাপ্যতা। অনেক কোম্পানি ও গ্রুপের একাধিক ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে কিছু হিসাব অডিটরের কাছে প্রকাশ করা হয় না। ফলে অডিটরের পক্ষে সব ব্যাংক হিসাবের পূর্ণতা যাচাই করা কঠিন। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, আইসিএবি ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এমন একটি অভিন্ন ডেটাবেজ থাকা দরকার, যেখানে একজন অডিটর কোনো কোম্পানির সব ব্যাংক হিসাবের অস্তিত্ব যাচাই করতে পারবেন।

কয়েক বছর ধরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ কমেছে এবং অনেক কোম্পানির মুনাফাও সংকুচিত হয়েছে। নিরীক্ষা করতে গিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কী ধরনের সমস্যা দেখতে পাচ্ছেন?

আমাদের ব্যবসাগুলোর একটি বড় অংশের মধ্যে টেকসই ব্যবসার পরিবর্তে প্রবৃদ্ধির ওপর অতিরিক্ত জোর দেয়ার প্রবণতা রয়েছে। অনেক সময় যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়াই ব্যবসা সম্প্রসারণ করা হয়। অনেক ব্যবসা খুব কম ইকুইটি দিয়ে বড় ধরনের সম্প্রসারণ করে এবং এর বেশির ভাগ অর্থ আসে ব্যাংকঋণ থেকে। একটি পর্যায় পর্যন্ত ঋণ উপকারী। কিন্তু সীমার বাইরে গেলে সেটিই ঝুঁকিতে পরিণত হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতাও বড় সমস্যা। সময়মতো গ্যাস, বিদ্যুৎ, ইউটিলিটি সংযোগ না পাওয়া এবং কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্বের কারণে প্রকল্প পিছিয়ে যায়। এতে ঋণের সুদ ও অন্যান্য ব্যয় বাড়তে থাকে। আমাদের ব্যবসাগুলো এখনো অনেক ক্ষেত্রে টপলাইন বা বিক্রয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়; বটমলাইন, মুনাফা ও নগদ প্রবাহ নয়। ২০২২ সালে টাকার বড় অবমূল্যায়ন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়াও ব্যবসায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। এসব কারণে অভ্যন্তরীণ ভোগ ও বিনিয়োগ মন্থর হয়েছে।

প্রচলিত ডেট-ইকুইটি অনুপাত কি বর্তমান বাস্তবতায় পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে?

কাগজে-কলমে কোনো প্রকল্পে ৩০ শতাংশ ইকুইটি ও ৭০ শতাংশ ঋণ থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে সে ইকুইটি থাকে না। প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে দেখিয়ে ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেয়া হয় এবং প্রকল্পটি কার্যত ব্যাংক অর্থায়ননির্ভর হয়ে পড়ে। এখানে ব্যাংকারদেরও দায়িত্ব রয়েছে। বড় বড় গ্রুপ আজ যে সংকটে পড়েছে, তা একদিনে হয়নি। বহু বছর ধরে সমস্যা তৈরি হয়েছে। ব্যাংকারদের শুধু ঋণদাতা নয়, ব্যবসার উপদেষ্টা হিসেবেও ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের ব্যবসার ইতিহাসও খুব দীর্ঘ নয়। প্রথম প্রজন্মের উদ্যোক্তারা সংগ্রাম করে ব্যবসা বড় করেছেন। এখন দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য যে পরিপক্বতা, শিক্ষা ও হ্যান্ডহোল্ডিং প্রয়োজন, আমাদের ব্যবসায়িক ইকোসিস্টেমে তা এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।

দেশের ব্যাংক খাতের সংস্কারে আপনি কাজ করেছেন। দুই বছর আগের তুলনায় এখন ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি কেমন দেখছেন?

ইতিবাচক দিক থেকে দেখলে আগে যেসব সমস্যা কার্পেটের নিচে চাপা ছিল, সেগুলো এখন সামনে এসেছে। একজন রোগীর রোগ নির্ণয় হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে রোগ নির্ণয় মানেই রোগী সুস্থ হয়ে গেছে এমন নয়। আমরা এখন জানি, ব্যাংক খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ, লুটপাট ও অর্থ পাচার হয়েছে। এখন প্রয়োজন কার্যকর রেমিডিয়াল প্ল্যান। এক-দুই বছরের মধ্যে ব্যাংক খাত পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াবে, এমনটা আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি। দীর্ঘমেয়াদে যেসব ব্যাংক প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে পারবে না, তাদের বিষয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হতে পারে। তবে এখনই সে সিদ্ধান্ত নেয়া কিছুটা অপরিপক্ব হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যাংকগুলোর সুশাসন নিশ্চিত করা। নতুন বোর্ড গঠনের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি আরো স্বাধীন ও শক্তিশালী হতে হবে। ব্যাংকিং ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় মূলধন হলো আস্থা। মানুষ যদি ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারায়, তাহলে অর্থনীতিতে বড় সমস্যা তৈরি হবে।

ব্যাংকগুলোয় বড় ধরনের সঞ্চিতি ঘাটতি রয়েছে। আইএফআরএস-৯ পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে অনেক ব্যাংকের মূলধনই ক্ষয় হয়ে যেতে পারে। এ সমস্যার সমাধান কী?

বর্তমানে কোনো ব্যাংকের সঞ্চিতি ঘাটতি থাকলে এবং তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ করা সম্ভব না হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ডেফারেলের আবেদন করা হয়। অডিটরের দায়িত্ব হলো আর্থিক প্রতিবেদনে বিষয়টি তুলে ধরা, যাতে আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডাররা বিষয়টি জানতে পারেন।

কিন্তু আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়ন হলে ডেফারেলের সুযোগ থাকবে না। তখন সঞ্চিতি ঘাটতি লাভ-ক্ষতিতে নিতে হবে। অনেক ব্যাংকের সঞ্চিতি ঘাটতি এত বেশি যে সেটি পুরো মূলধন ক্ষয় করে দিতে পারে। কোনো কোনো ব্যাংকের মূলধন নেতিবাচকও হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্ভবত এ পরিস্থিতি এড়াতে ব্যাংকগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর সময় দিতে চাইছে। তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ব্যাংকগুলো যদি ধীরে ধীরে সঞ্চিতি ঘাটতি পূরণ করতে পারে, তাহলে ভালো। তা না হলে আরো শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও আইপিওতে আসা কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। এক্ষেত্রে নিরীক্ষকদের দায় কতটা?

এখানে নিরীক্ষকদের কিছু দায়বদ্ধতা ও দুর্বলতা ছিল, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আইসিএবি থেকেও সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কারো কারো সার্টিফিকেট অব প্র্যাকটিস তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে এবং জরিমানাও করা হয়েছে।

আইপিওর ক্ষেত্রে যে মাত্রার ডিউ ডিলিজেন্স প্রয়োজন ছিল, অতীতে কিছু ক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে করা হয়নি। এখন এ বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তন করা হচ্ছে। বিএসইসির নতুন কমিশনের সঙ্গে আইসিএবির আলোচনা হয়েছে। নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইপিও অনুমোদন দ্রুত করতে চাইলে নিরীক্ষার মান নিশ্চিত করার দায়িত্বও আমাদের ওপর বেশি। তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও আইপিও-সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষায় আন্তর্জাতিক হিসাব মান কঠোরভাবে অনুসরণের ওপর আমরা জোর দিচ্ছি। কোনো ব্যত্যয় পাওয়া গেলে আইসিএবি কঠোর ব্যবস্থা নেবে।

তবে পুঁজিবাজারের আরেকটি সমস্যা হলো এটি এখনো অনেকটাই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীনির্ভর। পরিণত বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বড় ভূমিকা থাকে। আমাদের দেশে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের একটি অংশের আর্থিক জ্ঞানও পর্যাপ্ত নয়। ফলে তারা অনেক সময় অন্যের কথা শুনে বিনিয়োগ করেন।

আর্থিক প্রতিবেদনের জটিল বিষয়গুলো সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বোঝানোর জন্য সহজ ভাষায় আলাদা ব্যাখ্যা থাকা উচিত কিনা?

নিরীক্ষকের পক্ষে তা করা উচিত নয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে নিরীক্ষকের দায়িত্বের মধ্যেও এটি পড়ে না। কাজটি বাজার মধ্যস্থতাকারীদের—যেমন ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকার—করার কথা। তারা নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগকারীদের জানাতে পারে, কোনো কোম্পানিতে বিনিয়োগের ঝুঁকি কোথায়। দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে অনেক বাজার মধ্যস্থতাকারী মূলত শেয়ার কেনাবেচা কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ তাদের অ্যাডভাইজরি ভূমিকাও পালন করা উচিত।

নিরীক্ষা পেশার মান ও নিরীক্ষকদের স্বাধীনতা বাড়াতে আইসিএবির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

আমরা ২০২৫-৩০ সাল পর্যন্ত একটি কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়েছি। এর অন্যতম লক্ষ্য সদস্যদের সক্ষমতা বৃদ্ধি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও তথ্যপ্রযুক্তি এখন আমাদের পেশার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিরীক্ষকেরা কীভাবে অটোমেশন ও এআইকে তাদের কাজে যুক্ত করতে পারেন, সে বিষয়ে আমরা কাজ করছি। আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্যও নতুন সিলেবাস গ্রহণ করা হচ্ছে, যাতে তারা বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ইন ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলসের সঙ্গে আমাদের প্রশিক্ষণসংক্রান্ত ব্যবস্থা রয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিল্প খাত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও পেশাজীবীদের মধ্যে দূরত্ব কমানো। আমরা নিয়মিত শিল্প খাত ও নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি সেতুবন্ধ তৈরির চেষ্টা করছি।

আইসিএবির কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স কার্যক্রমের মাধ্যমে অডিট ফার্মগুলোর মান কীভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে?

আমরা ঝুঁকিভিত্তিক পদ্ধতিতে অডিট ফার্মগুলোকে কয়েকটি স্তরে মূল্যায়ন করছি। প্রথম অগ্রাধিকার হচ্ছে যেসব ফার্ম তালিকাভুক্ত কোম্পানি, ব্যাংক, এনবিএফআই ও বীমা কোম্পানির অডিট করছে। বড় জনস্বার্থ সংস্থার অডিট করা ফার্মও এ স্তরের আওতায় থাকবে। এসব ফার্মের অডিট ফাইল বাধ্যতামূলকভাবে পর্যালোচনা করা হবে। কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স টিমের পর্যালোচনায় বড় ধরনের সমস্যা পাওয়া গেলে তা ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড ডিসিপ্লিনারি কমিটিতে যাবে এবং প্রয়োজন হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। দ্বিতীয় স্তরে থাকবে মাঝারি আকারের কোম্পানির অডিট করা ফার্ম এবং তৃতীয় স্তরে থাকবে স্মল ও মিডিয়াম প্র্যাকটিস। ঝুঁকির মাত্রার ভিত্তিতেই ফার্ম নির্বাচন করে কোয়ালিটি রিভিউ করা হবে।

স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে ব্যাংক খাত, আর্থিক খাত, পুঁজিবাজার ও রাজস্ব ব্যবস্থায় কোন সংস্কারগুলোকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া উচিত?

এভাবে একটি বা দুটি বিষয়কে আলাদা করে চিহ্নিত করা কঠিন। আমাদের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা অনেকটা হাই-ডিপেনডেন্সি ইউনিটে থাকা রোগীর মতো। একজন ডাক্তার দিয়ে এর চিকিৎসা সম্ভব নয়; একাধিক বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে মেডিকেল টিম প্রয়োজন।

অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। সরকার, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, আমলা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে নিয়ে মাল্টি-স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন প্রয়োজন। কারণ ব্যাংক খাত, শিল্প, ইউটিলিটি, রফতানি ও রেমিট্যান্স—সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া বর্তমান সংকট থেকে টেকসইভাবে বের হয়ে আসা কঠিন। আমাদের বড় সমস্যা হলো সবাই বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত নাটকীয়ভাবে বাড়বে—এমন সম্ভাবনা আমি দেখি না। তাই সরকারকে কৃচ্ছ্রসাধনের দিকে যেতে হবে এবং সরকারের আকারও যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরকারকে বেসরকারি খাতের বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না। বাংলাদেশে বেসরকারি খাতই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তাকে শাস্তি দিতে হবে, কিন্তু পুরো বেসরকারি খাতকে দুর্বল করে দিলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

আরও