শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়ে তারা এখনো সমাজের মূল ধারা থেকে অনেক পিছিয়ে। চরম দারিদ্র্য, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতনতা ও জ্ঞানের অভাব, পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অবজ্ঞা, অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন, অশোভন কর্মপরিবেশ ও পরিমিত খাবারের অভাবে পুষ্টিহীনতার ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে অধিকাংশ চা বাগানের মা ও শিশুরা।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, দেশে যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, ম্যালেরিয়া ও জরায়ু ক্যান্সারের প্রবণতা চা শ্রমিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। চরম দরিদ্রতা ও অপুষ্টির কারণে এ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাড়ছে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ২০১৮ সালের এক জরিপের ফল অনুসারে, চা বাগানের ৭৪ শতাংশ পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, যা জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হারের কয়েক গুণ বেশি।
মৌলভীবাজার জেলায় প্রতি বছর যে পরিমাণ যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয় এর অন্তত ৩৬ শতাংশই চা জনগোষ্ঠীর মানুষ। মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় ২০২১-২৪ চার বছরে মোট ১৯ হাজার ৯১৪ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়। এর মধ্যে শুধু চা বাগানের বাসিন্দা ৭ হাজার ২২০ জন বা ৩৬ শতাংশের বেশি। কুষ্ঠরোগের চিত্রটা আরো ভয়াবহ। একই সময়ে মৌলভীবাজারে ৭৬১ জন কুষ্ঠ রোগী শনাক্ত হয়। এর মধ্যে ৬৩১ জনই চা বাগানের বাসিন্দা, যা মোট শনাক্তের ৮৩ ভাগ।
চা বাগানগুলোর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে প্রথমবারের মতো চালানো জরিপে বিবিএস জানায়, অপুষ্টির কারণে চা বাগানের ৪৫ শতাংশ শিশুই খর্বকায়। ২৭ শতাংশ শীর্ণকায়। স্বল্প ওজনের শিশু ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ। তাছাড়া ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে ৪৬ শতাংশ কিশোরীর এবং মা হয়ে যাচ্ছে ২২ শতাংশ। এছাড়া ন্যূনতম স্যানিটেশন সুবিধা নেই চা বাগানের ৬৭ শতাংশ পরিবারের।
এর আগে বেসরকারি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) মৌলভীবাজারের চা বাগানগুলোর নারীদের ওপর একটি গবেষণা করে জানায়, চা বাগানের প্রায় ১৫ শতাংশ নারী জরায়ু ক্যান্সারে ভুগছেন।
কথা হয় কমলগঞ্জের শমসেরনগর চা বাগানের বাসিন্দা চা শ্রমিক শিলা পাত্রের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য বলতে আমরা যা বুঝি ক্যামেলিয়া হাসপাতাল। কিছু হলে সেখানেই চিকিৎসা নিতাম, কিন্তু মাস খানেক ধরে চা বাগানের সেই হাসপাতালটিও বন্ধ। অসুখবিসুখ হলে চিকিৎসা নিমু না পেট চালামু? কার কী অসুখ হয় সেটা নিয়ে প্রথমে কেউ ভাবে না, কারণ টাকা নেই। যখন জটিল হয় তখন হাসপাতালে যায়; অধিকাংশ মানুষ মারা যায়।’
চা শ্রমিক নেতা সীতারাম বীন বলেন, এখনো ১০ হাতের ছোট্ট খুপরি ঘরে দিন কাটে চা বাগানের লাখো পরিবারের। গবাদিপশুর সঙ্গে গাদাগাদি করে বসবাস করতে হয় চা জনগোষ্ঠীর মানুষকে। মূলত পরিবেশটাই রোগাক্রান্ত। নেই নিরাপদ পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান। দুইশ বছরেও নিশ্চিত হয়নি স্থায়ী আবাসন ও ভূমির মালিকানা। শিক্ষা, ক্রীড়া, প্রযুক্তি বা বিনোদন কিছুই নাগালে নেই চা শ্রমিকদের।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী বলেন, ‘চা বাগানে পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। বছর বছর ডায়রিয়া আর পানিবাহিত রোগে অনেক মানুষ মারা যায়। বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবহৃত হয় চা বাগানে। এতে নারী-শিশুরা ভুগছে দুরারোগ্য ব্যাধিতে। চা বাগানগুলোয় ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি অনিরাপদ রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে।’
শ্রমিক নেতারা জানান, শ্রমিকদের ৯০ শতাংশের বেশি নারী হলেও চা বাগানে না আছে টয়লেট, না আছে প্রক্ষালন কক্ষ। তাছাড়া খাওয়ার পানি সরবরাহও সবসময় পর্যাপ্ত থাকে না। চা বাগানগুলোয় বাগান ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হাসপাতাল ও ডিসপেনসারি আছে। কিন্তু এসব হাসপাতালে যে চিকিৎসা পাওয়া যায়, তা নামমাত্র। ক্যান্সার, কুষ্ঠ, যক্ষ্মাসহ বড় কোনো রোগে পড়লে বাগানের হাসপাতাল ও ডিসপেনসারিতে চিকিৎসা মেলে না। শ্রম আইন ও বিধিমালায় যেসব প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা চা শ্রমিক ও তাদের পরিবারের পাওয়ার কথা, তার অনেক কিছুই তারা পান না।
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মামুনুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অপুষ্টিজনিত কারণে যখন রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায় তখনই রোগব্যাধি বাসা বাঁধে। চা জনগোষ্ঠীর মানুষ অপুষ্টিতে ভোগার কারণেই তাদের মধ্যে রোগের হার তুলনামূলক বেশি। তাছাড়া কোনো রোগ হলে তারা সহ্য করে চাপিয়ে রাখে। অসহ্য না হলে চিকিৎসকের কাছে আসে না। যার কারণে তাদের রোগ শনাক্ত হয় অনেক দেরিতে। তখন অনেক জটিল আকার ধারণ করে। আমরা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে চা বাগানে গিয়ে রোগ নির্ণয়ের কাজ করছি, যার কারণে রোগ শনাক্তের হারও বেড়েছে।’