বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস

অর্থ বিভাগের ‘অসম্মতি’ সত্ত্বেও কোম্পানি ভাতা নিচ্ছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অধীন বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসির (বিএসসিপিএলসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আসলাম হোসেন গত মাসে বেতন-ভাতা বাবদ মোট ৩ লাখ ১৮ হাজার ২৫১ টাকা উত্তোলন করেছেন।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অধীন বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসির (বিএসসিপিএলসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আসলাম হোসেন গত মাসে বেতন-ভাতা বাবদ মোট ৩ লাখ ১৮ হাজার ২৫১ টাকা উত্তোলন করেছেন। এর মধ্যে শুধু কোম্পানি ভাতা বাবদ পেয়েছেন ১ লাখ ৯২ হাজার ৫৫২ টাকা। শুধু ব্যবস্থাপনা পরিচালকই নন, প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ পর্যায়ের অধিকাংশ কর্মকর্তা এ কোম্পানি ভাতা পাচ্ছেন। যদিও সরকারের অর্থ বিভাগ থেকে বিএসসিপিএলসিসহ ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অধীন অন্য কোম্পানিগুলোয় প্রেষণে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের কোম্পানি ভাতা দেয়ার বিষয়ে অসম্মতি রয়েছে। তবে সরকারের এ ‘অসম্মতি’ সত্ত্বেও বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলসে প্রেষণে কর্মরত শীর্ষ কর্মকর্তারা নিয়মিত কোম্পানি ভাতা উত্তোলন করে আসছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থ বিভাগের সম্মতি ছাড়া কোম্পানি ভাতা নেয়া নিয়মবহির্ভূত ও ফেরতযোগ্য। এতে আর্থিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ হয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। পাশাপাশি মনিটরিংয়ে গাফিলতিও রয়েছে বলে মনে করেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসির শুধু ব্যবস্থাপনা পরিচালকই নন, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রেষণে থাকা বিভিন্ন বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা

কোম্পানি ভাতা পাচ্ছেন। বর্তমানে কোম্পানি ভাতার আওতায় থাকা শীর্ষ কর্মকর্তারা হলেন প্রতিষ্ঠানটির মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস বিভাগের মহাব্যবস্থাপক প্রভাস চন্দ্র ভট্টাচার্য্য, চালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক তারঘীবুল ইসলাম, প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. সাজ্জাদ বিন মুস্তাইনুর রহমান, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ মাসুদ রানা, সংগ্রহ ও সেবা বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ তাহেরুল ইসলাম।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত আগস্টে প্রভাস চন্দ্র ভট্টাচার্য্য ৯১ হাজার ৬৯৮ টাকা, তারঘীবুল ইসলাম ৭০ হাজার ৩২২ টাকা, মো. সাজ্জাদ বিন মুস্তাইনুর রহমান ও মোহাম্মদ মাসুদ রানা প্রত্যেকে ৬০ হাজার ৫৩০ টাকা করে এবং মোহাম্মদ তাহেরুল ইসলাম ৪৪ হাজার ৯০৪ টাকা কোম্পানি ভাতা পেয়েছেন।

বিষয়টি নিয়ে মতামত জানতে বিএসসিপিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আসলাম হোসেনের অফিশিয়াল ফোন নাম্বারে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে গতকাল সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

তবে অর্থ বিভাগের ‘অসম্মতি’ থাকা সত্ত্বেও কোম্পানি ভাতা গ্রহণের বিষয়টি স্বীকার করেন প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. সাজ্জাদ বিন মুস্তাইনুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমি ওখানে চাকরি করছি, সুতরাং নিচ্ছি।’ অর্থ বিভাগের অসম্মতির বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের হেড অফিস থেকে কথা বলবে। যারা পাবলিক রিলেশনে কাজ করেন তারা বলতে পারবেন।’

অর্থ বিভাগের অসম্মতির পরও কোম্পানি ভাতা গ্রহণকে আর্থিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ হিসেবে দেখছেন সরকারের সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘অর্থ বিভাগ কোম্পানি ভাতা প্রদানে অসম্মতি জ্ঞাপনের পর ভাতা নেয়াটা ‍অবশ্যই নিয়মবহির্ভূত এবং এ টাকা ফেরতযোগ্য। একই সঙ্গে এখানে আর্থিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিষয় রয়েছে এবং যারা সম্মতি ছাড়া টাকাটা নিচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এখানে মনিটরিংয়েরও গাফিলতি রয়েছে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন বোর্ড বিলুপ্ত হওয়ার পর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের আওতায় বিভিন্ন কোম্পানি গঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে টেলিকম ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সেখানে প্রেষণে পাঠানো হয়। এসব কোম্পানিতে সরকারি বেতন কাঠামোর বাইরে বেশি বেতন থাকলেও কোনো পেনশন সুবিধা নেই, তাই কর্মকর্তারা লিয়েনের মাধ্যমে চাকরিতে যেতে বেশি আগ্রহী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ২০১৯-২০ সালে লিয়েন বন্ধ হয়ে গেলে প্রেষণে যাওয়া কর্মকর্তাদের আর্থিক সুবিধা বজায় রাখতে কোম্পানি ভাতা চালু করা হয়। মূলত সরকারি কর্মকর্তা ও স্থায়ী কোম্পানি কর্মকর্তার বেতনের পার্থক্যকে ভিত্তি করেই এ ভাতা নির্ধারণ করা হয়। শর্ত ছিল, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি পাওয়া সাপেক্ষে এ ভাতা কার্যকর হবে। পরবর্তী সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর থেকে কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে এ ভাতা পাওয়া শুরু করেন।

তবে গত বছরের ২৮ জানুয়ারি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অধীন বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসি, টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড, টেলিফোন শিল্প সংস্থা লিমিটেড, বাংলাদেশ কেবল শিল্প লিমিটেড এবং বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের কোম্পানি ভাতা প্রদানে অসম্মতি জানিয়ে চিঠি দেয় অর্থ বিভাগ। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো হয় এ চিঠি। অর্থ বিভাগের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান-৪ শাখা থেকে জারীকৃত চিঠিতে বলা হয়, ‘ছয়টি কোম্পানিতে প্রেষণে কর্মরত শুধু নবম গ্রেড এবং তদূর্ধ্ব পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের “‍বিশেষ ভাতা” সুবিধা বিদ্যমান থাকায় কোম্পানিগুলোর আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করে প্রেষণে নিয়োজিত ১ থেকে ১৬তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য “‍কোম্পানি ভাতা” প্রদানে নির্দেশক্রমে অর্থ বিভাগের অসম্মতি জ্ঞাপন করা হলো।’ পরবর্তী সময়ে ওই বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের কোম্পানি-২ অধিশাখা থেকে জারি করা আরেক চিঠির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ছয়টি কোম্পানিকে প্রেষণে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোম্পানি ভাতা প্রদানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অসম্মতির বিষয়টি জানিয়ে দেয়া হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের সুস্পষ্ট অসম্মতি উপেক্ষা করে প্রেষণে যাওয়া কর্মকর্তাদের কোম্পানি আইনের আওতায় ভাতা প্রদানের অনুমোদন দেয়া প্রশ্নবিদ্ধ। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, বৈষম্য দূর করার জন্য কোম্পানি ভাতার বিষয়ে অর্থ বিভাগ সম্মতি দেয়নি। সেক্ষেত্রে প্রেষণে যাওয়া কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ ভাতার বিধান রাখা হয়। কিন্তু কোম্পানিগুলো যদি সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে কোম্পানি ভাতা চালু রাখে তাহলে সেটা সুস্পষ্টভাবে অর্থ বিভাগের নির্দেশনা লঙ্ঘন। অর্থ বিভাগের অনুমোদন ছাড়া কোনোভাবেই তারা এটা করতে পারে না।

টেলিকম ক্যাডার সার্ভিসের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট অসম্মতি থাকা সত্ত্বেও কোম্পানি ভাতা গ্রহণের মাধ্যমে কেউ কেউ বাড়তি আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন। আবার একই ক্যাডারের সদস্য হয়েও যারা প্রেষণে যেতে পারছেন না তারা এ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ বিশেষ সুবিধা ইস্যুতে অনেকের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। যেসব কোম্পানিতে কোম্পানি ভাতা বেশি পাওয়া যায় সেখানে যাওয়ার জন্য নিজেদের মধ্যে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতার কথাও জানিয়েছেন অনেকে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভাতা নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের যদি অসম্মতি থাকে সেটি অমান্য করা বড় অনিয়ম। তারা কোনো অবস্থাতেই এটি করতে পারেন না। সরকারের উচিত এটা অবিলম্বে বন্ধ করে দেয়া এবং তারা কেন এটা করছেন সে বিষয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।’

অর্থ বিভাগের অসম্মতি থাকার পরও কোম্পানি ভাতা গ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব আব্দুন নাসের খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা অর্থ বিভাগের নির্দেশনাটা কোম্পানিগুলোকে আবারো পাঠিয়ে দিয়েছি সেটি অনুসরণ করার জন্য। এ নির্দেশনা নিয়ে যাতে আর কোনো ধরনের ব্যত্যয় না ঘটে সেজন্য বিষয়টি আমাদের ফলোআপে রয়েছে। আশা রাখি তারা নির্দেশনাটা প্রতিপালন করবেন।’

আরও