বিস্মৃত দালালবাজার জমিদারবাড়ি

প্রায় ৪০০ বছর আগে লক্ষ্মীনারায়ণ বৈষ্ণব নামে কলকাতার জনৈক ব্যক্তি কাপড়ের ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে লক্ষ্মীপুরের দালালবাজার আসেন।

প্রায় ৪০০ বছর আগে লক্ষ্মীনারায়ণ বৈষ্ণব নামে কলকাতার জনৈক ব্যক্তি কাপড়ের ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে লক্ষ্মীপুরের দালালবাজার আসেন। তার পুত্র ব্রজবল্লভ স্বীয় দক্ষতা গুণে ব্যবসার প্রসার ঘটান। ব্রজবল্লভের পুত্র গৌর কিশোর কলকাতায় লেখাপড়ার কারণে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহচর্যে আসেন এবং জমিদারি খরিদ করেন। গৌর কিশোর ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে রাজা উপাধি লাভ করেন।

১৮৫০-এর দশকে দালালবাজারের জমিদার রাজা গৌর কিশোর ও তার উত্তরসূরি নরেন্দ্র কিশোর রায় সাত একর ৮৬ শতক সম্পত্তিতে জমিদারবাড়ির ভেতরে কারুকার্যখচিত ও মার্বেল পাথর দিয়ে বিশাল বিশাল এসব দালান নির্মাণ করেন। লক্ষ্মীনারায়ণ ও তার উত্তরসূরিরা কাপড়ের ব্যবসার উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে এলেও গৌর কিশোর কলকাতায় লেখাপড়ার কারণে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহচর্যে আসেন এবং জমিদারি খরিদ করেন। তবে কথিত রয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়ার কোম্পানির সঙ্গে তাদের ছিল এজেন্ট ব্যবসা। আর এ কারণে স্থানীয় লোকজন তাদের গোপনে দালাল বলেও ডাকত। ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার আগ পর্যন্ত জমিদারের বংশধররা পর্যায়ক্রমে এ এলাকায় তাদের জমিদারি পরিচালনা করেছিলেন।

গৌর কিশোর রায় ও রানী লক্ষ্মী প্রিয়া ছিলেন নিঃসন্তান। তারা ঢাকার বিক্রমপুর থেকে গোবিন্দ কিশোরকে পোষ্যপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। গোবিন্দ কিশোরের পুত্র নলীনি কিশোর রায় চৌধুরী তাদের জমিদারির খাজনা আদায়, তদারক ও প্রসারে দক্ষতার পরিচয় দেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় হিন্দু জমিদার পরিবারের সদস্যরা প্রায় ২০০ একর সম্পত্তি ফেলে ভারতে চলে যান। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইন কার্যকর হওয়ার পর ১৯৫৮ সালে সরকার বাহাদুর জমিদারবাড়ি কাচারি এলাকায় দালালবাজার তহশিল অফিস স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সালে সরকার অর্পিত হিসেবে ২০০ একর সম্পত্তি তালিকাভুক্ত করা হয়। দালালবাজার এন.কে. উচ্চ বিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয়, ঠাকুর মন্দির এ পরিবারেরই অবদান।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে দালালবাজারে অবস্থিত জমিদারবাড়িটি। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে বর্তমানে ভগ্নদশা বাড়িটির। আর বখাটে ও মাদকসেবীদের আনাগোনা এবং নিরাপত্তার অভাবে বিমুখ হচ্ছে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটক। তবে শিগগিরই পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও প্রাচীন নিদর্শনগুলো রক্ষাসহ পরিকল্পনা অনুযায়ী বাড়িটি সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

এরইমধ্যে জমিদার বাড়িটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। পর্যটকের সুবিধার জন্য স্থাপন করা হয়েছে রেস্ট হাউজ ও বসার ব্যবস্থা। সংস্কার করা হয়েছে রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। সংস্কারকাজের পাশাপাশি পর্যটকের নিরাপত্তা ও অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা পেতে এরই মধ্যে জমিদার বাড়িটিতে স্থাপন করা হয়েছে একটি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র। প্রাসাদটি আরো দৃষ্টিনন্দন ও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করতে নানামুখী পরিকল্পনা রয়েছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

জমিদারবাড়িতে ঢুকতে হাতের ডান পাশে রয়েছে কাচারি ঘর। বর্তমানে এখানে ভূমি অফিসের কার্যক্রম চলছে। মূল গেটটি না থাকলেও কিছু দূর এগোলে চোখে পড়বে ইট-সুরকি দিয়ে তৈরি বেশ কয়েকটি কামরা। হাতের ডানে রয়েছে পুকুর ও শাণ বাঁধানো ঘাট। ভেতরে প্রবেশ করে কিছু দূর গেলেই চোখে পড়ে জলসা ঘর। আর বাঁ পাশে রয়েছে রানীদের জন্য হল রুম। জলসাঘর লাগোয়া তিনটি বিভিন্ন আকৃতির কামরা।

জনশ্রুতি রয়েছে, এ কামরাগুলোয় বসে রাজা-রানীরা নাচ দেখতেন। আর কাজের লোকগুলো পাটাতে মসলা পিষতেন। এখান থেইে বিচারকার্য পরিচালনা করা হতো। সামনের কামরাগুলো অতিথিদের জন্য। সামান্য ভেতরে গেলে রয়েছে হাতের ডানে একটি স্বাতন্ত্র্য কামরা। তার পাশের ভবনের নিচেই রয়েছে কয়েকটি গুহামুখ। এ গুহাগুলো ব্যবহার করা হতো প্রতিপক্ষের হামলার ঘটনায় পালিয়ে যাওয়ার সুবিধার্থে। একটু ভেতরে গেলেই সামনে পড়ে রানীর বাসস্থান। দোতলা এ ভবনের নিচে রয়েছে গুপ্তকুঠুরি আর ওপরে রয়েছে বিশাল খোলা জায়গা। রানীর বাসভবনের নিচের গুপ্তকুঠুরিতে বসে গোপন সভায় মিলিত হতেন রাজা ও তার একান্ত লোকজন।

শ’খানেক হাত দূরে রয়েছে চার কামরার আরো একটি ভবন। এখানে বিভিন্ন মালপত্র রাখা হতো। ভবনগুলোর চারপাশে ছিল বিভিন্ন জাতের ফলদ গাছ। বর্তমানে যা ঝোপজঙ্গল ঘিরে রেখেছে। বর্তমানে এ ভবনটিসহ স্থানীয় দালালবাজার এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় জমিদারবাড়ির সামনেই স্থাপন করা হয়েছে পুলিশ ক্যাম্প।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুর রহমান জানান, এর আগে দালালবাজার জমিদারবাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গেজেটভুক্ত হয়েছে। তবে এটি সংস্কার ও দেখাশোনার দায়িত্ব জেলা এবং উপজেলা প্রশাসনের। জমিদারবাড়িটি আধুনিকায়নে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাছাড়া পর্যটকের নিরাপত্তায় পুলিশ ক্যাম্প রয়েছে। নিরাপত্তা জোরদার করতে পুলিশ বিভাগকে বলা হবে। তবে বাড়িটি সংরক্ষণে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া হবে।

জেলা প্রশাসক সুরাইয়া জাহান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নিঃসন্দেহে বাড়িটি জেলার ঐতিহ্য। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী জমিদারবাড়িটি আধুনিকায়নে কাজ করা হবে। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা পর্যটকের কাছে একে আরো দৃষ্টিনন্দন করা হবে।’

লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মাইন উদ্দিন পাঠান জানান, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার উপকণ্ঠ দালালবাজারে অবস্থিত জমিদারবাড়িটি মূলত মুসলিম ও ইংরেজ শিল্পের সমন্বিত একটি স্থাপত্য শিল্প। জেলা প্রশাসনের প্রচেষ্টায় ভূমিদস্যূদের কবল থেকে উদ্ধার করে প্রাচীন এ বাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেকে বাড়িটি দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকের ঢল নামে। সে সময়ই বাড়িটি সংস্কার ও আধুনিকায়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেয়া হয়। 

রামগঞ্জ উপজেলা থেকে সপরিবারে জমিদারবাড়ি দেখতে এসেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা মোহাম্মদ তারেক। জানতে চাইলে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘রাজা-রানী, রাজপ্রাসাদ ঐতিহ্যের স্থাপনা দেখা ক’জনের ভাগ্যে হয়। ঐতিহ্যের টান সবার মাঝেই থাকে। এ টান থেকেই প্রাচীন এ জমিদারবাড়িটি সপরিবারে দেখতে এসেছি। কিন্তু জমিদারবাড়িটি বড় হলেও যেমনটা আশা করে এসেছি, তেমন সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেই। বাড়িটিতে নেই সীমানাপ্রাচীর। পুরনো ইট ও মূল্যবান পাথরগুলো উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কিছু মানুষ। আগে ছবিতে জমিদারবাড়িটি যেমন দেখা গেছে, এখন সেটিও নেই। তাছাড়া পশ্চিম পাশে রানীর প্রাসাদটি এখনো বসবাসের উপযোগী, কিন্তু সেখানে মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। পুরো বাড়িটি ময়লা-আবর্জনা আর গোচারণভূমিতে পরিণত হয়ে আছে। যেখানে-সেখানে মলমূত্র ত্যাগসহ একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা করে রেখেছে।’ তবে এখনো যদি বাড়িটিকে সংস্কারের আওতায় এনে পর্যটকের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটক দেখতে আসবে বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।

আরও