বাগেরহাট সদর উপজেলার ভট্টপ্রতাপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিত্যক্ত ভবনের পাশে দীর্ঘদিন ধরে টিনশেডের কক্ষে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে। জানা গেছে, চার বছর ধরে টিনশেডটির তিনটি কক্ষে শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ৯৫ শিক্ষার্থীর পাঠদান চলে। ক্লাসে শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে বসতে হয়। সামান্য বৃষ্টি হলেই পানিতে তলিয়ে যায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের মাঠ, কখনো শ্রেণী কক্ষে ঢুকে পড়ে পানি। আবার টিনের চাল হওয়ায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটে গরমে শিক্ষার্থীদের শ্রেণীকক্ষে টেকা দায় হয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, অবকাঠামোর দশা এমন হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যেতে চায় না। এতে ওই এলাকার শিশুদের শিক্ষাগ্রহণে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অভিভাবক ও স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়ের নতুন ভবনটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক। একই সঙ্গে জীর্ণশীর্ণ অবকাঠামো সংস্কারের দাবি জানিয়েছে তারা।
জানা গেেছ, ১৯৬২ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা হয়। এরপর ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ২০২২ সালে তা পরিত্যক্ত ঘোষণা করে শিক্ষা অধিদপ্তর। দীর্ঘদিনেও বিদ্যালয়ে নতুন ভবন না হওয়ায় কমিটির উদ্যোগে টিনশেডের ঘর নির্মাণ করে পাঠদান কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়।
সরজমিনে ভট্টপ্রতাপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, মাঠে বৃষ্টির পানি ও কাদা জমে আছে। এর একপাশে জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত ভবন, অন্য পাশে টিনশেডের একটি ঘর। এতে তিনটি কক্ষে পাঠদান চলছে। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে বসতে দেখা যায়। স্কুল ঘুরে দেখার সময় কয়েকবার লোডশেডিং লক্ষ করা যায়। এ সময় শিক্ষার্থীদের অনেকে কক্ষ থেকে বের হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ বই-খাতাকে হাতপাখার মতো ব্যবহার করছিল। বিদ্যালয়ের চত্বরেও পানি জমে থাকতে দেখা যায়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানায়, বৃষ্টির পানি অনেক সময় শ্রেণী কক্ষে ঢুকে পড়ে। এতে তাদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যালয়টির তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী দিয়া। সে বলে, ‘আমাগো স্কুলে আসতি মেলা কষ্ট হয়। মাঠে পানি থাকে, ক্লাসে পানি ঢোকে। গরমও মেলা। ঝড়-বৃষ্টি হলে স্কুলে আসতে মন চায় না। টিন ভাইঙ্গে পড়ারও ভয় হয়। অন্য স্কুল কত সুন্দর; আমাগো স্কুলটা অনেক পচা। আমরা একটা ভালো স্কুল চাই।’
কথা হয় বিদ্যালয়ে অপেক্ষারত এক অভিভাবক সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘স্কুলের এমন অবস্থা যে আমার বাচ্চা স্কুলে আসতেই চায় না। অনেকটা জোর করেই নিয়ে আসতে হয়। টিনের ঘরে প্রচণ্ড গরম, তার ওপর বিদ্যুৎ থাকে না। স্কুলে প্রবেশ করাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে। আমরা চাই, দ্রুত একটি ভালো ভবন করা হোক।’
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জেসমিন নাহার বলেন, ‘অবকাঠামোগত সংকটের কারণে দিন দিন শিক্ষার্থীদের স্কুলে অনুপস্থিতি বাড়ছে। আমরা বিভিন্নভাবে অভিভাবকদের বুঝিয়ে শিক্ষার্থী ধরে রাখার চেষ্টা করছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের লাইব্রেরির অনেক মালামাল নষ্ট হচ্ছে। বাধ্য হয়ে পরিত্যক্ত ভবনের একটি কক্ষে অফিসের কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। সেখানেও অনেক মালামাল নষ্ট হচ্ছে।’
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আহাম্মদ পাইক বলেন, ‘বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী থাকলেও মানসম্মত শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে ভবন ও মাঠের কারণে আমরা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছি। এ বিষয়ে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। দ্রুত একটি ভালো ভবন ও খেলার মাঠ সংস্কারের ব্যবস্থা করার দাবি জানাচ্ছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের শিক্ষক ও অন্য কোনো সংকট নেই। সংকট শুধু ভবনের। আমরা বাধ্য হয়ে জরাজীর্ণ ভবনে কক্ষ তৈরি করেছি। সেখানে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে সবসময় থাকতে হয়। মাঝেমধ্যে ওপর থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে। এরই মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের দ্রুত একটি ভবন প্রয়োজন।’
বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি হাসিবুর রহমান বলেন, ‘আমি যখন সভাপতি ছিলাম, তখনই ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। ভবনের পলেস্তারা খসে পড়ছিল, বিমও ভেঙে পড়ার অবস্থায় ছিল। আমরা লিখিতভাবে আবেদন করার পর শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে এসে ভবনটি পরিদর্শন করে ২০২২ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। কিন্তু এরপর এখনো পর্যন্ত কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পরে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখতে আমরা কমিটির উদ্যোগে টিনশেডের তিন কক্ষের একটি ঘর তৈরি করি।’
এ বিষয়ে বাগেরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাসরিন আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেসব বিদ্যালয় জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে, সেগুলোর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।’