বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিনিয়োগে লাভ ও লোকসান ভাগাভাগির অংশীদারত্ব ১ শতাংশও নয়

নামেই শরিয়াহভিত্তিক, বাস্তবে প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের ছাপ

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিনিয়োগে আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে ইজারা ও হায়ার পারচেজ আন্ডার শিরকাতুল মিলক বা এইচপিএসএম পদ্ধতিতে। বাড়ি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য স্থায়ী সম্পদ অর্থায়নে এইচপিএসএম পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।

অংশীদারত্বভিত্তিক বিনিয়োগ বা ঋণ বিতরণ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মৌলিক দর্শন হিসেবে বিবেচিত। মুশারাকা ও মুদারাবা হিসেবে পরিচিত এ পদ্ধতিতে ব্যাংক ও উদ্যোক্তা বিনিয়োগের মুনাফা চুক্তি অনুযায়ী ভাগ করে নেয়। আর লোকসান হলে তা চুক্তির ধরন অনুযায়ী মূলধনের অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বহন করতে হয়। এ পদ্ধতিতে অর্থায়নের মাধ্যমে উদ্যোক্তা সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বতন্ত্র এ বৈশিষ্ট্যকে সামনে রেখে বিকশিত হয়েছে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের কার্যক্রম। যদিও বাংলাদেশে লাভ-লোকসানের ভাগাভাগি (প্রফিট অ্যান্ড লস শেয়ারিং-পিএলএস) নয়, বরং ক্রয়কৃত পণ্যের সঙ্গে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা যুক্ত করে চলছে শরিয়াহভিত্তিক এ ব্যাংকিংয়ের কার্যক্রম। এক্ষেত্রে লাভ-লোকসান ভাগাভাগির অংশীদারত্ব ১ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণার তথ্য বলছে, শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের জনপ্রিয়তা রয়েছে, এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে লাভ-লোকসান ভাগাভাগির অংশীদারত্ব সর্বনিম্ন। জনসংখ্যার ভিত্তিতে সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ৩৫-৪০ শতাংশ লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। আর বাহরাইনে এ হার ১৮-২২ শতাংশ। পাকিস্তানে ৮-১২ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায়ও ৬-৮ শতাংশ লাভ-লোকসান ভাগাভাগির ভিত্তিতে বিনিয়োগ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ হার এখন দশমিক ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। এর আগে ২০১৯ সালেও দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোর ১ দশমিক ৬ শতাংশ বিনিয়োগ লাভ-লোকসানের ভিত্তিতে পরিচালিত হতো। অর্থাৎ গত ২০১৯ সাল-পরবর্তী ছয় বছরে দেশে অংশীদারত্বভিত্তিক বিনিয়োগ বা ঋণ বিতরণ না বেড়ে উল্টো কমেছে।

এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ—নামে শরিয়াহভিত্তিক হলেও বাস্তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকগুলো প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোকেই অনুসরণ করছে। ‘অ্যান অ্যানালাইসিস অব মোড-ওয়াইজ ইনভেস্টমেন্ট অব ইসলামিক ব্যাংকস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ চিত্র তুলে ধরা হয়। ২০১৯ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের ধরন বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের ইসলামিক ইকোনমিক উইংয়ের চার কর্মকর্তা এ গবেষণা করেন। দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট বিনিয়োগের ৭০ শতাংশের বেশি এখন বিক্রয়ভিত্তিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে বলেও এতে তুলে ধরা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই আমাদের কাছে অভিযোগ ছিল, ইসলামী ব্যাংকগুলো শরিয়াহর রীতিনীতি মেনে ব্যাংকিং করছে না। এখন গবেষণার মাধ্যমে সেটির সত্যতা উঠে এল। আগে ব্যাংকগুলোর শরিয়াহ বোর্ডসহ এ-সংক্রান্ত বিধিবিধান পরিপালনের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হতো না। এখন আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেই শরিয়াহ বোর্ড গঠন করে দেয়ার দিকনির্দেশনা দিচ্ছি। আর কেন্দ্রীয়ভাবেও বিষয়টি মনিটর করার জন্য একটি শরিয়াহ বোর্ড গঠন করা হয়েছে।’

বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের সূচনা হয়েছিল ১৯৮৩ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির হাত ধরে। ব্যাংকটির সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তী সময়ে দেশে আরো নয়টি পূর্ণাঙ্গ ধারার ইসলামী ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করে। এছাড়া ৩১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিং শাখা বা উইন্ডোর মাধ্যমে এ ধারার ব্যাংকিংয়ে যুক্ত হয়। তবে শরিয়াহভিত্তিক এ ব্যাংকগুলোর বড় অংশই অনিয়ম-দুর্নীতির ভারে এখন বিপর্যস্ত। এর মধ্যে লুণ্ঠনের শিকার শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলমান।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবেষণায় বলা হয়, ২০১৯ সাল-পরবর্তী ছয় বছরে দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মোট বিনিয়োগ ২ লাখ ১৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩৯ দশমিক ২ শতাংশ। তবে এ প্রবৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে নির্দিষ্ট মুনাফাভিত্তিক বিক্রয় ও সম্পদনির্ভর অর্থায়ন থেকে। অন্যদিকে ব্যাংক ও উদ্যোক্তার মধ্যে প্রকৃত মুনাফা-লোকসান ভাগাভাগির ভিত্তিতে পরিচালিত বিনিয়োগের অংশ ধারাবাহিকভাবে কমেছে।

২০২৫ সালের জুন শেষে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মোট বিনিয়োগের ৫০ দশমিক ৩ শতাংশ ছিল বাই-মুরাবাহা পদ্ধতিতে। ২০১৯ সালের জুনে এ হার ছিল ৪৫ দশমিক ৪ শতাংশ। বাই-মুয়াজ্জাল পদ্ধতিতে বিনিয়োগের অংশ ছিল ২০ দশমিক ১ শতাংশ। এ দুই পদ্ধতি মিলিয়ে মোট বিনিয়োগের ৭০ দশমিক ৪ শতাংশই বিক্রয়ভিত্তিক অর্থায়নে কেন্দ্রীভূত।

বাই-মুরাবাহা পদ্ধতিতে ব্যাংক গ্রাহকের প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে নির্ধারিত মুনাফা যুক্ত করে তার কাছে বিক্রি করে। অন্যদিকে বাই-মুয়াজ্জালে বাকিতে বিক্রয়ের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়। এ দুই পদ্ধতিতে ব্যাংকের মুনাফা তুলনামূলক পূর্বনির্ধারিত ও অনুমানযোগ্য হওয়ায় পরিচালন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সহজ হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায়ও ব্যাংকগুলোর এ ধরনের বিনিয়োগে আগ্রহের পেছনে কম পর্যবেক্ষণ ব্যয়, সহজ পরিচালন পদ্ধতি ও মুনাফার নিশ্চয়তাকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিপরীতে মুশারাকা ও মুদারাবা পদ্ধতি তথা অংশীদারত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত বিনিয়োগের হার ক্রমাগত কমেছে। ২০২৫ সালের জুনে মুশারাকা পদ্ধতির অংশ নেমে এসেছে মাত্র দশমিক ৩ শতাংশে। মুদারাবার অংশও দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১৯ সালের জুনে মুশারাকার অংশ ছিল ১ দশমিক ৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায় বলা হয়েছে, পিএলএস পদ্ধতিতে অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রকল্পের প্রকৃত আয়-ব্যয় পর্যবেক্ষণ, উদ্যোক্তার আর্থিক তথ্য যাচাই এবং মুনাফা হিসাবের জটিলতা ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়ায়। একই সঙ্গে উদ্যোক্তার নৈতিক ঝুঁকি, আর্থিক তথ্যের অসমতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির অনিশ্চয়তাও এ ধরনের বিনিয়োগ সম্প্রসারণে বাধা তৈরি করছে। বিপরীতে নির্দিষ্ট মুনাফাভিত্তিক অর্থায়নে ব্যাংকগুলো তুলনামূলক সহজে ঝুঁকি নিরূপণ ও আয় ব্যবস্থাপনা করতে পারে।

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিনিয়োগে আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে ইজারা ও হায়ার পারচেজ আন্ডার শিরকাতুল মিলক বা এইচপিএসএম পদ্ধতিতে। বাড়ি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য স্থায়ী সম্পদ অর্থায়নে এইচপিএসএম পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। ২০১৯ সালের জুনে এ দুই পদ্ধতির সম্মিলিত অংশ ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৫ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ শতাংশে। রিয়েল এস্টেট, অবকাঠামো ও মূলধনি যন্ত্রপাতি অর্থায়নের চাহিদা এ প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালক বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদভিত্তিক বিনিয়োগের বিপরীতে স্বল্পমেয়াদি আমানতনির্ভর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যাংকগুলোর জন্য তারল্য ও মেয়াদগত অসামঞ্জস্যের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও গবেষণাপত্রে সতর্ক করা হয়।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নতুন বিনিয়োগের একটি অংশ মুশারাকা ও মুদারাবা পদ্ধতিতে দেয়ার জন্য সময়সীমাবদ্ধ লক্ষ্য নির্ধারণ, পিএলএস অর্থায়নে কারিগরি সহায়তা, সুকুক বাজার সম্প্রসারণ এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো সংস্কারের সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা দল। একই সঙ্গে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে অংশীদারত্বভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

গবেষণাপত্রে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সম্প্রসারণের সঙ্গে এর মৌলিক নীতির সামঞ্জস্য নিশ্চিত করাই এখন বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ। বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়লেও ঝুঁকি ভাগাভাগি, উদ্যোক্তা অর্থায়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর ভূমিকা কতটা বাড়ছে, তা এ খাতের ভবিষ্যৎ বিকাশের প্রকৃত গতিপথ নির্ধারণ করবে।

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিনিয়োগের ধরন নিয়ে আলোচনার আগে এ ধরনের ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা দরকার বলে মনে করেন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবদুল মান্নান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ যে উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এ ধারার অন্য অনেক ব্যাংক একই লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কেউ কেউ কেবল বাড়তি লাভের উদ্দেশ্যে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ে এসেছে। এক্ষেত্রে অনেকের অসৎ উদ্দেশ্যও ছিল। শরিয়াহভিত্তিক অনেক ব্যাংকের বর্তমান দুর্গতি দেখলে সেটি স্পষ্ট।’

আবদুল মান্নান বলেন, ‘শরিয়াহর রীতিনীতি মেনে চলতে হলে আগে ব্যাংকের এমডিকে ঠিক হতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের পর্ষদ, শরিয়াহ বোর্ড থেকে শুরু করে শাখা ব্যবস্থাপক পর্যন্ত সব স্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে শরিয়াহ অনুসরণের তাড়না ও এ-সংক্রান্ত জ্ঞান থাকতে হবে। সেটি না হলে পরিপূর্ণ ইসলামী ব্যাংকিং হবে না। আর কেবল অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বিনিয়োগ হলে সেটি ইসলামী ব্যাংকিং হবে, বিষয়টি তাও নয়।’

আরও