বৈরী আবহাওয়ায় আম নিয়ে শঙ্কায় চাষীরা

দেশে আমের প্রধান উৎপাদন অঞ্চল রাজশাহীতে চলতি মৌসুমে শুরুটা ছিল আশাব্যঞ্জক। বাগানজুড়ে মুকুলের প্রাচুর্য দেখে বাম্পার ফলনের প্রত্যাশা করেছিলেন চাষী ও ব্যবসায়ীরা।

রাজশাহী কৃষি দপ্তরের তথ্যমতে, রাজশাহী অঞ্চলের আম বাগানে মুকুল ধরেছিল ৯০ শতাংশ। কিন্তু মৌসুম গড়াতেই সেই আশায় ধাক্কা লেগেছে। খরা, পোকার আক্রমণ এবং সাম্প্রতিক ঝড়-বৃষ্টি ও শিলাসহ বৃষ্টিতে গাছ থেকে ঝরে পড়ছে গুঁটি আম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুপার এল নিনোর প্রভাবে বৈরী আবহাওয়ার পূর্বাভাস, যা পরিস্থিতিকে আরো অনিশ্চিত করে তুলেছে। ফলে সম্ভাব্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে, আর লোকসানের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন রাজশাহীর আমচাষীরা।

মাঠ পর্যায়ের আমচাষীরা বলছেন, প্রথমে গাছে মুকুল ভরপুর থাকলেও শুষ্ক আবহাওয়া ও পানির অভাবে গাছের অধিকাংশ মুকুল ঝরে পড়েছে। গত মাস দেড়েক ডিজেল সংকটের কারণে সেচের মাধ্যমে আমগাছে প্রয়োজনীয় সেচ ও জীবাণুনাশক স্প্রে না দেয়ায় গুঁটি আমও ঝরেছে। এছাড়া সম্প্রতি আকস্মিক ঝড়-বৃষ্টিতে ব্যাপক পরিমাণ গুঁটি আম ঝরে পড়ছে। এদিকে আবহাওয়া অফিস ও কৃষি দপ্তরের কর্মকর্তারা চাষীদের জানিয়েছেন, এবার সুপার এল নিনোর প্রভাবে কালবৈশাখী, অতিরিক্ত বৃষ্টি, শিলাসহ বৃষ্টি ও বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে আম নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন চাষীরা।

রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়া পর্যবেক্ষক মো. রহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে জানান, গত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তেমন বৃষ্টিপাত হয়নি। ফলে ওই সময়ের জলীয় বাষ্প বায়ুমণ্ডলে জমে রয়েছে। এখন ঝড়-বৃষ্টির মৌসুম শুরু হওয়ায় এবং সুপার এল নিনোর প্রভাবে বৃষ্টি ও ঝড়ের প্রবণতা বাড়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আগে থেকে জমে থাকা জলীয় বাষ্প শিলাবৃষ্টিতে রূপ নিতে পারে, যা ফসলের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। সুপার এল নিনোর কারণে মৌসুমের শুরুতে কালবৈশাখীর তীব্রতা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে, যা সাধারণত মৌসুমের প্রথম দিকে বেশি দেখা যায় এবং জুন থেকে আগস্টে গিয়ে কমে। সব মিলিয়ে এ বছর অতিবর্ষণ ও কালবৈশাখীর ঝুঁকি থাকায় আম-লিচুসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

চাষীরা জানান, প্রকৃতির প্রতিকূলতায় অনেক বাগানে আশানুরূপ ফলন আসেনি। তবে এখনো গাছে যে পরিমাণ আম রয়েছে, তা যদি টিকে যায় এবং ভরা মৌসুমে ভালো দামে বিক্রি করা যায়, তাহলে কিছুটা হলেও ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব।

রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজশাহী অঞ্চলে ৯২ হাজার ৫৫২ হেক্টর জমিতে আম হয়েছে। এ মৌসুমে মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৮ টন। এর মধ্যে রাজশাহীতে ১৯ হাজার ৬১ হেক্টর জমিতে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৯১, নওগাঁয় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টরে ৪ লাখ ২১ হাজার ৬১২, নাটোরে ৫ হাজার ৬৯৩ হেক্টরে ৭২ হাজার ৮৫৩ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে ২০২৪-২৫ মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে রাজশাহী অঞ্চলের চার জেলায় মোট ১২ লাখ ৩ হাজার টন আম উৎপাদন হয়েছিল। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১১ লাখ ৯৮ হাজার টন নির্ধারণ করা হলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষি দপ্তরের উদ্যান চাষসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) পাপিয়া রহমান মৌরী বণিক বার্তাকে বলেন, রাজশাহী জেলায় এবারে মুকুল হয়েছিল ৯১ শতাংশ, যা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু প্রথম দিকে ঘন কুয়াশা, পোকার আক্রমণ ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে কিছু মুকুল ঝরেছে। পরবর্তী সময়ে গাছ থেকে কিছুসংখ্যক গুঁটি আমও ঝরেছে, এগুলো স্বাভাবিক। পরে যা টেকার তা-ই টিকবে।

তিনি আরো বলেন, ‘এ পর্যন্ত রাজশাহীর প্রায় ৫০ জন আমচাষীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, আমের গুঁটি আসার আগে সেচ, পোকা দমনে বালাইনাশকের ব্যবহার ও সময়মতো গাছের পরিচর্যার কারণে তাদের বাগানে আমের ক্ষতি হয়নি। তবে কৃষকদের শঙ্কা একটাই, আবহাওয়ার বিপর্যয় ঘটলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। প্রকৃতির ওপর তো কারো নিয়ন্ত্রণ নেই। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে এখনো বাগানে যে পরিমাণ আম আছে তা আমাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য যথেষ্ট। আবহাওয়ার বিপর্যয় ঘটলে লক্ষ্যমাত্রাও কমবে এবং কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’

খরার কারণে গাছে আম টিকিয়ে রাখা যায়নি জানিয়ে রাজশাহীর পবা উপজেলার চাষী আব্দুর রহিম বলেন, ‘কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেব, বুঝতে পারছি না।’

বাগমারা উপজেলার আমচাষী মতিউর রহমান বলেন, ‘শুরুতে বাম্পার ফলনের আশা থাকলেও এখন গাছে অর্ধেকেরও কম আম রয়েছে। প্রতিদিনই আম ঝরে পড়ছে। সার, কীটনাশক, সেচ সবকিছুর খরচ বেড়েছে, কিন্তু ফলন কমে গেছে। এতে আমরা দিশেহারা।

গোদাগাড়ী উপজেলার চাষী আজমত আলী বলেন, ‘আম বাঁচাতে সব ধরনের চেষ্টা করেছি। কিন্তু পানি সংকটের কারণে অনেক গাছে ঠিকমতো ফল ধরেনি। এখন যদি বাজারে ভালো দাম না পাই, তাহলে ঋণ শোধ করাই কঠিন হয়ে যাবে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। সেখানে অনেক বাগানে আমের উপস্থিতি বেশি থাকলেও বাজারদর নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েই গেছে।

নওগাঁর আমচাষী হাফিজুর রহমান বলেন, মৌসুমের শুরুতে যে পরিমাণ মুকুল এসেছিল, তাতে ভালো ফলনের আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই হিসাব মিলছে না। বাজারে সঠিক তদারকি না থাকলে কৃষক থেকে শুরু করে বাগান মালিক সবাই বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন। নওগাঁর আরেক আম ব্যবসায়ী ফরিদুল ইসলাম বলেন, প্রতি মণ আম যদি ২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়, তাহলে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যাবে। কিন্তু অনেক সময় হাটে নিয়ে গিয়ে ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না। এতে হতাশ হয়ে কেউ কেউ বাগান কেটে ফেলছেন।

জানতে চাইলে রাজশাহী কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. সানোয়ার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা রাজশাহী জেলার চারঘাট ও বাঘা উপজেলায় মোট ২৫টি আমের “‍মার্কেট অ্যাক্টরস বিজনেস স্কুল” গঠন করেছি। এ কমিটি রাজশাহী অঞ্চলসহ সারা দেশে আমের বিপণন ব্যবস্থা জোরদারকরণ, আমের ভ্যালু চেইন উন্নয়ন ও কৃষক পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে ভূমিকা রাখবে। সম্প্রতি কৃষি বিপণন অধিদপ্তর থেকে “‍ধলতা” বা “‍শুকনা” দেয়ার অজুহাতে কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত পণ্য নেয়ার প্রথা বন্ধ করতে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে ব্যবসায়ীরা প্রতি মণে (৪০ কেজি) দুই থেকে আট কেজি পর্যন্ত বাড়তি পণ্য নিতে কৃষকদের বাধ্য করতেন। এ অনিয়ম ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেশের সব জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।’

আমের বাজার অস্থিতিশীল করার জন্য মধ্যস্বত্বভোগী বা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকারের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও জেলা-উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় বাজার মনিটরিং কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও জানান বিপণন কর্মকর্তা সানোয়ার হোসেন।

আরও