ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে দেশজুড়ে নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে টেলিযোগাযোগ সংযোগ সম্প্রসারণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আগামী পাঁচ বছরে ডিজিটাল খাতে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে রোববার (২৬ তারিখ) অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ টেককানেক্ট ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উদ্যোগে হুয়াওয়ের অংশীদারিত্বে আয়োজিত এ সম্মেলনে ডিজিটাল অবকাঠামো, সংযোগ, এআই এবং প্রযুক্তির অর্থনৈতিক ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেন নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তি খাতের প্রতিনিধিরা।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ফাস্ট রূপকল্পের আওতায় সমৃদ্ধ, বিনিয়োগনির্ভর ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে কাজ করছে সরকার। এ জন্য নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি এবং বাংলাদেশকে তথ্যপ্রযুক্তি ও এআইয়ের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, তরুণদের ক্ষমতায়ন ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সহজ হবে।
তিনি আরো বলেন, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত ব্রডব্যান্ড এবং টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু সংযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্পের উৎপাদনশীলতা, সরবরাহ ব্যবস্থা, গ্রাহকসেবা ও সরকারি সেবার মান বাড়াতে কাজে লাগাতে হবে।
অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব ড. মুহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ডিজিটাল সক্ষমতায় বাংলাদেশ বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে প্রায় ১০ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগ এবং মানুষের অর্থপূর্ণ ডিজিটাল ব্যবহারের মধ্যে ব্যবধান কমানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, শুধু নেটওয়ার্কের সংকেত থাকলেই হবে না; নাগরিকদের জন্য সাশ্রয়ী ডিভাইস ও ব্যবহারযোগ্য ডেটা প্যাকেজ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় ভাষায় ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দেয়াও জরুরি। একজন শিক্ষার্থী অনলাইনে পাঠ সম্পন্ন করতে পারছেন কিনা, একজন রোগী ডিজিটাল মাধ্যমে চিকিৎসকের রেফারেল পাচ্ছেন কিনা কিংবা একজন গ্রামীণ উদ্যোক্তা সহজে পণ্য কেনাবেচা করতে পারছেন কিনা—এসবের মধ্য দিয়েই ডিজিটাল সংযোগের কার্যকারিতা যাচাই করা সম্ভব।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব মামুনুর রশীদ ভূঞা বলেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে সরকার পাঁচটি কৌশলগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে। এগুলো হলো শক্তিশালী আইনি ও নীতিগত কাঠামো, নির্ভরযোগ্য সংযোগব্যবস্থা, ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো, এআই ও সাইবার নিরাপত্তা এবং দেশীয় উৎপাদন।
তিনি জানান, সরকার প্রান্তিক মানুষের কাছে ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দিতে সাশ্রয়ী স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকার ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে বলে জানান তিনি।
আইসিটি সচিব বলেন, বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ ও দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে হুয়াওয়ের দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট জেসন উ বলেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর উন্নয়ন ও প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণে সরকার এবং শিল্প খাতের অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হুয়াওয়ে। সংযোগব্যবস্থা, ক্লাউড ও এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন সেবা উদ্ভাবনে সহযোগিতা করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
সম্মেলনে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ও সংযোগ, শিক্ষায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং এআইয়ের বৈশ্বিক প্রবণতা ও বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে পৃথক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ফাইভজি, ফিক্সড ওয়্যারলেস অ্যাকসেস এবং এন্টারপ্রাইজ কানেক্টিভিটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন সংশ্লিষ্টরা। তৈরি পোশাক, বস্ত্র, কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে এসব প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও মতামত তুলে ধরা হয়।
এছাড়া ক্লাউড কম্পিউটিং, অটোমেশন ও এআইভিত্তিক নিরাপত্তাব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং সরকারি সেবার মান উন্নয়নের বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসে। বক্তারা বলেন, এআইয়ের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য সংযোগ, প্রয়োজনীয় তথ্যের প্রস্তুতি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সহায়ক নীতিমালা প্রয়োজন।