সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা

বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে বাড়লেও সরকারি হিসাবে কমছে

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ২০২৩ সাল থেকে দৈনিক ও মাসিক ভিত্তিতে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের তথ্য প্রকাশ করে আসছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ২০২৩ সাল থেকে দৈনিক ও মাসিক ভিত্তিতে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের তথ্য প্রকাশ করে আসছে। দেশের সড়ক পরিবহন খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির হিসাবে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২ হাজার ৩৭৭ জন, যা আগের বছরের (২০২৪) একই সময়ের তুলনায় ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ কম। বিআরটিএর হিসাবে ২০২৪ সালের প্রথম পাঁচ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিল ২ হাজার ৫৬৬ জন।

বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনও মাসভিত্তিক দুর্ঘটনায় হতাহতের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। সংস্থাটির হিসাব বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২ হাজার ৩৭৮ জন। আরেক বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২ হাজার ৪৮৬ জন। ফেব্রুয়ারির তথ্য সংস্থাটির কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দুটোই বেড়েছে।

বেসরকারি সংস্থাগুলো দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও নিজস্ব বিভিন্ন সূত্র থেকে। অন্যদিকে বিভাগীয় অফিসগুলোর মাধ্যমে দুর্ঘটনা ও হতাহতের তথ্য সংগ্রহ করে বিআরটিএ। মূলত বাংলাদেশ পুলিশের কাছে রেকর্ডকৃত তথ্যই বিআরটিএ গ্রহণ করে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।

বিআরটিএর হিসাবে চলতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা কমলেও সংস্থাটির এ পরিসংখ্যান যথাযথ নয় বলে দাবি করেছেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর সড়ক দুর্ঘটনা ও নিহত দুটোই বেশি হচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ তথ্য বিআরটিএর পরিসংখ্যানে উঠে আসছে না।

দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহে বিআরটিএর কর্মকর্তাদের আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ওনাদের (বিআরটিএর কর্মকর্তা) একটা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে হবে। তারা এ কাজটি করছেন দায়সারাভাবে। বিআরটিএর কাছ থেকে দুর্ঘটনার সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে কাজটি আর করতে হতো না বলে মনে করেন তিনি।

সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলোর তুলনায় বিআরটিএর সামর্থ্য অনেক বেশি বলে মন্তব্য করেছেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিআরটিএর সারা দেশে জনবল আছে। পর্যাপ্ত বাজেটও তাদের জন্য বরাদ্দ থাকে। বিপরীতে আমরা ঢাকায় বসে অনেকটা কেন্দ্রীয়ভাবে কাজ করি। এমন অবস্থায় আমাদের চেয়ে বিআরটিএর রিপোর্ট অনেক বেশি সমৃদ্ধ হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি উল্টো চিত্র। সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধসহ সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ক্ষেত্রে সরকার আমাদের চেয়ে বিআরটিএর তথ্যকেই প্রাধান্য দেয়। আমরা মনে করি, বিআরটিএর উচিত সড়ক দুর্ঘটনার আরো বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করা।’

বিআরটিএর হিসাবে, ২০২২ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিল ৪ হাজার ৬৩৬ জন। ২০২৩ সালে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ২৪-এ। আর গত বছর দেশে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ৫ হাজার ৩৮০ জন। বিআরটিএর পরিসংখ্যানে টানা তিন বছর সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়লেও চলতি বছর এখন পর্যন্ত এ হার কম।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিএর একজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে সারা দেশে পুলিশি তৎপরতা সংকুচিত হয়েছিল। তখন থেকেই দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে এমনটা দেখা যাচ্ছে। সংস্থাটি যেহেতু পুলিশে রেকর্ডকৃত তথ্য গ্রহণ করে তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রভাব সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানেও পড়ছে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।

২০২৩ সালে মূলত বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যকে চ্যালেঞ্জ করতে গিয়ে বিআরটিএ দুর্ঘটনায় হতাহতের তথ্য প্রকাশ শুরু করে। বর্তমানে দৈনিক ও মাসিক ভিত্তিতে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে নিয়মিত এ তথ্য প্রকাশ হচ্ছে।

যদিও সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ বিআরটিএর কাজ নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. সামছুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার সঠিক পরিসংখ্যান জানা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্বজুড়ে সাধারণত এ পরিসংখ্যান সংগ্রহের কাজটি করে পুলিশ। বাংলাদেশেও কাজটি পুলিশের মাধ্যমে করা হয়। তবে পুলিশ অনেক দুর্ঘটনার তথ্য “‍‌আন্ডার রিপোর্ট” করে। যমুনা সেতু এলাকার সড়কের ওপর একটি কাজ করতে গিয়ে আমি নিজেই বিষয়টির প্রমাণ পেয়েছি। পুলিশের আন্ডার রিপোর্টের কারণে দুর্ঘটনা, হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আমরা জানতে পারি না। পুলিশ ঠিকমতো কাজ করছে না দেখে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান সংগ্রহ করে। তারা সংবাদমাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ করে, যা শতভাগ বিজ্ঞানসম্মত নয়। এর মানে হলো দেশে কত সড়ক দুর্ঘটনা হচ্ছে, কী পরিমাণ মানুষ তাতে হতাহত হচ্ছে, তার প্রকৃত পরিসংখ্যান আমাদের হাতে আসছে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘লাইসেন্স, ফিটনেস প্রদানসহ বিআরটিএর যেসব নিয়মিত কাজ রয়েছে, সেগুলোই তো সংস্থাটি ঠিকমতো করতে পারে না। এর ওপর সংস্থাটিকে দুর্ঘটনায় হতাহতের পরিসংখ্যান সংগ্রহের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এ সরকারের (অন্তর্বর্তী) উচিত বিআরটিএর ওপর থেকে এ দায়িত্ব সরিয়ে পুলিশের মাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রকৃত তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া।

বিআরটিএর মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের প্রকৃত তথ্য উঠে আসছে না—বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের এমন অভিযোগ সম্পর্কে মন্তব্য জানতে সংস্থাটির চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

আরও