কুকুর, শিয়াল, বিড়াল, বাদুড়, বেজি, বানর ইত্যাদি প্রাণী জলাতঙ্ক সৃষ্টিকারী ভাইরাসে আক্রান্ত হলে এবং আক্রান্ত প্রাণীটি সুস্থ মানুষ বা গবাদিপশুকে কামড়ালে মানুষ কিংবা গবাদিপশুও এ রোগে আক্রান্ত হয়। দেশে ৯৫ শতাংশ জলাতঙ্ক রোগ হয় কুকুরের কামড়ে। চাঁদপুর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের তথ্য বলছে, প্রতিদিন গড়ে ৩০-৪০ জন রোগী হাসপাতালে আসেন জলাতঙ্কের প্রতিষেধক নিতে। তবে হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিষেধক এবং সিরিঞ্জ সংকট রয়েছে। এ কারণে আক্রান্তদের ভ্যাকসিন দিতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
আক্রান্তরা বলছেন, হাসপাতালে জলাতঙ্কের প্রতিষেধক না থাকায় বাধ্য হয়েই ফার্মেসি থেকে টিকা ও সিরিঞ্জ কিনতে হচ্ছে। হাসপাতালের জলাতঙ্ক প্রতিষেধক নেয়ার কক্ষের সামনেই কুকুর ও বিড়ালের উপদ্রব দেখা যায়।
সরজমিন দেখা গেছে, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ১১৫ নম্বর কক্ষটি জলাতঙ্ক প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হয়। ভ্যাকসিন নিতে আসা রোগীদের ভিড় রয়েছে সেখানে। প্রতিদিন ৩০-৪০ জন রোগী আসছেন ভ্যাকসিন নিতে। কক্ষটির সামনে কুকুর, বিড়ালসহ অন্যান্য প্রাণীর কামড়ে আক্রান্ত রোগীরা ভ্যাকসিন নেয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। অথচ কক্ষের সামনেই কুকুরের অবস্থান ও বিচরণ দেখা গেছে। অপেক্ষারত অনেকে বাইরে থেকে ভ্যাকসিন ও সিরিঞ্জ সংগ্রহ করে নার্সদের মাধ্যমে শরীরে টিকা নিচ্ছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বিগত দুই মাস ধরে এ হাসপাতালে জলাতঙ্ক টিকা ও সিরিঞ্জ পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও বলা হয়েছে সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্তদের হাসপাতাল, সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিআইপিআইডি হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বিনামূল্যে প্রতিষেধক দেয়া হবে। অথচ হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করেও মিলছে না প্রতিষেধক।
সদর উপজেলার গুনরাজদী থেকে ভ্যাকসিন নিতে এসেছেন শিক্ষক রোজিনা হাবিব। তিনি জানান, তিনি শহরের আল হাবীব নামে একটি রেস্টুরেন্টে গেলে বিড়াল আঁচড় দেয় তাকে। এর পর থেকে তিনি টিকা নিতে আসেন চাঁদপুর সদর হাসপাতালে। দ্বিতীয় ডোজ নিতে এসে দেখেন ভ্যাকসিন নেই। বাইরে থেকে কিনে এনে দিতে হচ্ছে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ব্রাদার সালামত জানান, প্রতিদিন গড়ে ৩০-৪০ জন রোগী হাসপাতালে টিকা নিতে আসেন। তবে কুকুরের তুলনায় বিড়ালে কামড়ানো বা আঁচড় দেয়া রোগীই বেশি। আগের তুলনায় বর্তমানে বেশির ভাগ মানুষ ঘরে ও বিভিন্ন হোটেলে বিড়াল পোষে। এ কারণে কুকুরের চেয়ে বিড়ালের আঁচড় এবং কামড়ানো রোগী বেশি। আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় খুব অল্প সময়ে মধ্যে স্টকে থাকা ভ্যাকসিন শেষ হয়ে গেছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, জলাতঙ্ক মানুষ ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে দেখা যায়। এটিকে ঐতিহাসিকভাবে হাইড্রোফোবিয়া (পানির ভয়) হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কারণ আক্রান্ত মানুষের মধ্যে পানি নিয়ে আতঙ্ক থাকে। কুকুরের লালার মধ্যে থাকে র্যাবিস ভাইরাস (আরএবিভি)। এটি একটি সংক্রামক ভাইরাস, যা রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (আরএনএ) ও প্রোটিন নিয়ে গঠিত। র্যাবিসকে লাইসা ভাইরাস হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। লাইসা ভাইরাস হলো সাতটি নিউরোট্রপিক (স্নায়ুতন্ত্রে রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস) প্রজাতির ভাইরাসের একটি শ্রেণী, যা তাদের জেনেটিক উপাদান হিসেবে আরএনএ বহন করে। নিউরোট্রপিক ভাইরাস হিসেবে আরএবিভি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে সংক্রমিত করে। প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে পানিভীতি, আলোভীতি, বায়ুভীতি হলেও এর শেষ পরিণতি ছিল মৃত্যু। তবে এ রোগ শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য। যদি কোনো প্রাণী, বিশেষ করে কুকুর, বিড়াল, বানর, বেজি, শিয়াল কামড় বা আঁচড় দেয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সাবান পানি দিয়ে আক্রান্ত স্থান ১৫ মিনিট ধুতে হয়। এরপর ঠিক সময়ে প্রতিষেধক নিলে রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এ ব্যাপারে চাঁদপুর সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এ কে এম মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভ্যাকসিন শুধু চাঁদপুরে নয়, জাতীয় পর্যায়ে সংকট দেখা দিয়েছে। তবে আমরা চাহিদাপত্র দিয়েছি। আশা করি সরকার সংকট কাটিয়ে দ্রুত ভ্যাকসিন বরাদ্দ দেবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আগে বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ে যে পরিমাণে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল, হাসপাতালটিতে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন চালু হওয়ার পর থেকে মৃত্যুহার নেই বললেই চলে।’