নালা নির্মাণের কাজ পরিদর্শনে গিয়ে অপহরণ হন বগুড়ার সারিয়াকান্দি পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বিপ্লব। পরে দুই দফা মুক্তিপণ দিয়ে পরিবারের সদস্যরা তাকে ছাড়িয়ে আনেন। এ ঘটনায় ভিকটিমের স্ত্রী অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে অপহরণ মামলা করেন। কেবল বিপ্লবই নন, গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে সারা দেশে অপহরণের ঘটনা এবং মামলা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতায় এ ধরনের অপরাধ বেড়েই চলেছে। তবে পুলিশের দাবি, এসব ঘটনার অধিকাংশই ব্যবসায়িক ও আর্থিক লেনদেনকে ঘিরে সংঘটিত হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে সারা দেশে অপহরণের মামলা হয়েছিল ৪৪৫টি। আর পাঁচ বছরের ব্যবধানে গত বছর সারা দেশে এ মামলার সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৫টি। এর আগে ২০২৪ সালে সারা দেশে অপহরণের মামলা হয়েছিল ৬৪২টি। তার আগের বছরে অর্থাৎ ২০২৩ সালে সারা দেশে অপহরণের মামলা হয়েছিল ৪৬৩টি। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৬০টি। গত বছর হওয়া ১ হাজার ৫টি অপহরণ মামলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল জুলাইয়ে, ১০৯টি। এছাড়া জানুয়ারিতে ১০৫, ফেব্রুয়ারিতে ৭৮, মার্চে ৮৩, এপ্রিলে ৮৮, মে মাসে ৮২, জুনে ৮০, আগস্টে ৯০, অক্টোবরে ১১০, নভেম্বরে ৯৩ ও ডিসেম্বরে ৮৭টি।
অপহরণের ঘটনায় দায়ের এসব মামলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪০৩টি মামলাই নথিভুক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগ ও ঢাকা মেট্রোপলিটনে। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অপহরণের মামলা হয় চট্টগ্রাম বিভাগ ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনে, ২০৩টি। বাকি ৩৯৯টি মামলা হয় দেশের অন্যান্য বিভাগ ও মেট্রোপলিটনের পুলিশ স্টেশনে।
অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও বেড়েছে। গত বছরের ৭ নভেম্বর রাজধানীর দিয়াবাড়ী থেকে অপহৃত হয় ক্যামব্রিয়ান কলেজের শিক্ষার্থী সুদীপ্ত রায়। ১১ নভেম্বর তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। অপহরণকারীদের দাবি করা ৮০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে পরিবার ব্যর্থ হওয়ায় তাকে হত্যা করা হয় বলে ধারণা পুলিশের। এমন অনেক ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিরা জীবিত ফিরে আসেন না, বিশেষ করে নারী ও কিশোরীদের ক্ষেত্রে সামাজিক ও মানসিক সংকট আরো গভীর হয়। কক্সবাজারের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ ও উখিয়ার পাহাড়গুলো অপহরণ বাণিজ্যের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুম শুরুর পর অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা অনেক বেড়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন অপহরণের ঘটনাগুলোর মধ্যে অধিকাংশই আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত। পাশাপাশি ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্যও সাম্প্রতিক সময়ে অপহরণের মতো অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভেঙে পড়া আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েই এ ধরনের অপহরণের ঘটনা বেশি ঘটছে। কোথাও চাঁদাবাজির জন্য অপহরণ করা হচ্ছে, কোথাও আবার জমি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলের জন্যও এমন ঘটনা ঘটছে।
দেশে সবচেয়ে বেশি আর্থিক লেনদেন হয় ঢাকা ও চট্টগ্রামে। এ দুটি বিভাগেই সিংহভাগ অপহরণ সংঘটিত হয়ে থাকে। এমনকি এসব ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে বড় একটি অংশই ব্যবসায়ী। এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান বিশেষজ্ঞদের।
অপহরণকে সর্বোচ্চ মনবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয় বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে মূলত দেখি যে বাণিজ্যিক যেসব এলাকা রয়েছে বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো আর্থিক প্রবাহের শহরগুলোয় অপহরণের ঘটনা বেশি ঘটছে। অপহরণের প্রতিটি ঘটনাকে সমান ভাগে গুরুত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে যখন ঘাটতি থাকে, তখনই এ ধরনের অপরাধ বেড়ে যায়। রাজনৈতিক কারণেও নানাভাবে অপহরণের শিকার হয়। অতীতেও এমনটা আমরা দেখেছি। এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। অন্যথায় রাজনৈতিক স্বার্থ বা অর্থনৈতিক কারণে অপহরণের মতো ঘটনা বেড়ে যাবে। ভুক্তভোগী পরিবারও প্রায়ই অভিযোগ করে থাকে যে, সব অপহরণের ক্ষেত্রে জিম্মি উদ্ধারে একই ধরনের গুরুত্ব দেয়া হয় না। এ বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হবে। অপহরণকে সর্বোচ্চ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধ হিসেবে ধরা হয়।’
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মিরেরটেক বাজার এলাকা থেকে মো. মুকবিল হোসেন নামের এক ব্যবসায়ীকে গত বছরের ৯ অক্টোবর অপহরণ করা হয়। পরে মুক্তিপণের দাবিতে তাকে হাতুড়িপেটাও করা হয়। এ ঘটনার পর অপহৃত ব্যবসায়ীর পরিবারের কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করে অপহরণকারীরা। মুমূর্ষু অবস্থায় ওই অপহৃত ব্যবসায়ীকে উদ্ধারের পর সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় অপহৃত ব্যবসায়ীর ছোট ভাই শাহ আলম বাদী হয়ে দুজনকে আসামি করে সোনারগাঁ থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন।
বিগত সময়ের চেয়ে গত বছরে অপহরণের মতো অপরাধ বেড়ে যাওয়া এবং এ-সংক্রান্ত মামলা বেড়ে যাওয়ার পেছনের কারণ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় অপহরণের ঘটনায় যে বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তা পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে। আগের অনেক ঘটনা বিলম্বে মামলা হওয়া এবং বিভিন্ন বিরোধকে অপহরণ হিসেবে মামলা করার প্রবণতাও পরিসংখ্যানে প্রভাব ফেলেছে। তবুও প্রতিটি অভিযোগ যাচাই করে তদন্ত চলছে। এছাড়া মামলা আর জিডি নেয়ার প্রক্রিয়া সহজীকরণেরও প্রভাব রয়েছে।