পরিচ্ছন্ন ও দৃষ্টিনন্দন নগরীর স্বপ্ন সবার থাকলেও রাজধানী ঢাকার দৃশ্যমান চিত্র যেন তার বিপরীত। সড়কের ফুটপাত, উড়াল সড়কের পিলার, ফুটওভার ব্রিজ, বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে শুরু করে বাসাবাড়ির দেয়াল যেদিকেই চোখ যায়, দেখা মেলে পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুনসহ নানা ধরনের বিজ্ঞাপনের প্রচারসামগ্রী। কোথাও একটি পোস্টারের ওপর আরেকটি পোস্টার, কোথাও আবার অনুমোদনহীন সাইনবোর্ড ও বিজ্ঞাপনে ঢেকে গেছে স্থাপনার সৌন্দর্য। সব মিলিয়ে রাজধানীর দৃশ্যমান পরিবেশে তৈরি হয়েছে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরজমিনে দৃষ্টি দূষণের এ চিত্র চোখে পড়ে। সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে উড়াল সড়ক ও মেট্রোরেলের পিলার ও ফুটওভার ব্রিজগুলোতে। এসব স্থাপনার বিভিন্ন অংশজুড়ে সাঁটানো থাকে কোচিং সেন্টার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসন কোম্পানি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নানা ধরনের সেবার বিজ্ঞাপন। বাদ যায়নি রাস্তার পাশের বাসাবাড়ির দেয়ালও। পোস্টার ও ব্যানারে ঢেকে থাকে রাস্তার পাশের দেয়ালগুলো। এসব ক্ষেত্রে ভবন মালিকরাও যেন অসহায়। আবার ফুটপাতে অস্থায়ী দোকানে পলিথিন ও প্লাস্টিকের ত্রিপলের ছাউনি সড়কের সৌন্দর্যহানি করছে।
শুধু পোস্টার-ব্যানার নয়, অপরিকল্পিত সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড ও এলইডি স্ক্রিনে বিজ্ঞাপনও দৃষ্টি দূষণের বড় উৎস। একই স্থানে বিভিন্ন আকার, রঙ ও আলোর বিজ্ঞাপন থাকায় নগরীর স্বাভাবিক দৃশ্যমান ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। রাতে অতিরিক্ত উজ্জ্বল এলইডি বা আলোকিত বিজ্ঞাপন চালকদের মনোযোগও বিচ্যুত করতে পারে। এর ফলে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে আসছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবেশবিদদের মতে, দৃষ্টি দূষণের প্রভাব শুধু মানুষের চোখে দৃষ্টিকটু দৃশ্য তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো রাতের স্বাভাবিক পরিবেশেও পরিবর্তন আনে। অনিয়ন্ত্রিত আলোকসজ্জা মানুষের পাশাপাশি পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ ও আবাসস্থলের পরিবেশেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে নগর ব্যবস্থাপনায় আলোক দূষণকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঝে মাঝেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন অভিযান চালায়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ২০২৫ সালের নভেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, নগরজুড়ে অবৈধ যেসব ব্যানার-ফেস্টুন ও পোস্টার অপসারণ করা হয়, তার মধ্যে ২৮ শতাংশ রাজনৈতিক, ২১ শতাংশ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের এবং ১৭ শতাংশ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। ডিএনসিসি ১০টি অঞ্চল ও ৫২টি ওয়ার্ডে চালানো অভিযানের তথ্যে এটা দেখা গেছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও (ডিএসসিসি) গত ডিসেম্বরে অনুমতিবিহীন ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার, বিজ্ঞাপন, সাইনবোর্ড ও অন্যান্য প্রচারসামগ্রী অপসারণে উদ্যোগ নেয়। ডিসেম্বরের শুরুতে গণবিজ্ঞপ্তি জারির পর ৮ ডিসেম্বর রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় থেকে অভিযান শুরু করে সংস্থাটি। ডিএসসিসির পক্ষ থেকে বলা হয়, যত্রতত্র দেয়াল লিখন, পোস্টার, ব্যানার, বিজ্ঞাপন, ফেস্টুন ও বিলবোর্ড স্থাপনের ফলে নগরীর সৌন্দর্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। আইনেও বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২ অনুযায়ী নির্ধারিত স্থান ও অনুমতি ছাড়া দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো নিষিদ্ধ। ডিএসসিসি তাদের গণবিজ্ঞপ্তিতে এ আইনের কথা উল্লেখ করে অনুমতিবিহীন প্রচারসামগ্রী সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেয়।
নিয়মিত এত অভিযান ও বিপুলসংখ্যক পোস্টার-ব্যানার অপসারণের পরও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। একটি ব্যানার বা পোস্টার সরানোর কিছুদিন পরই অনেক স্থানে আবার নতুন করে প্রচারসামগ্রী লাগানো হচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু নিয়মিত অভিযান চালিয়ে দৃষ্টি দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কোথায় কী ধরনের বিজ্ঞাপন থাকবে, তার আকার, রঙ, আলোকসজ্জা ও স্থাপনের পদ্ধতি নির্ধারণ করে একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রয়োজন। পাশাপাশি অনুমোদন ছাড়া প্রচারসামগ্রী স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করতে হবে এবং একই সঙ্গে বৈধ বিজ্ঞাপনের জন্য নির্দিষ্ট স্থান ও কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘এটা শুধু দৃষ্টি দূষণই নয়, এটা আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়। অনেক সময় শিশু ও তরুণদের অনেক বাজেভাবে উপস্থাপন করে পোস্টারিং করা হচ্ছে, যা সমাজের জন্য খারাপ দৃষ্টান্ত। ব্যানার ফেস্টুনে ফ্লুরোসেন্ট কালি বা রিফ্লেক্টিভ কালি মাত্রার থেকে অনেক বেশি ব্যবহার করা হয়, এটা বেশি মাত্রায় থাকায় রাতে গাড়ির চালক, পথচারী সবার দৃষ্টি ওইদিকে চলে যায় এতে রোড অ্যাকসিডেন্টের ঝুঁকি বাড়ে।’ এক্ষেত্রে নগরবাসীর সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এ বিষয়ে ডিএনসিসি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী গ্রিন সিটি, ক্লিন সিটি গড়ার কথা বলেছেন। আমরা সেভাবেই কাজ করছি। একদম রুট লেভেল থেকে কাজ করছি আমরা।’ পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে সচেতনতা কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করা হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ব্যানার-পোস্টারের পরিবর্তে ডিজিটাল প্রচারের দিকে যাওয়া উচিত। তাহলে এ ধরনের সমস্যার সুন্দরভাবে সমাধান করা সম্ভব হবে।’ বহির্বিশ্বের উদাহরণ দিয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, ‘বিদেশে মানুষ যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে না। আমাদের মধ্যেও এ ধরনের সচেতনতা তৈরি করতে হবে।’
পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আমরা কাজ করছি। আগের তুলনায় জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। আগের মতো ঢাকায় যত্রতত্র ব্যানার-ফেস্টুনও নেই। এর পরও কেউ বিচ্ছিন্নভাবে ব্যানার-ফেস্টুন লাগালে আমরা তা অপসারণ করি।’
ক্লিন সিটি গড়ে তুলতে নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, ‘পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর নগরী গড়ে তুলতে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নগরবাসীকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’