বিজয়া দশমীতে বিসর্জনে শেষ হলো দুর্গােৎসব

ঢাকের তাল, শঙ্খ আর উলুধ্বনিতে পুরো মন্দির প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে। নারীদের পাশাপাশি এতে অংশ নেয় পুরুষ, তরুণ ও শিশু-কিশোররা। স্বামীরাও তাদের স্ত্রীর কপালে সিঁদুর দিয়ে নিজেদের সংসারের মঙ্গল কামনা করেন।

পূজা, পুষ্পাঞ্জলি ও দেবী দুর্গাকে সিঁদুরে বরণ ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গা পূজা। শঙ্খনাদ, উলুধ্বনি, ঢাকের বাদ্যি আর ধূপ-ধুনোর সুবাসে মুখরিত পরিবেশকে বিসর্জনের বিষাদে ভাসিয়ে ‘দুর্গতিনাশিনী’ দেবী দুর্গার আরাধনা হয়েছে দশমীর সকালে। বিজয় দশমীতে গতকাল রাজধানীর মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর পাদপদ্মে সধবা নারীদের সিঁদুর ছোঁয়ানো, অঞ্জলি দান এবং নারীদের সিঁদুর খেলার মধ্য দিয়ে দুর্গাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানানো হয়।

দশমীর বিহিত পূজা এবং দর্পণ বিসর্জনে শেষ হয় দেবীর শাস্ত্রীয় বিসর্জন। এদিন সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্তদের ঢল নামে। বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কের গুলশান-বনানী পূজামণ্ডপেও দেবীকে সিঁদুর পরাতে জড়ো হন শত শত নারী। সেই বরণের থালায় ছিল সিঁদুর, পান, ফুল ও মিষ্টি; কারো কারো হাতে ছিল শঙ্খ, প্রদীপ ও কলস। একে একে মঞ্চে উঠে নারীরা দেবীর মুখে মিষ্টি ছুঁইয়ে, সিঁদুর পরান। সেই সঙ্গে ঢাকের বাদ্যি আর উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপ প্রাঙ্গণ।

পূজার সব আনুষ্ঠানিকতা ও অঞ্জলি শেষে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে শুরু হয় সিঁদুর খেলা। প্রথমে দুর্গাকে এবং পরবর্তী সময়ে একে অন্যের কপালে ও গালে সিঁদুর মাখানোর আনুষ্ঠানিকতায় মেতে ওঠেন ভক্তরা। এ সময় নাচে-গানে ‘আনন্দময়ীর’ বন্দনা করা হয় এবং দেবী দুর্গার নামে জয়ধ্বনিও তোলেন তারা।

শুধু বনানীই নয়, রাজধানীর অন্যান্য মন্দিরেও দুর্গোৎসবের শেষ দিনের আমেজ ও বিদায়ের সুর। রমনা কালী মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, হাজারো ভক্তের পদচারণায় মুখরিত মন্দির প্রাঙ্গণ। একদিকে বিদায়ী আরতি ও দেবীর পায়ে শেষ অঞ্জলি অর্পণ, অন্যদিকে মন্দিরের বিশাল মণ্ডপের মাঠে নাচে-গানে মেতে ওঠেন দর্শনার্থীরা।

ঢাকের তাল, শঙ্খ আর উলুধ্বনিতে পুরো মন্দির প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে। নারীদের পাশাপাশি এতে অংশ নেয় পুরুষ, তরুণ ও শিশু-কিশোররা। স্বামীরাও তাদের স্ত্রীর কপালে সিঁদুর দিয়ে নিজেদের সংসারের মঙ্গল কামনা করেন।

অন্যদিকে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরেও ছিল ভক্তি ও বিষাদের মিশ্র আবহ। গতকাল সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটে দশমী বিহিত পূজা ও দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে দেবী দুর্গার পূজার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। এরপর বেলা ১১টা থেকে ভক্তদের দেবী বরণ শুরু হয়।

দেবী বরণ শেষে দুপুর ১২টায় সিঁদুর খেলা শুরু হয়। লাল-সাদা শাড়িতে সজ্জিত নারীরা ঢাকের তালে মেতে ওঠেন সিঁদুর খেলায়; পরস্পরের গালে ও কপালে সিঁদুর মাখিয়ে স্বামীদের দীর্ঘায়ু ও পরিবারের কল্যাণ প্রার্থনা করেন।

এদিন বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময় করে ছোটরা বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয়, সমবয়সীরা কোলাকুলি করে এবং মিষ্টিমুখের মাধ্যমে একে অন্যকে জানায় শুভ বিজয়ার প্রীতি ও শুভেচ্ছা।

সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ‘পিতৃগৃহ’ থেকে পুত্র-কন্যা নিয়ে দুর্গা ফিরে যাবেন কৈলাসে তার ‘স্বামীর’ ঘরে। এক বছর পর নতুন শরতে আবার তিনি আসবেন এ ধরণিতে।

এবার প্রতিমা নিরঞ্জনের (বিসর্জন) শুভক্ষণ ছিল বেলা ১টা ১৫ মিনিট থেকে বিকাল ৪টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত। গত বছর ঢাকায় ১০টি ঘাটে প্রতিমা বিসর্জনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ঘাটগুলো হলো বিনাস্মৃতি স্নানঘাট, ওয়াইজঘাট, নবাববাড়ি ঘাট, লালকুঠি ঘাট, তুরাগের ধউর ঘাট, মিল ব্যারাক ঘাট, পোস্তগোলা শ্মশানঘাট, আমিনবাজার ব্রিজঘাট, বছিলা ব্রিজঘাট ও বালু নদের কয়েতপাড়া ঘাট।

আরও