সঞ্চালন সীমাবদ্ধতায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না দক্ষিণের বড় চার কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র

দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ৭ হাজার ৯৫ মেগাওয়াট। এগুলোর মধ্যে বড় চারটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না গ্রিডের সীমাবদ্ধতার কারণে।

দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ৭ হাজার ৯৫ মেগাওয়াট। এগুলোর মধ্যে বড় চারটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না গ্রিডের সীমাবদ্ধতার কারণে। এ কারণে জাতীয় গ্রিডে আকস্মিকভাবে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলে তা পূরণ করা হচ্ছে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালিয়ে। এতে একদিকে যেমন বিপিডিবির উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতার বড় অংশ বসিয়ে রাখা হচ্ছে। অথচ বেজ লোড বিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে থাকার কথা ছিল বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিপিডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, দক্ষিণ অঞ্চলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় না চালাতে পারার জন্য শুধু গ্রিডের সীমাবদ্ধতাই একমাত্র কারণ নয়। এর বাইরে আরো দায়ী পর্যাপ্ত জ্বালানির (কয়লা) অভাব, বকেয়া বিল ও রক্ষণাবেক্ষণ। তবে গ্রিডের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। এসব কাজ শেষ হলে কয়লাভিত্তিক সব বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করেছেন কর্মকর্তারা।

বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লাল্টগুলোর মোটা দাগে তিনটি সংকট রয়েছে। যে কারণে এগুলো সার্বক্ষণিক চালু থাকার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয় না। প্রথমত, বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানোর মতো প্রয়োজনীয় কয়লার মজুদ না থাকা; দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রগুলোর বকেয়া যথাসময়ে পরিশোধ করা না গেলে কয়লা আমদানিতে বিলম্ব এবং তৃতীয়ত, গ্রিড সক্ষমতা পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়া। এর বাইরে একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র সার্বক্ষণিক চালু থাকলে অন্তত ২০ শতাংশ ক্যাপাসিটি রক্ষণাবেক্ষণে থাকে।’

বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের চারটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ৪ হাজার ২৬৭ মেগাওয়াট। এর মধ্যে বাগেরহাটের রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট (যদিও প্রকৃত সক্ষমতা ১ হাজার ২৩৪ মেগাওয়াট), বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ারের ৩০৭, পটুয়াখালীর পায়রায় আরপিসিএল-নরিনকোর ১ হাজার ৩২০ ও বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিপিসিএল) ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি অনুযায়ী, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ৮০ শতাংশ প্লান্ট ফ্যাক্টরে চলার কথা থাকলেও চলতি বছর খুব সীমিত সময় তা পূর্ণ সক্ষমতায় চলেছে।

বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, বিসিপিসিএল চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত ৮০ শতাংশ প্লান্ট ফ্যাক্টরে চলেছে মাত্র ৬১ দিন, রামপালে বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফপিসিএল) ২৭ দিন ও বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ার ৩০ দিন। এছাড়া আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেড (আরএনপিএল) প্রায় ছয় মাস আগে পুরোপুরি প্রস্তুত হলেও এখনো বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসেনি। যদিও গত জানুয়ারি থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী কেন্দ্রটি ৫০ দিন ৮০ শতাংশ প্লান্ট ফ্যাক্টরে চলেছে বলে বিপিডিবি সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরএনপিএল, বিসিপিসিএল ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পদ্মা সেতু চালুর পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক কর্মতৎপতার সম্ভাব্য বিকাশকে বিবেচনায় নিয়ে এ অঞ্চলে আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। কারণ শিল্পায়ন হলে ব্যাপক হারে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তেমন শিল্পায়ন হয়নি, বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়েনি। যে কারণে বৃহৎ কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ ঢাকায় এনে তা জাতীয় গ্রিডে সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালু ও উৎপাদনক্ষম হয়ে ওঠার পর গ্রিড সীমাবদ্ধতার কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় কেন্দ্রগুলো চালানো যাচ্ছে না।

বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ অঞ্চলে কয়লাভিত্তিক বড় চারটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ৪ হাজার ২৬৭ মেগাওয়াট। ৮০ শতাংশ প্লান্ট ফ্যাক্টরে কেন্দ্রগুলো চালানো হলে গোপালগঞ্জ-আমিনবাজার ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন দিয়ে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন করা যায়।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিড দিয়ে ঢাকায় আনার জন্য মোংলা থেকে মাওয়া হয়ে সাভারের আমিনবাজার পর্যন্ত ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। যেটি মোংলা-মাওয়া-আমিনবাজার ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন নামে পরিচিত।

তবে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শুধু যে গ্রিড সীমাবদ্ধতার কারণে সব কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না বিষয়টি সবসময় এ রকম নয়। পিজিসিবি মেরিট অর্ডারের ভিত্তিতে কেন্দ্রগুলোর কাছ থেকে বিদ্যুৎ গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে বিদ্যুতের চাহিদা ও সাশ্রয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়। বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকলে কিংবা উৎপাদন ব্যয় বেশি হলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের বিদ্যুৎ কম নেয়া হয়। ফলে সবসময় কেন্দ্রগুলো ৮০ শতাংশ প্লান্ট ফ্যাক্টরে চলবে বিষয়টি এমন নয়। তবে বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সবই বেজ লোডভিত্তিক। কিন্তু জ্বালানিস্বল্পতা, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কেন্দ্রগুলো সার্বক্ষণিক চালানো সম্ভব হয় না।’

দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা সাত হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বিদ্যুতের তীব্র চাহিদায় সর্বোচ্চ চালানো যায় গড়ে চার হাজার মেগাওয়াট। বাকি সক্ষমতা জ্বালানি সংকট, রক্ষণাবেক্ষণ এমনকি বিল বকেয়ার মতো কারণে কাজে লাগানো যায় না।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান ড. এম রেজওয়ান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে শুধু যে সঞ্চালনগত সমস্যা, বিষয়টি এমন নয়, সেখানে কয়লা খালাস ও জ্বালানি আমদানির সংকটও রয়েছে। তবে ৮০ শতাংশ প্লান্ট ফ্যাক্টরে কেন্দ্রগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় যে সঞ্চালন অবকাঠামো প্রয়োজন সেগুলোর কাজ তিন-চার মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তখন পূর্ণ সক্ষমতায় কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে।’

আরও