যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক এমপি গোলাপের নয় ফ্ল্যাট-বাড়ি কেনার প্রমাণ পেয়েছে দুদক

দুদকের দাবি, গোলাপ সংসদ সদস্য হিসেবে পাবলিক সার্ভেন্ট হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের কুইন্স-এ ৯টি ফ্ল্যাট ও বাড়ি কিনেছেন। বাংলাদেশী টাকায় এগুলোর মূল্য ৩২ কোটি টাকা।

মাদারীপুর-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ আবদুস সোবহান মিয়ার (গোলাপ) নামে যুক্তরাষ্ট্রে নয়টি ফ্ল্যাট-বাড়ি কেনার প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা দায়েরের অনুমোদনও দিয়েছে কমিশন। বুধবার (১৯ মার্চ) দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন এ তথ্য জানান।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ আগস্টের আগেই দুদক তার বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য চেয়ে এমএলআর করেছিল। দুদকের উপপরিচালক মোহাং নূরুল হুদা তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করবেন।

দুদকের দাবি, গোলাপ সংসদ সদস্য হিসেবে পাবলিক সার্ভেন্ট হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের কুইন্স-এ ৯টি ফ্ল্যাট ও বাড়ি কিনেছেন। বাংলাদেশী টাকায় এগুলোর মূল্য ৩২ কোটি টাকা। তার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ পাওয়া গেছে ৬৮ কোটি ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৬৬৫ টাকা। এছাড়া তার নিজ নামে ৫১টি ব্যাংক হিসাবে মোট ৯৭ কোটি ৬৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৮৮ টাকার অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে।

এর আগে গত ৯ জানুয়ারি গোলাপ এবং তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা যুক্তরাষ্ট্রে ৯টি স্থাবর সম্পদ জব্দের আদেশ দেন আদালত। একই সঙ্গে তাদের ৫৩টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেয়া হয়। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. জাকির হোসেন গালিব এ আদেশ দিয়েছেন।

আদালতের সম্পদ জব্দের আদেশের তথ্য অনুযায়ী, কারাগারে থাকা সাবেক সংসদ সদস্য গোলাপ, তার স্ত্রী গুলশান আরা মিয়া, ছেলে ইভান সোবহান মিয়া ও মেয়ে আনিশা গোলাপ মিয়ার নামে এসব স্থাবর সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে গোলাপ ও তার স্ত্রী-সন্তানদের নামে থাকা মিরপুরের একটি পাঁচতলা বাড়িও জব্দের আদেশ দেয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাড়িগুলোর মধ্যে আটটি সিঙ্গেল রেসিডেন্সিয়াল কন্ডো ইউনিট এবং অপরটি ডুয়েল ফ্যামিলি ইউনিট বলে তথ্য দেয়া হয়েছে দুদকের আবেদনে। এর আগে গত ২ অক্টোবর সাবেক এ সংসদ সদস্যের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন একই আদালত।

সরকার পতনের পর আত্মগোপনে থাকা গোলাপকে রাজধানীর নাখালপাড়ার একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে ঢাকায় একটি হত্যার ঘটনাসহ একাধিক অভিযোগে মামলা রয়েছে।

২০২৩ সালের জুনে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ‘অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট’বা ওসিসিআরপি তাদের ওয়েবসাইটে করা একটি প্রতিবেদনে আবদুস সোবহান মিয়া (গোলাপ) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ৪০ লাখ ডলার ব্যয়ে একাধিক বাড়ি কেনার তথ্য প্রকাশিত হয়।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি ২০১৪ সালে প্রথম নিউইয়র্কে অ্যাপার্টমেন্ট কেনা শুরু করেন। ওই বছর নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস এলাকায় একটি সুউচ্চ ভবনে অ্যাপার্টমেন্ট কেনেন তিনি। পরের পাঁচ বছরে তিনি নিউইয়র্কে একে একে মোট নয়টি প্রপার্টি বা সম্পত্তির (ফ্ল্যাট বা বাড়ি) মালিক হন। এসব সম্পত্তির মূল্য ৪০ লাখ ডলারের বেশি।

২০২৩ সালের ১৩ জানুয়ারি প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, আশির দশকে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর মোহাম্মদ আবদুস সোবহান মিয়া কম বেতনের কাজ, যেমন- পিৎজা তৈরি, ওষুধের দোকানে কাজ, লাইসেন্স ছাড়া ট্যাক্সি চালাতেন বলে জানান তার সহকর্মীরা। এসব কাজ থেকে যে আয় হয় তা দিয়ে এভাবে অ্যাপার্টমেন্ট বা বাড়ি কেনা সম্ভব নয়। এসব সম্পত্তি কিনতে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাঠানো হয়েছে কিনা— তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ বাংলাদেশ থেকে সম্পত্তি কেনার জন্য বিদেশে অর্থ পাঠানোর সুযোগ নেই।

আবদুস সোবহান মিয়া ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে মাদারীপুর-৩ আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ছিলেন।

আরও