সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে। বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার কারণে সারা বিশ্বের দৃষ্টি থাকে এ বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতি। এবার হার্ভার্ড আলোচনায় এসেছে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেশকিছু নির্দেশের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করে। ঘটনাটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও দায়িত্ববোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অন্যদিকে কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশের তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ও গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় আলোচিত হয়েছে উপাচার্যের বিভিন্ন অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের জেরে। আর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদের শিরোনাম হয়েছে আবাসন সুবিধার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে। উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয় দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে নেতৃত্ব দেয়, গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্রভাব ফেলে। তবে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান ও পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। উচ্চশিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছাত্রদের নেতৃত্বে সংগঠিত গণ-অভ্যুত্থানের পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় সংস্কারের প্রত্যাশা থাকলেও দৃশ্যমান বড় কোনো সংস্কার এখনো দেখা যায়নি। বিভিন্ন খাতের সংকট সমাধানে সংস্কার কমিটি গঠন করা হলেও অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষা খাতের সংস্কারে কোনো কমিটি গঠন করেনি।
গত দেড় দশকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে মূলত রাজনৈতিক বিবেচনায়। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দায়িত্বে থাকা প্রায় সব উপাচার্য পদত্যাগে বাধ্য হন। নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা দাবি করেছিলেন উপাচার্য নিয়োগে দলীয় আদর্শ বিবেচনায় না নিয়ে একাডেমিক দক্ষতা গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিগত সরকারের সময় থেকে উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠনের দাবি থাকলেও তা করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেয়ার পরপরই অভিযোগ ওঠে এ নিয়োগেও দলীয় আদর্শকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত তিন মাসে দায়িত্ব প্রদানের এক বছর পার হওয়ার আগেই দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ট্রেজারারকে অব্যাহতি দিতে বাধ্য হয় এ সরকার। কুয়েট ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণের অভিযোগে আন্দোলন করেন। আন্দোলনের জেরেই সরকার তাদের অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়। এ দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে উপাচার্য নিয়োগে সুপারিশ প্রণয়নে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। যদিও শিক্ষাবিদরা বলছেন এ কমিটি আরো আগে তৈরি করা প্রয়োজন ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন বলেন, ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থী থেকে সাধারণ মানুষ—সবাই প্রত্যাশা করেছিলাম আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা-গবেষণার সুযোগ নিশ্চিত হবে, দলীয় রাজনীতি থাকবে না, আধিপত্যবাদ, ক্ষমতার অপব্যবহার থাকবে না, শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পাবে, সর্বোপরি দীর্ঘদিন ধরে যে সংকটগুলো তৈরি হয়েছিল তা দূর হবে। দেয়ালের গ্রাফিতিতেও এসব প্রত্যাশা ফুটে উঠেছিল। তবে ১০ মাস পর যদি প্রত্যাশার বিপরীতে প্রাপ্তির কথা বলি সেটি পুরোপুরি শূন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান উন্নয়ন, দলীয় রাজনীতিমুক্ত করা, ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির বিধি সংশোধন, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধির দৃশ্যমান বড় উদ্যোগ নেই। সব বিষয়ে সংস্কার কমিশন হলেও এ খাতে কোনো সংস্কার কমিশন তৈরি হয়নি। অন্তত শিক্ষা উপদেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অংশীজনদের নিয়ে আলোচনা করতে পারতেন, এসব বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে পারতেন কিন্তু সেটিও করা হয়নি।
বিগত কয়েক বছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ছিল তার মধ্যে অন্যতম শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগে যোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয় বিবেচনায় নেয়া। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে ৪৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ৮ হাজার ৮০০ জন শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন। অভিযোগ আছে, তাদের বড় অংশের নিয়োগেই যোগ্যতর প্রার্থীদের উপেক্ষা, স্বজনপ্রীতি, দলীয় প্রভাব খাটানো হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই পছন্দের প্রার্থীকে প্রথমে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে পরবর্তী সময়ে স্থায়ী করা হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ২০১৬ সালের এক প্রকাশনায় প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয়করণ, বিজ্ঞপ্তির বাইরে মাত্রাতিরিক্ত নিয়োগ, পরীক্ষার ফল প্রভাবিত করাসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়। এমনকি আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পদে নিয়োগে ৩ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক লেনদেনের তথ্যও উঠে আসে ওই প্রকাশনায়। এছাড়া ২০২৪ সালে ইউজিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তত ৩০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউজিসির নিয়ম অমান্য করছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নিয়োগের এ অনিয়মের অভিযোগ অব্যাহত আছে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি ইউজিসির নির্দেশনা অমান্য করে কোনো ধরনের বিজ্ঞপ্তি ছাড়া চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত এসব নিয়োগের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন এসব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও ইউজিসির নির্দেশনা অমান্যের ঘটনা নির্দেশ করে উচ্চশিক্ষা খাতে প্রত্যাশিত কোনো পরিবর্তন এখনো নিশ্চিত হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ‘আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দীর্ঘদিন ধরে সংকট তৈরি হয়েছে। রাতারাতি এসবের পরিবর্তন সম্ভব নয়। তবে পরিবর্তনের শুরুটা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কারের জন্য মূলত দুটো বিষয় প্রয়োজন। একটি হচ্ছে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আরেকটি প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা। শিক্ষক-কর্মকর্তার নিয়োগ-পদোন্নতিসহ বিভিন্ন নীতিগত সংস্কারের ক্ষেত্রে দল-মত নির্বিশেষে সবার ঐকমত্যে পৌঁছানো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে ঐকমত্যের অভাবে বিষয়গুলো আটকে যাচ্ছে। আমাদের সবারই উচিত শিক্ষার মানোন্নয়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে এসব বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো। বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য আমরা সংস্কারের উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি, তবে এটি আরো বড় পরিসরে হওয়া প্রয়োজন।’
বিগত দেড় দশকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কলেবরে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে কর্মবাজারের চাহিদা বিবেচনা না করে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিস্বার্থে পছন্দের ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে অনেক নতুন বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এসব বিভাগের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী বেকার থাকছেন। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দুই দশকে নতুন ৩৬টি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যার মধ্যে বড় অংশের কর্মবাজারে চাহিদা অত্যন্ত সীমিত। এমনকি বিভিন্ন বিভাগে একসময় যেসব বিষয় কোর্স হিসেবে পড়ানো হতো পরবর্তী সময়ে সেগুলোকে বিভাগে রূপান্তর করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ২০১২ সালে টেলিভিশন চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফি, ২০১৪ সালে কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডার এবং ২০১৫ সালে প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন স্টাডিজ বিভাগ চালু হয়। প্রথম দুটি বিভাগ মূলত গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে কোর্স হিসেবে পড়ানো হতো। এ সময়ে সংস্কৃত এবং পালি ও বুড্ডিস্ট স্টাডিজ বিভাগকে ভেঙে দুটো স্বতন্ত্র বিভাগে রূপান্তর করা হয়। এছাড়া আরো বেশকিছু বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়, যেগুলোর কারিকুলাম ওই সময়ে বিদ্যমান অন্য নির্দিষ্ট বিভাগের কারিকুলামের প্রায় অভিন্ন। একই অবস্থা দেখা গেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দুই দশকে অন্তত ১২টি নতুন বিভাগ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত আটটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুনভাবে চালু হওয়া শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান, সংগীতসহ বেশ কয়েকটি বিভাগের বাজারের চাহিদা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি এ ধারা অনুসরণ করা হয়েছে অপেক্ষাকৃত নতুন বিশ্ববিদ্যালয়েও। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক উপাচার্য শিক্ষা অনুষদের অধীনে শিক্ষা বিভাগ ও শিক্ষা প্রশাসন বিভাগ চালু করেন যে দুটো বিভাগের সিলেবাস প্রায় একই। এছাড়া ২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ স্টাডিজ (বিএমএস) বিভাগ চালু করা হয়। বিভিন্ন চাকরিতে আবেদনের ক্ষেত্রে জটিলতার কারণে ২০২৩ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের জেরে ডিগ্রির নাম পরিবর্তন করা হয়।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভাগ চালু করার ক্ষেত্রে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাহিদা বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সমজাতীয় ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট নয় এমন কিছু বিভাগ চালু আছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের চিঠির পর আমরা একাডেমিক মাস্টারপ্ল্যান তৈরির একটি কমিটি করেছি। তাদের সুপারিশ অনুযায়ী আমরা এসব বিভাগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
অভিযোগ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সুযোগ ও পরিবেশ নিয়ে। শিক্ষাবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ গবেষণার দুরবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বলছে গবেষণার প্রধান অন্তরায় বাজেট সংকট। গবেষণার জন্য যে পরিমাণ অর্থ, যে সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে তা নিশ্চিত করা হয় না। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গবেষণা খাতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ১৮৮ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গবেষণা ক্ষেত্রে তারা যে পরিমাণ বরাদ্দ চান তা পাওয়া যায় না। এমনকি সরকার পরিবর্তনের পরও এ চিত্র বদলায়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে মূল সংস্কারের জায়গাটা হওয়া উচিত দুই ধরনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। একটি হলো বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রকে কী দিচ্ছে সে বিষয়ে জবাবদিহি। এখন আমরা এমন অনেক গ্র্যাজুয়েটকে দেখছি, যারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সার্টিফিকেট নিয়ে বের হচ্ছেন ঠিকই কিন্তু আমাদের দেশের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে তার শিক্ষা কাজে লাগছে না। বিশ্ববিদ্যালয় যা পড়াচ্ছে, যা গবেষণা করছে তা দেশের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা এবং যেসব গ্র্যাজুয়েটকে তৈরি করছে, তারা দেশের চাহিদা পূরণ করতে পারছে কিনা এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জবাবদিহি থাকতে হবে। আরেকটি বিষয় হলো রাষ্ট্র ও সরকারের জবাবদিহি। মানসম্মত শিক্ষা-গবেষণার পরিবেশ, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগে রাষ্ট্র ও সরকার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে কিনা, অর্থায়ন করছে কিনা সে বিষয়ে রাষ্ট্র ও সরকারের জবাবদিহি থাকতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সংস্কার নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে যে সংকট রয়েছে শিক্ষা ক্ষেত্রেও সেই একই ধরনের সংকট রয়েছে। সংস্কার বলতে আমরা আসলে কী বোঝাচ্ছি, কী করতে চাচ্ছি অর্থাৎ আমাদের সংস্কারের দর্শন কী সরকারের সেটি সুস্পষ্ট করা উচিত।’
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ক্লাসরুম, ল্যাব, লাইব্রেরি, আবাসনের মতো শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা। তবে দেশের বেশির ভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্তত ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসরুম সংকট রয়েছে, ৩৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত ল্যাব নেই, আর ৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয়েই অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধা নেই। এমনকি দেশের প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে আবাসন সুবিধা পাচ্ছে মাত্র ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। এছাড়া ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সুবিধা আছে মাত্র ১৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় শিক্ষার্থীদের মতামতকে তুলে ধরতে বিগত শাসনামলে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের দাবি তোলা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি বললেই চলে। অন্তর্বর্তী সরকারের ১০ মাসেও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘আমরা সংস্কারের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি। এগুলোর কিছু ফলাফল হয়তো শিগগিরই দেখা যাবে, আবার কিছু উদ্যোগের ফল কিছুদিন পর দৃশ্যমান হবে। যেমন আবাসনের ক্ষেত্রে আমরা তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে কিছু বাংকারের ব্যবস্থা করেছি। আবাসন সুবিধা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না এমন শিক্ষার্থীদের একাংশের জন্য আর্থিক বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছি। এছাড়া আমাদের নতুন হল নির্মাণের পরিকল্পনা আছে। এ বিষয়ে কাজ চলছে তবে এ ধরনের অবকাঠামোগত কাজ দৃশ্যমান হতে সময় লাগবে। আমরা রেজিস্ট্রার দপ্তরের বিভিন্ন কাজ অটোমেশনের উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করছি এটি কয়েক মাসের মধ্যেই সম্পন্ন হবে। এর পাশাপাশি গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধিতে এবং কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলতে কাজ করছি। সার্বিকভাবে বলব আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোটামুটি সব ক্ষেত্রে মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য কাজ করছি।’
সার্বিক বিষয়ে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজ বলেন, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যে সংকট তা রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। আমরা চেষ্টা করছি ভবিষ্যতে যাতে অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা না ঘটে। শিক্ষক নিয়োগ যেন পুরোপুরি স্বচ্ছ হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অপ্রয়োজনীয় বিভাগের যে অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো কীভাবে বর্তমান শ্রমবাজারের উপযোগী করা যায় সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় সিদ্ধান্ত নেবে। তবে আমরা এটুকু নিশ্চিত করতে পারি এভাবে শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনা না করে আর কোনো নতুন বিভাগ খুলতে দেয়া হবে না। এছাড়া শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতেরও চেষ্টা চলছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘শিক্ষা খাতে একটি বড় সমস্যা বাজেট স্বল্পতা। আমাদের যে পরিমাণ বরাদ্দ প্রয়োজন তা নেই। এরপরও আমরা চেষ্টা করছি অবস্থা পরিবর্তনের। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন প্রজেক্টের বিষয়ে কাজ চলছে। এটি শিগগিরই শুরু হবে। এখানে গবেষণায় বড় বরাদ্দ থাকবে। এর অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার মান উন্নয়ন হবে। এ প্রকল্পে আমরা শুধু অর্থ বরাদ্দই দেব না, তা যেন সঠিকভাবে ব্যবহার হয় সে বিষয়টিও নিশ্চিত করব।’