জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী পর্বে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সাধারণ পরিষদ হলে আয়োজিত এ অধিবেশনে তিনি যোগ দেন।
প্রধানমন্ত্রী এদিন উচ্চ পর্যায়ের সাধারণ বিতর্কে যোগ দেন। তার সহকারী প্রেস সচিব নাজমুল হক জানান, মিলনায়তনের আসনগুলো বর্ণানুক্রমিকভাবে সাজানো থাকায় ‘বি’ আদ্যক্ষরের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল প্রথম সারিতে আসন পায়। অধিবেশনস্থলে পৌঁছলে প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানো হয়। মিলনায়তনে প্রবেশের পর প্রধানমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমানকে অভিবাদন জানান। এরপর তিনি আসন গ্রহণ করেন। পরে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস উদ্বোধনী বক্তব্য দেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন এবং পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম উপস্থিত ছিলেন।
এদিন সকালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের নর্থ ডেলিগেটস লাউঞ্জে বিশ্বনেতা ও তাদের জীবনসঙ্গীদের সম্মানে স্বাগত প্রাতরাশ (ওয়েলকাম ব্রেকফাস্ট) সভার আয়োজন করেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। আয়োজনের শুরুতে বিশ্বনেতারা একে একে তাদের সঙ্গীদের নিয়ে অনুষ্ঠান মঞ্চে ওঠেন এবং জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও তার স্ত্রীর সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে নিয়ে মঞ্চে উঠে আন্তোনিও গুতেরেস ও তার স্ত্রীর সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং ফটোসেশনে অংশ নেন।
গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাইডলাইন পৃথক বৈঠক করেছেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে, হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ে ফিস-আইমে ও মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট উজ হুসেইন মোহামেদ লতিফ। বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের সঙ্গে দেশগুলোর মধ্যকার বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক আরো জোরদার করা, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় পারস্পরিক স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণে বিদ্যমান সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো আরো সম্প্রসারণের বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়েও মতবিনিময় করেন তারা।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গাও এদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাইডলাইন বৈঠক করেন। এতে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা আরো জোরদার করা এবং ভবিষ্যতে পারস্পরিক অংশীদারত্বের ক্ষেত্রগুলো সম্প্রসারণের বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় করেন তারা। এছাড়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, বিভিন্ন প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ বৈঠকে বাংলাদেশ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যে অংশীদারত্ব এবং যে সম্পর্ক রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ আগামী দিনের যেসব প্রকল্প নিতে যাচ্ছে, তাতে বিশ্বব্যাংকের অংশীদারত্ব কাঠামোর মধ্যে আমরা কী কী করতে পারি, সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’
উদ্বোধনী বক্তব্যে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে বৈশ্বিক সমস্যাগুলো সমাধানে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিশ্বের বিভাজনের রেখাগুলো ক্রমেই প্রশস্ত হচ্ছে।’ ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জলবায়ু সংকট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। ভবিষ্যৎকে বিভক্তি, লেনদেননির্ভরতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের দিকে এগিয়ে যেতে না দিয়ে বরং পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এবং ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রযুক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে টেকসই একটি বিশ্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান জাতিসংঘ মহাসচিব।
এদিন অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি নির্বাচনের ঠিক পরই আমরা ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি করব। কারণ তাদের জন্য চুক্তি না করার কোনো অর্থ হয় না।’ ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেয়া হবে না বলে আবারো হুঁশিয়ারি দেন তিনি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গে ট্রাম্প জানান, যুদ্ধ বন্ধে মস্কো ও কিয়েভের নেতাদের সঙ্গে তার প্রশাসন ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী, তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলকে বহনকারী টার্কিশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট স্থানীয় সময় সোমবার বিকাল ৬টা ২০ মিনিটে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি এ তথ্য জানান।
বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা শেষে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে প্রধানমন্ত্রীকে ‘হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক’ হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। নিউইয়র্ক সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ হোটেলেই অবস্থান করবেন। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে বিএনপি নেতাকর্মী ও প্রবাসী বাংলাদেশীরা ‘হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক’ হোটেলের সামনে ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন হাতে মিছিল এবং স্লোগান দিয়ে তাকে স্বাগত জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রীও হাসিমুখে হাত নেড়ে নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছার জবাব দেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলে তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান ছাড়াও সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও শামা ওবায়েদ ইসলাম, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক।
সফরসূচি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী আজ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধির সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে মতবিনিময় করবেন। তিনি রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের সাইড ইভেন্টে অংশগ্রহণ করবেন। এছাড়া ‘জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায়সংগত রূপান্তর’ শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ের আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন। তিনি এদিন ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেনকোভিচের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বোয়িং গ্লোবালের প্রেসিডেন্ট ড. ব্রেন্ডন নেলসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন।
আগামীকাল প্রধানমন্ত্রী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকিবিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের সভায় প্রারম্ভিক বক্তব্য দেবেন। এরপর তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। এছাড়া মাতৃ ও নবজাতকের প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু রোধসংক্রান্ত উচ্চ পর্যায়ের অনুষ্ঠানে প্রারম্ভিক বক্তব্য দেবেন। তিনি এদিন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গেও বৈঠক করবেন। ওইদিন নিউইয়র্ক সময় বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ দেয়ার কথা রয়েছে। তবে সময় পরিবর্তন হতে পারে। সরকারপ্রধান হিসেবে এটিই হবে জাতিসংঘে তার প্রথম ভাষণ। তিনি বাংলায় বক্তব্য দেবেন। রাতে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে নৈশভোজে অংশ নেবেন।
২৫ সেপ্টেম্বর জেপি মরগান হেডকোয়ার্টার্সে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি এদিন কুয়েতের যুবরাজ শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন এবং ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট প্রিন্স জাইদ আল হুসেইনের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন। পরে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। এদিনই নিউইয়র্ক সময় রাত ১১টায় এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দুবাই হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন। তিনি ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পৌঁছবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
বাবা-মায়ের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে অংশগ্রহণ অনন্য নজির স্থাপন করেছে। প্রধানমন্ত্রীর এ সফর আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতিতে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।