কমেছে বৈদেশিক অনুদান

নিজস্ব আয়ে ভূমিকা রাখছে আইসিডিডিআর,বির ল্যাব সেবা

আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আইসিডিডিআর,বির তহবিলের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল দাতাদের অনুদান, ৬ কোটি ৮০ লাখ ৫২ হাজার ডলার, যা ওই বছর তাদের মোট আয়ের প্রায় ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

গবেষণা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক কার্যক্রমের জন্য দেশ-বিদেশে পরিচিতি রয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি)। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম মূলত বৈদেশিক অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। তবে গুরুত্বপূর্ণ দাতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির অর্থায়ন স্থগিত হওয়ার পর থেকে আইসিডিডিআর,বি তহবিল সংকটে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সংস্থাটির নিজস্ব ল্যাবরেটরি সেবা থেকে আসা আয় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়ক ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি তাদের ল্যাব সেবা থেকে আয় করেছে ৫৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার বা ৬৮ কোটি ৩২ লাখ ৪০ হাজার টাকা (১১৬ টাকা বিনিময় হারে)। এ আয় প্রতিষ্ঠানটির ওই বছরের মোট ৭ কোটি ৭৭ লাখ ২৪ হাজার ডলার রাজস্বের প্রায় ৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আইসিডিডিআর,বির তহবিলের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল দাতাদের অনুদান, ৬ কোটি ৮০ লাখ ৫২ হাজার ডলার, যা ওই বছর তাদের মোট আয়ের প্রায় ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বাকি অর্থ এসেছে ল্যাব সেবা ও অন্যান্য খাত থেকে। ২০২৩ সালে ল্যাব সেবা থেকে আয় হয়েছিল ৫৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরে এ খাতের আয় বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।

ল্যাব সেবা থেকে নিজস্ব আয় বাড়লেও আইসিডিডিআর,বির সামগ্রিক কার্যক্রম এখনো ব্যাপকভাবে বৈদেশিক অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় একক দাতা ছিল ইউএসএআইডি। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি ইউএসএআইডির কাছ থেকে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৫১ হাজার ৭১৫ ডলার অনুদান পেয়েছিল। ওই বছর দাতাদের কাছ থেকে পাওয়া অনুদানের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই এসেছিল ইউএসএআইডি থেকে।

পরবর্তী সময়ে অর্থায়ন স্থগিত হওয়ার প্রভাব পড়ে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা ও প্রকল্প কার্যক্রমে। ২০২৫ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে ইউএসএআইডির অর্থায়ননির্ভর বিভিন্ন প্রকল্পের সহস্রাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুতির চিঠি দেয়া হয়েছিল। তাদের বড় অংশ যক্ষ্মাসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করতেন।

আইসিডিডিআর,বির ল্যাব সেবা বর্তমানে ঢাকার পাঁচটি কেন্দ্র ও তিনটি বুথের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। কেন্দ্রগুলো রয়েছে মহাখালী, ধানমন্ডি, উত্তরা, মিরপুর ও মতিঝিলে। আর বুথ রয়েছে নিকেতন, বারিধারা ও গুলশানে। প্রতিষ্ঠানটির ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরিতে ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট্রি, হেমাটোলজি ও ক্যান্সার বায়োলজি, ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজি, মলিকিউলার ডায়াগনস্টিকস এবং ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিসহ বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করা হয়। আইসিডিডিআর,বির তথ্য অনুযায়ী, তাদের ল্যাবরেটরিগুলো আন্তর্জাতিক আইএনও ১৫১৮৯ ও আইএসও ১৫১৯০ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।

ল্যাব সেবা আইসিডিডিআর,বির জন্য জনসেবামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি নিজস্ব আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ল্যাব সেবা বাণিজ্যিক মুনাফার উদ্দেশ্যে পরিচালিত নয়। বরং আন্তর্জাতিক মানের রোগ নির্ণয় ও ল্যাব সেবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থায়িত্বে কিছুটা সহায়তা করাই এর উদ্দেশ্য।

জানা যায়, ১৯৮০-এর দশকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষের জন্য ল্যাব সেবা উন্মুক্ত করা হয়। আগে এ সেবা মূলত গবেষণা কার্যক্রম এবং বিদেশী কর্মীদের জন্য সীমিত ছিল। বর্তমানে সাধারণ মানুষ ও রোগীরা এসব সেবা নিতে পারছেন।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের দাবি, ল্যাব সেবা থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ আইসিডিডিআর,বির অন্যান্য জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমকে টেকসই রাখতে সহায়তা করে। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটির হাসপাতালগুলোয় দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা কার্যক্রমে এর পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে।

আইসিডিডিআর,বির ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সার্ভিসেস বিভাগের প্রধান ডা. মো. ফজলুল কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে ঢাকায় আমাদের পাঁচটি নমুনা সংগ্রহ কেন্দ্র ও তিনটি সংগ্রহ বুথের কার্যক্রম চলছে। এগুলোর একমাত্র লক্ষ্য সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় বিশ্বমানের, নির্ভুল ও সাশ্রয়ী রোগনির্ণয় সেবা পৌঁছে দেয়া। আইসিডিডিআর,বি একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। “‍আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ আইন, ২০২২”-এর অধীনে ল্যাবরেটরি পরিচালনা ও সেবামূল্য আদায়ের বৈধ সুযোগ রয়েছে। এ আয় দিয়ে আমরা ২০২৫ সালে ঢাকা, মতলব ও টেকনাফের তিনটি হাসপাতালে বছরে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার দরিদ্র রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়ে থাকি। অর্থাৎ আমাদের কাছ থেকে সেবা নেয়া প্রতিটি রোগী পরোক্ষভাবে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোয় অংশীদার হচ্ছেন।’

আরও