ডিজিটাল নিবন্ধনে বন্ধ হবে জাল সনদে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ -আইনমন্ত্রী

আইন ও বিচার বিভাগের আওতায় বাস্তবায়নাধীন এ উদ্যোগে প্রাথমিকভাবে দেশের ১০টি জেলার ১০টি উপজেলার ১০২টি ইউনিয়নে পাইলটিং ভিত্তিতে অনলাইন বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তির আওতায় অনলাইন বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু হলে জাল জন্মসনদ তৈরি করে বাল্যবিবাহ, অননুমোদিত বহুবিবাহ এবং বিয়ে-সংক্রান্ত প্রতারণার কোনো সুযোগ থাকবে না বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

তিনি বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধন ডেটাবেজের সঙ্গে সরাসরি আন্তঃসংযোগ থাকায় এক ক্লিকেই ব্যক্তি-সংক্রান্ত সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হবে। ফলে ভুয়া কাগজপত্র বা জাল জন্মসনদ বানিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে কিংবা প্রথম স্ত্রীর অজান্তে গোপন বহুবিবাহ পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হবে।’

গতকাল সচিবালয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় আইন ও বিচার বিভাগ এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ব্র্যাক’-এর মধ্যে ‘সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস: বিবাহ ও তালাক নিবন্ধনের আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়।

অনুষ্ঠানে আইন ও বিচার বিভাগের পক্ষে প্রকল্প পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. আজিজুল হক এবং ব্র্যাকের পক্ষে সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচির (সেলপ) পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা।

আইন ও বিচার বিভাগের আওতায় বাস্তবায়নাধীন এ উদ্যোগে প্রাথমিকভাবে দেশের ১০টি জেলার ১০টি উপজেলার ১০২টি ইউনিয়নে পাইলটিং ভিত্তিতে অনলাইন বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে।

নির্বাচিত ১০টি উপজেলা হলো—গাজীপুরের কালিগঞ্জ, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, শেরপুরের ঝিনাইগাতী, কুড়িগ্রাম সদর, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, নড়াইল সদর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা, সিলেট সদর, কক্সবাজারের চকরিয়া ও কিশোরগঞ্জ সদর।

প্রকল্পের আওতায় জাতীয় ডেটা সেন্টারে তথ্যের নিরাপত্তা ও সরকারি একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক পর্যায়ে নারীদের বৈবাহিক অধিকার ও আইনি সুরক্ষায় কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে ব্র্যাকের। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিকাহ রেজিস্ট্রারদের (কাজী) কারিগরি প্রশিক্ষণ ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্র্যাককে যুক্ত করা হয়েছে। তবে সব ডেটা ও মূল নিয়ন্ত্রণ থাকবে সরকারের ন্যাশনাল ডেটা সেন্টারেই।

বিচার বিভাগের নানামুখী সংস্কারের চিত্র তুলে ধরে আইনমন্ত্রী আরো জানান, উদ্ভাবনী পদক্ষেপ ও প্রাতিষ্ঠানিক লিগ্যাল এইড কর্মসূচি চালুর ফলে মামলা ফাইলিংয়ের চাপ কমার পাশাপাশি মানিকগঞ্জের মতো জেলায় বিকল্প উপায়ে ৫০ শতাংশ পুরনো মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া ঝিনাইদহ মডেলে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে দ্রুত ডোপ টেস্ট ও বিচার প্রক্রিয়ায় মাদকের তৎপরতা দৃশ্যমানভাবে কমে এসেছে।

অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচির পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব বলেন, ‘এনআইডি ও জন্মসনদ ডিজিটাল হওয়ায় জালিয়াতি কমলেও বিয়ের ডিজিটাল সুবিধা না থাকায় নকল রেজিস্ট্রি ও ভুয়া সনদের মাধ্যমে বাল্যবিবাহের প্র্যাকটিস চলছিল। এই ডিজিটাল ইন্টিগ্রেশন ও ক্রস-চেকিংয়ের ফলে তা বন্ধ হবে।’ তিনি বাল্যবিবাহ রোধে বিয়ের বয়স প্রমাণের ক্ষেত্রে এনআইডি বা জন্মসনদ বাধ্যতামূলক করা, সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদের জন্মনিবন্ধন সার্ভারগুলোর অ্যালাইনমেন্ট জোরদার করা, পেছনের তারিখে বিয়ে রেজিস্ট্রি বা ডুপ্লিকেট খাতা রাখা কাজীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর তাগিদ দেন।

সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এরই মধ্যে সফটওয়্যার তৈরির ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন ডেটাবেজের সঙ্গে এপিআই সংযুক্তির পাশাপাশি পেমেন্ট গেটওয়ে যুক্ত করা হয়েছে।

নির্ধারিত এলাকায় নিকাহ রেজিস্ট্রারদের প্রশিক্ষণ ও প্রচার কার্যক্রম শেষে আগামী ছয় মাসের মধ্যে মাঠ পর্যায়ে এ প্রযুক্তি সেবা উন্মুক্ত করা হবে। এ সমঝোতা স্মারকটি ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আইন ও বিচার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এসএম এরশাদুল আলম, মো. খাদেম উল কায়েসসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ব্র্যাকের প্রতিনিধিরা।

আরও