বেড়েছে যানজট, ঘটছে দুর্ঘটনা

তিন যুগ ধরে বন্ধ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, রাজবাড়ীতে যাত্রী ওঠানো-নামানো হয় প্রধান সড়কে

দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে টার্মিনালের ভবন, নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান আসবাবপত্র।

প্রায় তিন যুগ ধরে অচল পড়ে আছে রাজবাড়ী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে টার্মিনালের ভবন, নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান আসবাবপত্র। সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও টার্মিনালটি চালু না করায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে যাত্রী ও চালকদের মধ্যে। বর্তমানে রাজবাড়ীর প্রধান সড়কের ওপর বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো হচ্ছে। বড়পুল ও নতুনবাজার এলাকা টার্মিনাল হিসেবে ব্যবহার করছেন বাসচালকরা। ফলে সড়কে যানজট ও ছোট-বড় দুর্ঘটনা এখন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। চালকদের মতে, টার্মিনালটি সচল হলে সাধারণ যাত্রী ও যানবাহনচালক উভয়েই উপকৃত হবে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সমন্বয়হীনতার কারণেই দীর্ঘকাল ধরে চালু করা সম্ভব হয়নি গুরুত্বপূর্ণ এ টার্মিনাল।

রাজবাড়ী জেলা পরিষদ ও পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে শহরের শ্রীপুর এলাকায় ৪ দশমিক ১৩ একর জমির ওপর রাজবাড়ী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল নির্মিত হয়। জেলা পরিষদের বাস্তবায়নে এ প্রকল্পে মোট ব্যয় হয়েছিল ২ কোটি ৭৪ লাখ ৫০ হাজার ৩৮৫ টাকা। ১৯৯৪ সালের ১৯ এপ্রিল তৎকালীন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী জাহানারা বেগম এ টার্মিনালের উদ্বোধন করেন। কিন্তু উদ্বোধনের কয়েক মাস পরই এটি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৫ সালের ২ এপ্রিলের এক প্রজ্ঞাপনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হস্তান্তর করে জেলা পরিষদ। চুক্তি অনুযায়ী প্রথম পাঁচ বছর ১ লাখ টাকা করে ও পরবর্তী প্রতি বছর ২ লাখ টাকা করে কিস্তি পরিশোধের কথা ছিল। সময়মতো এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়ায় আজও পৌরসভার নামে টার্মিনালটির নামজারি করা সম্ভব হয়নি।

জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২২ জুন রাজবাড়ী জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ছয় বছরের বকেয়া কিস্তির ১২ লাখ টাকা চেয়ে পত্র পাঠান। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাজবাড়ী পৌরসভার প্রশাসক ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরের বকেয়া ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। তবে ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত দুই বছরের কিস্তির ৪ লাখ টাকা এখনো বকেয়া রয়েছে। ২০০১ সাল থেকে রাজবাড়ী পৌরসভা টার্মিনালটি ইজারা দিয়ে আসছে। এছাড়া একই বছর থেকে ব্যবসার জন্য ৯৪টি প্লট মাসিক ভাড়ার ভিত্তিতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

উদ্বোধনের পর ২০০০ সালের ১ মার্চ থেকে কিছুদিনের জন্য বাস টার্মিনালটি চালু রাখা হয়। কিন্তু কিছুদিন পর ফের যাত্রী চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ১/১১-এর সময়কালে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে টার্মিনালটি পুনরায় পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হয়েছিল। তবে তাও স্থায়ী হয়নি। কিছুদিন পর আবার যাত্রী চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। টানা ৩২ বছর ধরে টার্মিনালটি বন্ধ থাকায় কোনো সুফল পাচ্ছে না রাজবাড়ীবাসী। অবহেলা আর অযত্নে নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার সরকারি সম্পদ।

বড়পুল এলাকার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট তোসলিম আহম্মেদ বলেন, ‘রাজবাড়ীতে এত সুন্দর একটি টার্মিনাল আছে, অথচ তা ব্যবহার হয় না। বিষয়টা দুঃখজনক। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের জোরালো পদক্ষেপ নেয়া উচিত।’ তিনি আরো বলেন, ‘রাজবাড়ী কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কের ওপর শহরের বড়পুল এলাকায় বাসে যাত্রী ওঠানো ও নামানো হয়। এ স্থান থেকে একদিকে ঢাকায় যাওয়ার সড়ক, অন্যদিকে রাজবাড়ী আর বিপরীত দিকে কুষ্টিয়া। যেখানে রিকশা, মাহেন্দ্র, অটোর ব্যস্ততা বেশি। বড়পুল এলাকায় অস্থায়ী টার্মিনাল বানানোতে মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটছে।’

এদিকে রাজবাড়ী-কুষ্টিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কে বেপরোয়া গতি, চালকের সহকারী দিয়ে যানবাহন চালানো ও ঝুঁকিপূর্ণ মোড় থাকার কারণে বেড়েই চলেছে সড়ক দুর্ঘটনা। হাইওয়ে পুলিশের তথ্যমতে, গত দেড় বছরে সড়কটিতে ৬৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে মারা গেছেন ৩৯ জন। আহত হয়েছেন অন্তত ১১৫ জন।

রাজবাড়ী শহরের ভবানীপুর এলাকার বাসিন্দা খান মো. জহুরুল হক বলেন, ‘নতুন বাজার এলাকায় মূল রাস্তার ওপর বাসচালকরা টার্মিনাল তৈরি করেছে। এখানে সব সময় বাস দাঁড়িয়ে থাকে। আবার দাঁড়িয়ে থাকা বাসকে ওভারটেক করতে গিয়ে প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটছে। অথচ এ ব্যাপারে কারো কোনো নজর নেই।’ অচিরেই এগুলো বন্ধ করে শহরের শ্রীপুর টার্মিনালটি চালু করার দাবি জানান তিনি।

রাজবাড়ী পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহা. রবিউল হক বলেন,"‘জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, পৌরসভা ও বাস মালিক সমিতির সমন্বিত প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতা থাকলে টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল করা সম্ভব। টার্মিনালের সবকিছু ইজারা দেয়া আছে, কেবল বাস থামছে না—বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’

রাজবাড়ী জেলা পরিষদের প্রশাসক আব্দুস সালাম মিয়া বলেন,"‘সব জটিলতা কাটিয়ে রাজবাড়ীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি আবার চালু হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। এতে যাত্রী, চালক ও টার্মিনালের ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। তেমনি অস্থায়ী টার্মিনালকে কেন্দ্র করে দুর্ঘটনাও কমবে।’

আরও