ইতালির স্বপ্ন দেখিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে বন্দি, নিঃস্ব চুয়াডাঙ্গার পাঁচ পরিবার

১০ মাসের বন্দিজীবন, অমানুষিক নির্যাতন আর মুক্তিপণের নামে কোটি টাকার বেশি আদায়। জীবন নিয়ে দেশে ফিরলেও জমি, গবাদি পশু ও সঞ্চয় হারিয়ে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিন কাটছে পাঁচ পরিবারের।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিমতলা গ্রামের চায়ের দোকানি আসাদুল ওরফে আপানুরের ছেলে মোহাম্মদ আলী হাউস প্রবাসে থাকার সুবাদে এই পরিবারগুলোকে ফাঁদে ফেলে। ইতালিতে গিয়ে মাসে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা আয়ের লোভনীয় প্রস্তাব দেয় সে। পরিচিত লোক হওয়ায় গ্রামের মানুষজন তাকে অবিশ্বাস করতে পারেননি। এক্ষেত্রে অর্ধেক টাকা আগে এবং বাকি অর্থ ইতালিতে পৌঁছানোর পর দেয়ার শর্তে তারা রাজি হন। কিন্তু সরাসরি ইতালি নেয়ার বদলে কয়েকটি দেশ ঘুরিয়ে তাদের পাঠানো হয় লিবিয়ায়।

ইতালিতে গিয়ে মাসে চার-পাঁচ লাখ টাকা আয় করবেন, পরিবারের অভাব ঘুচবে—এমন স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন চুয়াডাঙ্গার পাঁচজন। কিন্তু ইউরোপে পৌঁছানোর বদলে তাদের যেতে হয় লিবিয়ায়। সেখানে বন্দি করে চালানো হয় নির্যাতন, পরিবারের কাছ থেকে দফায় দফায় আদায় করা হয় টাকা। প্রায় ১০ মাস পর দেশে ফিরেছেন তারা। তবে হারিয়েছেন সারা জীবনের সঞ্চয়, গবাদি পশু ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সামর্থ্য।

আলমডাঙ্গা উপজেলার ফুলবগাদী, নিমতলা ও বড়গাংনী গ্রামের পাঁচ বাসিন্দা এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তারা হলেন—ফুলবগাদী গ্রামের জাহিদ হাসান, কামরুল হাসান ও জাহিদুল ইসলাম, নিমতলা গ্রামের আলিফ এবং বড়গাংনী গ্রামের ছাব্বির আলী। তাদের বয়স ২১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। বিদেশে ভালো আয়ের আশায় তারা জমি বন্ধক রেখেছেন, গরু-ভেড়া বিক্রি করেছেন, স্ত্রীর গয়না বন্ধক বা বিক্রি করেছেন। কেউ আবার ঋণ নিয়েছেন এনজিও থেকে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিমতলা গ্রামের চায়ের দোকানি আসাদুল ওরফে আপানুরের ছেলে মোহাম্মদ আলী হাউস প্রবাসে থাকার সুবাদে এই পরিবারগুলোকে ফাঁদে ফেলে। ইতালিতে গিয়ে মাসে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা আয়ের লোভনীয় প্রস্তাব দেয় সে। পূর্বপরিচিত হওয়ায় গ্রামের মানুষজন তাকে অবিশ্বাস করতে পারেননি। এক্ষেত্রে অর্ধেক টাকা আগে এবং বাকি অর্থ ইতালিতে পৌঁছানোর পর দেয়ার শর্তে তারা রাজি হন। কিন্তু সরাসরি ইতালি নেয়ার বদলে কয়েকটি দেশ ঘুরিয়ে তাদের পাঠানো হয় লিবিয়ায়।

সেখানে পৌঁছানোর পর কেড়ে নেয়া হয় পাসপোর্ট, মুঠোফোন ও ভিসার কাগজপত্র। আরো ৫৭ জনের সঙ্গে একটি ঘরে বন্দি রাখা হয় তাদের। পরে আলাদা ঘরে নিয়ে পরিবারের সদস্যদের ফোন করে অতিরিক্ত টাকা চাইতে বাধ্য করা হতো। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে চলত শারীরিক নির্যাতন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এভাবে বিভিন্ন দফায় তাদের কাছ থেকে মোট ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আদায় করা হয়।

বিপুল অঙ্কের এ অর্থ দিয়েও মেলেনি ইতালির পথ। একপর্যায়ে টিউব দিয়ে তৈরি নৌকায় সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। নৌকাটি ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলে কোস্ট গার্ড তাদের উদ্ধার করে। পরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় আটক হয়ে বিদেশী কারাগারেও থাকতে হয় তাদের। সেখান থেকে মুক্তি পেতেও অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়েছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা। শেষ পর্যন্ত অন্য এক দালালের সহায়তা ও প্রশাসনিক তৎপরতায় দেশে ফেরেন তারা।

ফুলবগাদী গ্রামের জাহিদ হাসানের বয়স ৫০ বছর। একসময় তার ৩০০ ভেড়ার খামার ও জমি চাষের ট্রাক্টর ছিল। ১২ বছর কুয়েতে কাটিয়ে দেশে ফিরে স্বচ্ছল জীবন গড়েছিলেন তিনি। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ইতালি যাওয়ার আশায় দালালদের হাতে তুলে দেন ২৯ লাখ টাকা। এখন নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে দিন কাটছে তার।

একই গ্রামের কামরুল ইসলামের ছিল ৬০ ভেড়ার খামার ও ১২টি গরু। সব বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে এবং জমি বর্গা দিয়ে ৩২ লাখ টাকা দিয়েও ইতালিতে পৌঁছাতে পারেননি তিনি। ২১ বছর বয়সী জাহিদুল ইসলামও গরু-ছাগল বিক্রি করে ৩৪ লাখ টাকা হারিয়েছেন।

নিমতলার আলিফ সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে ইতালি যেতে চেয়েছিলেন। এখন ৩০ লাখ টাকা হারানোর পাশাপাশি চাকরিটিও নেই। আর দর্শনা সরকারি কলেজের ইসলামী ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছাব্বির আলী পড়াশোনা ছেড়ে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করে হারিয়েছেন ২২ লাখ টাকা।

দেশে ফিরে টাকা ফেরত চাইলে উল্টো হুমকি ও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে। তবে অভিযুক্ত দালালের বাবা আসাদুল দাবি করেছেন, তার ছেলে কোনো অন্যায় করেনি, বরং ভুক্তভোগীরা সাগরের ভয় পেয়ে নিজেরা পালিয়ে এসেছে।

আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুর আক্তার বলেন, বিদেশ যেতে আগ্রহীদের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মাধ্যমে দক্ষ হয়ে বৈধ পথে যাওয়ার বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো প্রশাসনের কাছে এলে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

নিঃস্ব হয়ে ফেরা এই পাঁচ পরিবার এখন মাথার ওপর ঋণের বোঝা নিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। দেশের মাটিতে জীবন ফিরে পেলেও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সব সামর্থ্য হারিয়ে তারা আজ স্তব্ধ।

আরও