ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন থেকে ফসল বাঁচাতে কাটা হচ্ছে কাঁচা-পাকা ধান, নদীগর্ভে ভিটেমাটি

স্থানীয়দের অভিযোগ, পাউবো থেকে ছয়-সাত মাস আগে ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ফেললেও সঠিক তদারকি ও স্থায়ী ব্যবস্থার অভাবে সেগুলো এখন নদীতে চলে গেছে। ফলে নদীর পাড় কোনো বাধা ছাড়াই দ্রুত ভেঙে পড়ছে।

কুড়িগ্রামের রৌমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন থামছেই না। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ফেলা জিও ব্যাগও নদীতে চলে গেছে। ফলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্মুক্ত হওয়ায় একের পর এক নদীতে চলে যাচ্ছে তীরবর্তী মানুষের ভিটেমাটি, বাড়িঘর ও কয়েক বিঘা ফসলি জমি। স্থানীয়রা জানান, গত এক বছরে সাড়ে পাঁচ শতাধিক পরিবার গৃহহীন হয়েছে। আর এক সপ্তাহেই নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ১৭-১৮টি পরিবারের বাড়িঘর। পাশাপাশি ধান ও ভুট্টাখেতসহ অন্যান্য ফসলও ভাঙনের মুখে পড়েছে। ফসল রক্ষায় বাধ্য হয়ে তড়িঘড়ি করে কাঁচা-পাকা ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন কৃষকরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পাউবো থেকে ছয়-সাত মাস আগে ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ফেললেও সঠিক তদারকি ও স্থায়ী ব্যবস্থার অভাবে সেগুলো এখন নদীতে চলে গেছে। ফলে নদীর পাড় কোনো বাধা ছাড়াই দ্রুত ভেঙে পড়ছে।

ভাঙনকবলিত চর শৌলমারী ইউনিয়ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ইউনিয়নের সুখেরবাতি ও খেদাইমারী গ্রামে এক সপ্তাহে ১৭-১৮টি পরিবারের ভিটেমাটি নদীতে বিলীন হয়েছে। বসতবাড়ির পাশাপাশি কয়েক বিঘা কাঁচা-পাকা আমন ধান, ভুট্টা ও শাকসবজির খেত নদীতে চলে গেছে।

ভাঙন এতটাই তীব্র যে একদিকে নদীর পাড় ধসে পড়ছে, অন্যদিকে পাড়ের কাছে ঝুঁকিতে থাকা কাঁচা-পাকা ধান কাটছেন কৃষকরা। এমন ধান কাটার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। গত সোমবার সুখেরবাতি চরে কৃষকদের নিরুপায় হয়ে ধান কাটার ছবিও ভাইরাল হয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত এক বছরে এ এলাকায় সাড়ে ৫ শতাধিক পরিবার ভাঙনের শিকার হয়ে গৃহহীন হয়েছে। চর শৌলমারী ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আনছার আলী তুহিন জানান, গত এক সপ্তাহে তার ওয়ার্ডে সাতটি এবং ৮ নং ওয়ার্ডের খেদাইমারী গ্রামে ১০টি বাড়ি নদীতে চলে গেছে।

ভাঙনে সর্বস্ব হারানোদের মধ্যে সুখেরবাতি এলাকার দেলোয়ার, নজরুল ইসলাম, রুপচান, আয়শা খাতুন, ছোবহান ও লালু শেখ রয়েছেন। অন্যদিকে ৮ নং ওয়ার্ডে বাড়িঘর হারিয়েছেন কপিল উদ্দিন, আফছার আলী, ফাতেম, কদম আলী, আব্দুল খালেক, মহর উদ্দিন, সিরাজুল, জমসের আলী ও আক্কাস আলী। এছাড়া চরে নতুন বাড়ি করা আরো দুই ব্যক্তি বসতভিটা হারিয়েছেন।

ইউপি সদস্য আনছার আলী তুহিন জানান, সুখেরবাতি এলাকার মৃত মহেজ মোল্লার ছেলে ইউনুছ মোল্লার নদীর তীরবর্তী দেড় বিঘা আমন ধানের জমির পুরোটাই নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া মৃত ওসমান প্রামাণিকের ছেলে ছবুর প্রামাণিকের চার বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘা আমন খেত নদীতে চলে গেছে। একই সঙ্গে ৮ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা জমসের আলীর ভিটাবাড়িসহ তিন বিঘা ধানি জমিও নদীতে চলে গেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত জমসের আলী অভিযোগের সুরে বলেন, ‘আমার তিন বিঘা জমিসহ বসতভিটা চোখের সামনে নদীতে চলে গেছে। তবু পাউবো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, পাউবো ছয়-সাত মাস আগে কিছু জিও ব্যাগ ফেলেছিল। কিন্তু তদারকি ও স্থায়ী ব্যবস্থার অভাবে সেগুলোও নদীতে চলে গেছে। বর্তমানে নিঃস্ব পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে ও অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।

রৌমারীর চর শৌলমারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান একেএইচএম সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমার সুখেরবাতি, খেদাইমারী ও সোনাপুর ওয়ার্ড তিনটিতে নদীভাঙন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এখানে ব্লকের কাজ না করায় জিও ব্যাগ দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না। পাউবো থেকে যা জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে, সেগুলো স্রোতে নদীতে চলে গেছে। এখন উন্মুক্ত হয়ে গেছে নদীর পাড়। ফলে দ্রুত ফসলি জমি, গাছপালা ও বাড়িঘর ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। আগে সরকারিভাবে ভাঙনকবলিতদের আর্থিকভাবে সহায়তা দেয়া হলেও এখন বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অসহায় গরিব মানুষের জন্য নতুন করে মাথা গোঁজা কঠিন হয়ে পড়েছে।’

এ ব্যাপারে কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘জরুরি কাজের জন্য এখন কোনো বরাদ্দ নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমরা স্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকাতে একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠিয়েছি। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করছে।’

আরও