জ্বালানি ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি হওয়ায় দুই বছরের ব্যবধানে রকমভেদে রঙ ও পেরেকসহ বিভিন্ন সরঞ্জামের দাম ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এমনকি গত ছয় মাসের ব্যবধানে দুই দফায় বেড়েছে রঙের দাম। বাজারের এ অস্থিরতার কারণ হিসেবে জ্বালানি তেল, লোহা ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধিসহ বৈশ্বিক যুদ্ধাবস্থাকে দায়ী করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
গত ২০ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। আরো এক দফা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। বাজার পরিস্থিতির এ প্রভাব পড়ছে রঙ ও লোহার বাজারের কেনাবেচায়ও। যশোরের হার্ডওয়্যার বাজার ঘুরে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
যশোর শহরে ছোট-বড় মিলিয়ে ২০০-এর বেশি হার্ডওয়্যার ও রঙের দোকান রয়েছে। এর মধ্যে যশোর হার্ডওয়্যার দোকান মালিক সমিতির সদস্য সংখ্যা ১২০। শহরের বিভিন্ন হার্ডওয়্যার দোকান ঘুরে দেখা গেছে, এখানে সাধারণ ডিসটেম্পার প্রতি গ্যালন (৩ দশমিক ৬৪ লিটার) ৫০০-৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছয় মাস আগে এ রঙের দাম ছিল ৪৫০-৬০০ টাকা। প্লাস্টিক পেইন্ট ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা গ্যালন দরে বিক্রি হচ্ছে। ছয় মাস আগে এ রঙ ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। রঙের কাজে ব্যবহৃত তারপিন (৪ লিটার) বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১০০ টাকায়, যা ছয় মাস আগে ছিল ৯৬০ টাকা।
ইমালশন রঙ, কোম্পানিভেদে এটি ‘ওয়েদার কোট’ নামেও পরিচিত। এ রঙ প্রতি গ্যালন ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার এবং ১৮ লিটারের ড্রাম ৭ হাজার ৮০০-১০ হাজার টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে, যা আগে গ্যালন ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ এবং ড্রাম ৬-৯ হাজার টাকার মধ্যে ছিল। তবে কোম্পানি ও পেইন্টের কালারভেদে বাজারে দামেরও কিছু তারতম্য রয়েছে। যশোরের বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে বার্জার ও এশিয়ান পেইন্টের রঙ। এর বাইরে এলিট পেইন্ট, রক্সি, ডুলাক্সসহ আরো কয়েকটি কোম্পানির পণ্য রয়েছে।
যশোর শহরের চিত্রা মোড়ের কালাম হার্ডওয়্যার স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. আবুল কালাম জানান, গত ছয় মাসে রঙ-তারপিনের দাম দুই দফায় বেড়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে কোম্পানিগুলো রঙের দাম বাড়িয়েছে। কোনো কোনো রঙের দাম ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। বেচাকেনা অনেক কমে গেছে।
দীর্ঘদিন ধরে রঙের কাজ করা শহরের শংকরপুর এলাকার রঙমিস্ত্রি মোহাম্মদ আলী জানান, বর্ষা চলে গেলে রঙের কাজ বেশি হয়। সামনেই সে মৌসুম। কিন্তু জিনিসের দাম বেড়ে গেলে অনেকে কাজ করাতে চান না। ফলে বাজারও যেমন মন্দা হয়, তেমনি তারাও কাজের অভাবে পড়েন।
বাজারে রঙ ছাড়াও হার্ডওয়্যার পণ্যের মধ্যে পেরেক বা তারকাঁটা প্রতি কেজি ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যদিও কয়েক মাস আগে এ পেরেকের দাম কেজিতে ১৬০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। দুই বছর আগে পেরেকের দাম ৮০-৯০ টাকা কেজি ছিল। তার (রড বাঁধার কাজে ব্যবহৃত) প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ তারের দামও ১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। দুই বছর আগে এর দাম ছিল ১০০ টাকার নিচে। পাশাপাশি হার্ডওয়্যারের অন্যান্য সামগ্রী, যেমন দরজার কবজা, ছিটকিনি, হ্যাজবোল্টসহ প্রায় সব পণ্যেরই কমবেশি দাম বেড়েছে।
যশোরের হাটখোলা রোডের হার্ডওয়্যার পণ্য বিক্রেতা নিউ যশোর ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী অখিল রায় বলেন, ‘রডের দাম বাড়লে অনেক হার্ডওয়্যার পণ্য, বিশেষ করে পেরেক ও তারের দাম বেড়ে যায়। রডের দাম যখন ১০৮ টাকা কেজিতে পৌঁছেছিল, তখন পেরেক-তারের দাম ১৬০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছিল। এখন একটু কমেছে। হার্ডওয়্যারের অন্যান্য পণ্য যেগুলো বিদেশ থেকে আসে, সেগুলোর দাম ডলারের দামের ওপর নির্ভর করে। তবে সব পণ্যের দামই গড়ে ২০ টাকা হারে বেড়ে গেছে।’
যশোর হার্ডওয়্যার দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মানিক চন্দ্র কর জানান, গত ছয় মাসে দুই দফায় রঙের দাম বেড়েছে। সবশেষে গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে ফের জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। চলতি অক্টোবরে রঙের দাম আরো এক দফা বাড়ার আভাস রয়েছে। বড় কোম্পানিগুলো দাম বাড়ালে অন্যরাও দাম বাড়িয়ে দেয়।
তিনি আরো জানান, মূলত বর্ষা মৌসুম পার হলে কাজ বাড়ে। তখন রঙসহ হার্ডওয়্যার পণ্যের চাহিদাও বাড়ে। এখন এমনিতেই মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাজার পরিস্থিতি মন্দা। তার ওপর আবার দাম বাড়লে কী হবে, তা নিয়ে তারা শঙ্কায় রয়েছেন।