দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও আর্থিক খাতের উন্নতির জন্য অনেক সময় বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন প্যাকেজ ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এসব প্যাকেজ পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।
তিনি বলেন, আমাদের এখানে বেশকিছু স্টিমুলাস প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু সত্যিকারার্থে আমি যখন কাজ শুরু করি, তখন দেখলাম অনেক প্যাকেজ আছে, কিন্ত এর ব্যবহার হচ্ছে না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, যারা এটা পাওয়া উচিত, তারা জানেই না যে, এ ধরনের একটি প্যাকেজ রয়েছে।
আজ শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংক ইন্সটিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত 'ব্যাংকিং ও নৈতিকতা' শীর্ষক ২৩ তম নুরুল মতিন স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর মিরপুরে বিআইবিএম অডিটোরিয়ামে এ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়।
অনুষ্ঠানে গভর্নর বলেন, আমাদের ব্যাংকিংয়ে কিছু মৌলিক কাঠামোগত সমস্যা আছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদী ঋণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের দিকে চল্ব গেছে। আমরা এ কাঠামোগত সমস্যা দূর করার চেষ্টা করছি। দুটো বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ সংকটে পড়েছে, অভিজ্ঞ ব্যাংকার ও পুঁজিবাজারের লোকসহ তাদেরকে নিয়ে বসেছি। তাদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অংশটাকে পর্যায়ক্রমে পুঁজিবাজারে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছি।
গভর্নর বলেন, অনেকের ধারণা হয়েছে যে ৫ আগস্টের পরে লোক পরিবর্তন হয়েছে, কার্যক্রম আগের মতোই থাকবে। আমরা এ বার্তাটাও দেয়ার চেষ্টা করেছি যে, শুধু লোক পরিবর্তন হলে হবে না, আমাদের কাজেরও পরিবর্তন আনতে হবে। এর মধ্যে আমরা এক্সিট পলিসিও নতুন করে দিয়েছি।
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে ১৮ মাসের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে জানিয়ে গভর্নর বলেন, এনপিএল কমানোর জন্য আমরা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির দিকে যাচ্ছি। এজন্য ১৮ মাসের পরিকল্পনা আছে। প্রথম ধাপে পারস্পরিকভাবে নিষ্পত্তির মাধ্যমে এনপিএল কমানো হবে। এছাড়া ডিস্ট্রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন করছি এবং অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করছি, যাতে ৬ মাসের মধ্যেই আদালত থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে। এ দুটো আইন আগামী বছর থেকে প্রয়োগ করতে পারব।
ঋণের অর্থ যাতে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত না করা যায়, সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানান মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা জানি যে ফান্ড ডাইভার্ট করা হয়। এটা বন্ধ করার জন্য ঋণ ইউটিলাইজেশন অডিটের কথা চিন্তা করছি। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ঋণের পর আমরা সে ঋণ অডিট করব।
অনুষ্ঠানে ২৩তম নুরুল মতিন বক্তব্য দেন জাতীয় অধ্যাপক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. মাহবুব উল্লাহ। তিনি বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হলো ঋণের অর্থ বারবার অর্থনীতিতে ঘুরে ফিরে ব্যবহার হওয়া। ব্যাংক আমানতকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে ঋণ দেয়, সেই ঋণের কিস্তি ও সুদ ফেরত এলে তা আবার নতুন ঋণ হিসেবে বিনিয়োগ করা হয়। কিন্তু খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকায় এই স্বাভাবিক চক্র বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমানতকারীদের অর্থের একটি বড় অংশ ঋণ হিসেবে বিতরণের পর তা সময়মতো ব্যাংকে ফিরে না আসায় ব্যাংকের তারল্য ও ঋণ বিতরণ সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলোকে আরো সতর্ক হতে হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, যেসব ব্যাংকের এখনো ঋণ দেয়ার সক্ষমতা রয়েছে, তারাও ঝুঁকি কমাতে নতুন ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। এর ফলে যোগ্য উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় কার্যকরী মূলধন এবং নতুন বিনিয়োগের জন্য ঋণ পেতে সমস্যায় পড়ছে। এর প্রভাব উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর পড়তে পারে। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ঋণ অনুমোদন ও আদায়ে সুশাসন, জবাবদিহিতা, নৈতিকতা এবং যথাযথ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
স্বাগত বক্তব্যে বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকিং ব্যবসা অন্য অনেক ব্যবসার তুলনায় ভিন্ন, কারণ ব্যাংক জনগণের আমানতের অর্থ ব্যবস্থাপনা করে এবং সেই অর্থ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড প্রবাহিত করে। তাই একজন ব্যাংকারের সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু একটি ব্যাংক বা একজন গ্রাহকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়ে।
ড. এজাজুল ইসলাম বলেন, নৈতিকতার ঘাটতি থেকেই অনেক সময় অনিয়ম, ঋণ অব্যবস্থাপনা, স্বার্থের সংঘাত এবং দুর্বল সুশাসনের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে ব্যাংকিং খাতে নৈতিকতা কোনো আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়; এটি ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া প্রয়োজন। পরিবর্তিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, নৈতিকতা, তথ্যের গোপনীয়তা, গ্রাহকের অধিকার এবং জবাবদিহিতার বিষয়গুলোও তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।