জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় বাংলাদেশের নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি শুধু লবণাক্ত পানি ও খাবার পানির সংকটেই সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিও। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ৪ হাজার ৬৯৩ নারীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের ৭৫ দশমিক ৪ শতাংশ মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার মানসিক চাপে রয়েছেন। একই সঙ্গে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ নারীর উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত হয়েছে। গবেষণায় খাবার পানিতে উচ্চ মাত্রার সোডিয়াম ও তীব্র মানসিক চাপ একসঙ্গে থাকলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি আরো বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
স্প্রিঙ্গার নেচার জার্নালে প্রকাশিত ‘উপকূলীয় বাংলাদেশের প্রজননক্ষম বয়সী নারীদের মধ্যে পানীয়জলের লবণাক্ততা ও মানসিক-সামাজিক চাপের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্মিলিত সম্পর্ক: জনসংখ্যাভিত্তিক একটি ক্রস সেকশনাল গবেষণা’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি গত আগস্টে প্রকাশিত হয়। এটি পরিচালনা করেছেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) গবেষক আশরাফুল আলম সিদ্দিকী ও মাহিন আল নাহিয়ান। গবেষণায় সহযোগিতা করেছে জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (নিপোর্ট)।
গবেষণার আওতায় উপকূলীয় সাত জেলার নয়টি উপজেলার ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এর মধ্যে ছয়টি উপজেলা ছিল উচ্চ লবণাক্ততাপ্রবণ এবং তিনটি নিম্ন লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকা। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী নারীদের রক্তচাপ সরাসরি পরিমাপের পাশাপাশি তাদের খাবার পানিতে সোডিয়ামের মাত্রা এবং মানসিক চাপের মাত্রাও নির্ধারণ করা হয়।
গবেষণায় অংশ নেয়া নারীদের গড় বয়স ছিল ৩৩ বছর। তাদের ৪৪ দশমিক ১ শতাংশের বয়স ৩৫ বছর বা তার বেশি। ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ নারী এমন পানি পান করেন, যাতে প্রতি লিটারে সোডিয়ামের মাত্রা ২ হাজার মিলিগ্রামের বেশি। এছাড়া ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ নারী উচ্চ লবণাক্ত এলাকার বাসিন্দা। গত ১০ বছরে ৭৬ দশমিক ৩ শতাংশ নারী অন্তত একটি বড় ধরনের জলবায়ুজনিত দুর্যোগের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। একই সময়ে জলবায়ুর কারণে ৫৮ দশমিক ৩ শতাংশ নারীর পরিবারের আয় কমেছে।
গবেষণায় মানসিক চাপের চিত্রও উদ্বেগজনক হিসেবে উঠে এসেছে। অংশগ্রহণকারী নারীদের ৪০ দশমিক ১ শতাংশ মাঝারি এবং ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ তীব্র মানসিক চাপে ছিলেন। অর্থাৎ মোট ৭৫ দশমিক ৪ শতাংশ নারী মাঝারি থেকে তীব্র মানসিক চাপে ছিলেন। একই সঙ্গে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ নারীর উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত হয়েছে। আর ১০ দশমিক ২ শতাংশ নারীর ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের পাশাপাশি মাঝারি থেকে তীব্র মানসিক চাপও ছিল।
মানসিক চাপের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের হারও বেড়েছে। যেসব নারীর কোনো মানসিক চাপ ছিল না, তাদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের হার ছিল ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ। মাঝারি মানসিক চাপে থাকা নারীদের ক্ষেত্রে এ হার বেড়ে ২৮ শতাংশ এবং তীব্র মানসিক চাপে থাকা নারীদের ক্ষেত্রে ২৯ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ মানসিক চাপ নেই এমন নারীদের তুলনায় মাঝারি ও তীব্র মানসিক চাপে থাকা নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের হার দ্বিগুণেরও বেশি ছিল।
গবেষকরা বয়স, শিক্ষা, আর্থিক অবস্থা, এলাকার লবণাক্ততা, দুর্যোগের অভিজ্ঞতা এবং আয় কমে যাওয়ার মতো বিষয় বিবেচনায় নেয়ার পরও মানসিক চাপ ও খাওয়ার পানির সোডিয়ামের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক পেয়েছেন। মানসিক চাপমুক্ত নারীদের তুলনায় মাঝারি মানসিক চাপে থাকা নারীদের উচ্চ রক্তচাপের সম্ভাবনা ১ দশমিক ৮৬ গুণ এবং তীব্র মানসিক চাপে থাকা নারীদের ১ দশমিক ৮৮ গুণ বেশি ছিল। একইভাবে খাওয়ার পানিতে প্রতি লিটারে সোডিয়ামের মাত্রা ১০০ মিলিগ্রাম বাড়লে উচ্চ রক্তচাপের সম্ভাবনা ১০ শতাংশ বেড়েছে।
খাওয়ার পানিতে উচ্চ মাত্রার সোডিয়াম ও তীব্র মানসিক চাপ একসঙ্গে থাকলে ঝুঁকি আরো বেড়েছে। যেসব নারীর খাওয়ার পানিতে প্রতি লিটারে ২ হাজার মিলিগ্রামের বেশি সোডিয়াম ছিল এবং একই সঙ্গে তারা তীব্র মানসিক চাপে ছিলেন, তাদের উচ্চ রক্তচাপের সম্ভাবনা কম সোডিয়ামযুক্ত পানি পান করা ও মানসিক চাপমুক্ত নারীদের তুলনায় ২ দশমিক ৪৫ গুণ বেশি ছিল।
উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ভূগর্ভস্থ ও অন্যান্য মিঠাপানির উৎসে প্রবেশ করায় খাবার পানিতে সোডিয়ামের মাত্রা বেড়ে যায়। খাদ্যে লবণের পরিমাণ মানুষ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও পানির মাধ্যমে সোডিয়াম গ্রহণ অনেকাংশেই অনিচ্ছাকৃত। ফলে এটি ব্যক্তিগত আচরণের চেয়ে পরিবেশগত ও অবকাঠামোগত সমস্যার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা, জীবিকা হারানোর আশঙ্কা ও আয় কমে যাওয়ার মতো দীর্ঘস্থায়ী চাপ। গবেষকদের মতে, এসব সংকট এককালীন দুর্যোগ হিসেবে শেষ হয়ে যায় না; বরং বারবার ফিরে আসা পরিবেশগত অনিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ ও বিষণ্নতা শরীরের স্ট্রেস সম্পর্কিত হরমোন ও স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রমে পরিবর্তন ঘটিয়ে রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে, যা উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
গবেষক মাহিন আল নাহিয়ান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উপকূলে ঝড়-ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগ মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেটি সবারই জানা। কিন্তু লবণাক্ততা ধীরে ধীরে সেখানকার নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য, রক্তচাপসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা বাড়াচ্ছে, তা নিয়ে গবেষণা খুবই কম। আমরা এ বিষয়গুলোই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, লবণাক্ত পানি পানের সঙ্গে নারীদের উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক রয়েছে। এসব সংকটের কারণে তাদের কী ধরনের স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন কিংবা বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে কী ধরনের সেবা যুক্ত করা দরকার, সেগুলোও তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আশা করছি, এর মাধ্যমে সরকার পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলায় শুধু উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও উচ্চ রক্তচাপ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সহায়তাও যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি নিরাপদ মিঠাপানির সরবরাহ বাড়ানো, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে পানি লবণমুক্ত করার মতো উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লবণাক্ত পানির লবণ নানাভাবে খাদ্যচক্রের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে, যা উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই লবণাক্ত পানির ব্যবহার কমিয়ে সুপেয় পানির সরবরাহ বাড়াতে হবে এবং উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। এজন্য উপকূলীয় এলাকার কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।’
উপকূলে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস দীর্ঘমেয়াদে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘অনেক পুরুষ গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে বাড়িতে থাকা নারীরা ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কায় বাড়তি মানসিক চাপে থাকেন। তাই এসব এলাকার স্বাস্থ্য কেন্দ্রে মানসিক কাউন্সেলর নিয়োগ, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং জেলেদের জীবন বীমার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।’