ছয় দশকে এত দীর্ঘ সময় শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ছিল না কুয়েটে

ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সংঘর্ষের জেরে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)।

ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সংঘর্ষের জেরে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয় খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)। এরপর প্রায় পাঁচ মাস অতিবাহিত হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নানামুখী আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে দুদফায় উপাচার্য পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ছয় দশকে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রমে এত দীর্ঘ সময় অচলাবস্থা আর দেখা যায়নি।

কুয়েটের যাত্রা শুরু ১৯৬৭ সালে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদের অধীনে খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (বিআইটি), খুলনায় রূপান্তর করা হয়। পরবর্তী সময় খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নামে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয় ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর।

কুয়েটের ০৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী টিএম জুবায়ের বাশার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতিকে কেন্দ্র করে কম-বেশি সংঘর্ষ হয়, এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয় কিছু সময় বন্ধও থাকে। আমাদের অধ্যয়নকালে ২০১২ সালে ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছিল। ওই সময় প্রায় এক মাস বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল। এর আগেও খুব বেশি জটিলতা হলে বিশ্ববিদ্যালয় সর্বোচ্চ এক থেকে দেড় মাস বন্ধ থাকত। তবে ২০১২ সালের পর এ রকম কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। এবার যেটি ঘটল সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ অবস্থা দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররাজনীতি বন্ধকে কেন্দ্র করে সাধারণ শিক্ষার্থী ও বহিরাগতদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সংঘর্ষে আহত হন অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী। ওইদিন রাতে উপাচার্যের বিরুদ্ধে হামলাকারীদের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগসহ পাঁচ দফা দাবি তোলেন শিক্ষার্থীরা। দাবি না মানায় ১৯ ফেব্রুয়ারি বেলা দেড়টার দিকে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ও একাডেমিক ভবনগুলোয় তালা ঝুলিয়ে দেন। এর আগে ১৮ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪টা থেকে কুয়েট উপাচার্যকে মেডিকেল সেন্টারে অবরুদ্ধ করা হয়। পরদিন বিকাল সোয়া ৫টার দিকে তিনি মুক্ত হন। অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় তিনি ১৯ ফেব্রুয়ারির জরুরি সিন্ডিকেট সভায় অনলাইনে যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি কুয়েটের শিক্ষার্থীরা ভিসির বাসভবনে তালা ঝুলিয়ে দেয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি দিনগত রাত ১১টার দিকে ভিসি বাসভবনে প্রবেশ করেন। এরপর শিক্ষার্থীরা ভিসিকে বাসভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা এবং শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়।

পরবর্তী সময় সংঘর্ষের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ঈদুল ফিতরের ছুটির পর ১৪ এপ্রিল সিন্ডিকেট সভায় ৩৭ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। ৩৭ জনকে বহিষ্কারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ভিসির পদত্যাগ দাবি করে ওইদিন থেকে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। দাবি আদায়ে ২১ এপ্রিল থেকে অনশন শুরু করেন ৩২ শিক্ষার্থী। কুয়েটের সংকট সমাধানে ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) একটি প্রতিনিধি দল এবং শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সিআর আবরার কুয়েটে যান। দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাসে তারা অনশন ভাঙেন। ওইদিন রাতেই কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাছুদ এবং উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে অপসারণের প্রক্রিয়া শুরুর কথা জানায় সরকার।

গত ১ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হযরত আলীকে কুয়েটের অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য পদে নিয়োগ দেয়। ৪ মে থেকে একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর কথা থাকলেও ক্লাসে যাননি শিক্ষকরা। ১৮ মে থেকে প্রশাসনিক কার্যক্রমও বর্জন করেন শিক্ষকরা। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয় শিক্ষকদের লাঞ্ছনায় জড়িতদের শাস্তি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত তারা ক্লাসে ফিরবেন না। ২২ মে অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য অধ্যাপক হযরত আলী পদত্যাগ করেন। এর প্রায় দুই মাস পর ২৪ জুলাই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক অধ্যাপক ড. মো. মাকসুদ হেলালীকে কুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তবে এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়নি।

প্রায় পাঁচ মাস ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় সেশনজটের শঙ্কায় রয়েছেন প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী। পাঁচ মাস পার হলেও শিক্ষকরা ক্লাসে না ফেরায় ২০ জুলাই ফাঁকা ক্লাসেই ফেরেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘‌আমাদের স্নাতক শেষ হওয়ার কথা ছিল মার্চে। মাত্র তিনটা পরীক্ষা বাকি। কিন্তু এই তিনটা পরীক্ষার জন্য আমরা পাঁচ মাস ধরে আটকে আছি। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এরই মধ্যে প্রায় সবাই পাস করে বেরিয়ে গেছে, কেউ কেউ চাকরি করছে বা বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু আমাদের সবকিছুই অনিশ্চিত।’

এই শিক্ষার্থী আরো বলেন, ‘‌শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা বেশ কয়েকবার আলোচনা করেছে। সর্বশেষ শিক্ষকরা বলেছিলেন, উপাচার্য নিয়োগ হলে তারা ক্লাসে ফিরবেন। গতকাল যেহেতু উপাচার্য নিয়োগ হয়েছে আমরা আশাবাদী শিক্ষকরা ক্লাসে ফিরবেন।’

এদিকে শিক্ষকরা বলছেন কুয়েটের এ অচলাবস্থার জন্য শিক্ষকদের ওপর অযৌক্তিকভাবে দায় চাপানো হচ্ছে। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়টির একজন অধ্যাপক বলেন, ‘‌পাঁচ মাস ধরে যে অচলাবস্থা চলছে তা অনাকাঙ্ক্ষিত। মুক্তিযুদ্ধের পর এত দীর্ঘ সময় শিক্ষা কার্যক্রমে এমন স্থবিরতা আর দেখা যায়নি। তবে এর দায় একতরফাভাবে শিক্ষকদের দেয়া হচ্ছে, যা সঠিক নয়। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্যের দক্ষতার ঘাটতির কারণেই সংকট দীর্ঘমেয়াদি হয়েছে। তিনি বিষয়গুলো যথাযথভাবে সামাল দিতে পারেননি এবং দায় এড়াতে সরকারের কাছে শিক্ষকদের দায়ী করেছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন এটি কোনো শিক্ষকই চান না এবং শিক্ষক সমিতির সভাগুলোয় অনেক শিক্ষক জানিয়েছেন তারা ক্লাসে ফিরতে চান। তবে এটাও ঠিক শিক্ষকদের লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষকদের একটা অংশ চান স্বল্পমেয়াদে হলেও দোষীরা শাস্তি পাক।’

কুয়েটে ২৩ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. ফারুক হোসেন। বণিক বার্তাকে তিনি জানান, তার ২৩ বছরের শিক্ষকতা জীবনে বা তার আগে কখনো কুয়েট এতদিন অচল থাকেনি। শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‌অচলাবস্থার জন্য শিক্ষক সমিতিকে দায়ী করা হয় কিন্তু এর দায় শিক্ষক সমিতির নয়। বাংলাদেশে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এতদিন উপাচার্যবিহীন ছিল না। আমরা উপাচার্যের কাছে কিছু দাবি জানিয়েছিলাম। যখন দাবি জানাই তখন দুই ব্যাচের ক্লাস চলছিল আর বাকি তিন ব্যাচের পরীক্ষা শুরুর কথা ছিল। আমাদের দাবি জানানোর পর পরই উপাচার্য পদত্যাগ করেন। উপাচার্য চলে যাওয়ায় আমাদের দাবির বিষয়টি সমাধান সম্ভব ছিল না, আবার উপাচার্য ছাড়া কোনো ব্যাচের পরীক্ষা শুরুও সম্ভব নয়। এসব কারণেই অচলাবস্থা দীর্ঘমেয়াদি হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘‌শিক্ষক সমিতি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করাকেই সবচেয়ে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আগেও আমরা এ বিষয়ে আন্তরিক ছিলাম। তবে উপাচার্য না থাকায় সংকট সমাধান সম্ভব হয়নি।’

২৩ এপ্রিল কুয়েটে গিয়েছিলেন ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। তিনি বলেন, ‘‌কুয়েটের সংকট আরো আগেই সমাধান হতে পারত। সংকট দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার মূল কারণ শিক্ষক সমিতির অবস্থান। তবে তারা সর্বশেষ বলেছিল উপাচার্য নিয়োগ হলে ক্লাসে ফিরবেন। শিক্ষকদের মূল দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের যথাযথভাবে পাঠদান ও তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করা। তাদের এমন কোনো কিছু করা উচিত না, যা শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত করে। কুয়েটে দীর্ঘ পাঁচ মাসের এ অচলাবস্থায় শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা আশা করছি এখন যেহেতু উপাচার্য নিয়োগ হয়েছে শিক্ষকরা ক্লাসে ফিরবেন।

আরও